Unfinished FIR

অসমাপ্ত এজাহার – তেথুলিয়া বিল

দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী  

পুলিশ সাহেবের থানা পরিদর্শন তখনকার দিনে এক বিশেষ ব্যাপার বলে গণ্য করা হোত। সমস্ত বৎসর কোন অফিসার কতটা দক্ষতার সহিত কাজ করেছেন, বিশেষ করে থানার ইন-চার্জ অফিসার অপরাধ নিবারণে, রহস্য উদঘাটনে এবং শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারে কতদূর সাফল্য অর্জ্জন করতে পেরেছেন, তাহা থানা এলাকার বিশিষ্ট জনসাধারণের সংযোগে এবং থানার রেকর্ড পরীক্ষা করে তিনি ঠিক করতেন। শুধু তাই নয়, এই পরিদর্শনের পর সংশ্লিষ্ট কর্মচারী সম্বন্ধে তিনি যে ধারণা করে নিতেন, তাহা লিপিবদ্ধ করে রাখতেন উক্ত কর্মচারীর ‘সি সি রোল’ বলে কথিত রেকর্ডে। এই মন্তব্যের ভালোমন্দ হবে পুলিশ কর্মচারীর উন্নতি বা অবনতির সহায়ক।

সে যাহা হোক কয়েকদিন পরই পুলিশ সাহেব তাঁর দলবল নিয়ে এসে গেলেন। দলবলের মধ্যে পুলিশ সাহেব নিজে, রিভলবারধারী দুজন দেহরক্ষী, আর একজন স্টেনোগ্রাফার। তখনকার দিনে ইংরেজ পুলিশ সাহেবরা শুধু ক্রাইম অর্থাৎ অপরাধের বিষয়টাই ভাল করে দেখতেন আর অন্যান্য বিষয় খুবই মামুলি ধরণের। তাই প্রথম দিন ভালই কেটে গেল। দ্বিতীয় দিনের ইন্সপেকশন খুব ভাল হচ্ছিল না। কারণ জটিল কেসগুলি মোয়াজ্জম কোনদিনই খুব ভালভাবে তদন্ত করে নি। আগেই বলেছি ওর থানার কাজে কোন উৎসাহই ছিল না। গানবাজনা, খেলাধূলা নিয়ে মেতে থাকতে খুব ভালবাসত। তাই পুলিশ সাহেবের জিজ্ঞাসাবাদ সুবিধা করে উঠতে পারছিল না। বিকেলের দিকে শ্যামবাবু প্রভৃতি কয়েকজন ভদ্রলোক এলেন সাহেবের সাথে দেখা করতে। তারাই প্রস্তাব করলেন পরদিন বিকালের দিকে পাখী শিকারের কথা। পুলিশসাহেব শুনেতো খুব খুসী। ইন্সপেকশনের ফাইনাল কমেন্টস ভাল হয়ে গেল। তারপর চলল শিকারের তোড়জোড়। ভাল দুটি ডিবিবিএল গান ও বিশ রাউন্ড গুলি যোগাড় হয়ে গেল। ঠিক হোল আমি সাহেবের সঙ্গে যাব সাইকেলে। দুটি ভাল সাইকেল নিয়ে আমরা বেলা দুটার পর রওনা হলাম। প্রায় সাড়ে তিনটায় তেথুলিয়া কাছারিতে পৌঁছে গেলাম।

বাইক্কা বিল মৌলভী বাজার (বাংলা দেশ) 

তেথুলিয়ার এই বিখ্যাত বিল কাছারি থেকে বেশী দূর নয়। দৈর্ঘে প্রায় তিন মাইল এবং প্রস্থে হবে এক মাইলের উপর। অনেক বিলে যায়গা আমি আমার চাকুরী জীবনে দেখেছি। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের জেলায় জেলায় ঘুরতে হয়েছে সরকারী কাজের উপলক্ষে কিন্তু এত পাখীর সমাবেশ আর কোথাও দেখলাম না। সমস্ত বিলের উপর কে যেন ধূসর রঙের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। নড়ে উঠছে সমস্ত চাদর, নানা রকম রঙের বাহার। সূর্যের পড়ন্ত রোদ বিলের জলের উপর পড়ায় এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে যেন আরও সহস্র গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পাখীর কলকল শব্দে সমস্ত বিলের আশপাশ মুখরিত। কি জীবন্ত আনন্দ। শামুক, গুগলি খেয়ে চলেছে মনের সুখে। ওদের এই অপূর্ব্ব আনন্দের সমারোহ দেখে আমিও একজন তার অংশীদার হয়ে গেলাম। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই বিষাদে মন ভরে গেল এই ভেবে যে এখনই এক ভীষণ আঘাতে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ছাড়খার হয়ে যাবে। কত রকমের হাঁস – বালিহাঁস, লেঞ্জা হাঁস, পাতিহাঁস, রাজহাঁস। আরও কত নাম না জানা পাখী।

পূর্ব্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী কাছারির নায়েব বিধুবাবু বিলের একটি যায়গা ঠিক করে নিয়ে জলার কিছু যায়গায় কলাগাছের ভেলার উপর কয়েকটি মেকি ঝোপ বানিয়ে রেখেছে। উদ্দেশ্য – বিলে পাখী শিকারের প্রথা অনুযায়ী একজনকে জলে নেমে কিছুটা এগিয়ে যেতে হবে ঐ সব ভাসমান ঝোপের আড়ালে বন্দুক নিয়ে, যাতে পাখীরা বুঝতে না পারে। এইভাবে বেশ কিছু এগিয়ে গিয়ে গুলির রেঞ্জের মধ্যে পৌঁছে গেলে পাখীদের উপর পর পর দুটি গুলি করা হবে। অপরদিকে একজন আর একটি বন্দুক নিয়ে বিলের ধারে একটি নির্বাচিত যায়গায় তৈরি থাকবে। উভয় শিকারি দৃষ্টি বিনিময় করে নিয়ে প্রথমে গুলি করবে যে জলে থাকবে। গুলি খেয়ে পাখীরা যেমন চক্রাকারে উপড়ে উঠবে তখনই সুবিধা হবে তীর থেকে গুলি করা। তাকে বলে ফ্লাইং শট। যা হোক, সাহেবকে তীরে দাঁড় করিয়ে দিলাম বন্দুক দিয়ে। আমি গুটি গুটি এগিয়ে গেলাম ঝোপের আড়ালে। পোসিসন নিয়ে তাকিয়ে দেখি সাহব আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ইশারার সঙ্গে সঙ্গেই আমি পর পর দুটি গুলি চালিয়ে দিলাম। সাহেবের গুলির শব্দ আমি শুনতে পাই নি। কারণ আমার গুলি ছোঁড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক প্রলয় কাণ্ড ঘটে গেল। সহস্রাধিক পাখী এক সঙ্গে চক্রাকারে জল থেকে আকাশের দিকে উঠে গেল। এই উঠার সঙ্গে সঙ্গে এমন এক প্রবল গতিবেগের সৃষ্টি হোল  যে ভেলার বাঁশের খুঁটি না ধরে ফেললে হয়ত আমাকে কয়েক হাত জলের উপর উঠিয়ে ফেলত। নিমেষের মধ্যে আমাদের মাথার উপরে সমস্ত আকাশ যেন মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেল আর সেই সঙ্গে সঙ্গে এই অসংখ্য পাখীর সন্মিলিত ডাকে আকাশ বাতাস কিছুক্ষণের জন্য মুখরিত হয়ে উঠল। সে দৃশ্য আজ এতদিন পর লিখে প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব না। পরিবেশ কল্পনা করে কেউ বাংলাদেশের কোন বিলে পাখী শিকার করে থাকলে বুঝে নিতে পারবেন। কিন্তু এই কালবৈশাখীর মেঘাচ্ছন্নতা কয়েক মিনিটের জন্য। বহু উপরে বার দুই তিন চক্রাকারে ঘুরে এই বিশাল পক্ষীকুল কোথায় মিলিয়ে গেল। গুলি লেগে অনেক পাখী বিলের জলের উপর পড়ে যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গেই শিকারি কুকুর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাখায় কামড়ে ধরে এক এক করে টেনে নিয়ে এল। গুনে দেখা গেল উনিশ-কুড়িটা হবে। নায়েব বাবুর লোক পাখীগুলির পেট কেটে নুন ভরে সেলাই করে দিল। তিন-চারটি পাখীর গায়ে কোথাও কোন জখম নেই। ওগুলি গুলির শব্দে বোধ হয় আতঙ্কে পড়ে গিয়েছে। কি সুন্দর সতেজ ভাব, ধূসর রঙ, গলায় নানা রঙের মালা, লাল ঠোঁট, চোখ বুজে পড়ে আছে। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল।

নিজের এবং বহু লোকের জীবন রক্ষা করতে যেয়ে নাজিরনগর থানার চাতল পারে গুলি চালিয়ে কিছু সংখ্যক দাঙ্গাকারীকে হতাহত করতে হয়েছিল। কিন্তু তখন আমার এতটুকুও মন খারাপ হয় নি – কারণ সেটা ছিল আমার কর্তব্য কর্মের অন্তর্ভূক্ত। তারপর আমার চাকুরী জীবনে আরও দুবার ডাকাত ধরতে যেয়ে গুলি করতে হয়েছে। কিন্তু পাখী শিকারের অদম্য স্পৃহা তেথুলিয়া বিলের জলে শেষ করে দিয়ে এসেছি। আমার অংশের পাখীগুলি মোয়াজ্জম হোসেন ও অন্যান্য বন্ধুগণকে বিলি করে দিলাম। অর্দ্ধসামরিক বাহিনীতে কাজ করেও নিরীহ পাখী শিকারের হিংসা প্রবৃত্তি আর যাতে না জাগে তার জন্য ভগবানের নিকট প্রার্থনা করেছি। এবং ঠাকুর সে কথা শুনেছেন। কারণ পাখী শিকার আর কোনদিনই আমি করি নি।