Colour of Birds

নানা ঙে পাখীগুলি

ডঃ সনৎ কুমার ব্যানার্জ্জী 

 [ছবি – সম্বিত ব্যানার্জ্জী]

সকালবেলা বসন্তের হাল্কা হাওয়ায় বারান্দায় বসে গরম চায়ে প্রথম চুমুকটা মাত্র দিয়েছি – বাগানের গন্ধরাজ গাছের ডাল থেকে কে যেন রিনরিনে গলায় চিউইট চিউইট করে বলে উঠল – চা খাওয়া হচ্ছে বুঝি? তাকিয়ে  দেখি দূর্গাটুনটুনিটা (Purple Sunbird )। কি বাহারে রং হয়েছে গো পাখীটার! চকচকে বেগুনী-নীল না কালচে নীল কি বলব – একটু দূর থেকেতো পুরো পাখীটা কালই দেখায়। ঘারের কাছটা থেকে যেন মাঝে মাঝে উজ্জ্বল রূপোলী নীল আলো ঝিলিক মারছে। এই তো সেদিন দেখলাম ওটাকে – পিঠটা কি রকম জলপাই-বাদামি গোছের, বুক থেকে পেট ধুসর হলদে আর বুকের মাঝে কাল লম্বাটে দাগ। হুঁ বুঝেছি – এখন তো Breeding Season । তাই পুরুষ পাখীটা ভোল পালটে মোহন রূপ ধরেছে।  

কুটরররোক-কুটরররোক- কুটরররোক- কুটরররোক – একটু দূরের অশ্বথ্ব গাছটা থেকে নীলকণ্ঠ বসন্তবৌরি (Blue throated Barbet)  শুরু করে দিল – আমরা যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি…। কিন্তু কি সুন্দর দেখতে পাখীটা – সারা গা’টা সবুজ – কপাল – মাথা টকটকে লাল – মাথার ধার, চিবুক, গলা ঘাড়ের অংশ হাল্কা নীল – চোখের উপর কাল ব্যান্ড, ঘাড়ের আর নীচের ঠোটের দু পাশেই বড় লাল ফোঁটা – রং কোম্পানির shade card। সামনের জাম গাছের ডালে ডেকে ঊঠল – চিয়াও – হলদে শাড়ি – মাথায় কাল ঘোমটা – ঠোঁটে গোলাপী লিপস্টিক – বেনে বৌ (Black-hooded Oriole)। অমিতাভ চৌধুরির ছড়া মনে পড়ল – ‘ঠোঁটের রঙে শাড়ির ঢঙে টি সি লাহার বিজ্ঞাপন’। জলা নেই, পুকুর নেই, খাল নেই – চারিদিকে শুধু ‘ইটের পরে ইট – মধ্যে মানুষ কীট’। এ হেন জায়গায় মাছরাঙা (White-throated Kingfisher) ডাকে কেন? সামনেই অবশ্য মাছের বাজার। নীল ডানা ভাসিয়ে এসে মেছুঁনির ঝুড়ি থেকে ঠোঁটে করে ট্যাংরা মাছ তুলে নিবি এমন শর্মা তো তুই নোস্‌ বাপু। উল্টোদিকের তিনতলা বাড়ীর ছাদের জলের ট্যাঙ্কের ওপর যে পাইপটা আছে ফিঙেটা (Black Drongo) এসে লম্বা লেজ ঝুলিয়ে বসল। পরক্ষণেই ফুরুৎ করে উড়ে দু’ পাক ডাইভ মেরে আবার ওখানটাতেই বসল – পোকাটোকা ধরল বোধ হয়। কি চকচকে কাল গা! আর দেখ ভুসো কেলে কুচ্ছিৎ কাক দুটোকে – কারা যেন পলিথিনের প্যাকেটে করে কি সব ফেলে গেছে – আর কাক দুটো প্যাকেটটাকে ঠুক্‌রে ঠুক্‌রে কি করছে! এখনই ভেতরের সবকিছু বের করে সারা রাস্তা ছড়িয়ে নোংরা করবে। আজ আবার কর্পোরেশনের জমাদার আসবে না।

দু দিন ধরে লাল মাথা সোনালি গা – দু’টো কাঠঠোকরা (Black-rumped Flameback) জামগাছটায় কি ঠোকাঠুকি করছিল – দেখা যাক আজকেও যদি আসে। দোয়েলটা (Oriental Magpie Robin) এসে বসল গেটের থামটার মাথায়। কাল গা-মাথা – সাদা পেট – ডানায়, লম্বা লেজে সাদা দাগ – লেজটা তুলে তুলে যখন শিষ দেয় – কি যেন বলে – সীতারামজী রোটি ভেজো। আচ্ছা দোয়েলের কি ছবি তোলা উচিৎ – Black & White না Coloured? জবাবটা জেনে নেব কুশলকে খুঁচিয়ে। পিক্‌ – পিক্‌ – পিক্‌ – পিক্‌ – করতে করতে কোথা থেকে উড়ে এসে আমডালের পাতার ফাঁকে জুড়ে বসল কোকিলটা (Asian Koel)। একটু বাদেই শুরু হবে কু-উ-উ-উ, কু-উ-উ-উ – বেটা ভীস্মলোচন শর্মা। কু জনেই কুজন গায় – তোর থেকে হাড়িঁচাচা (Rufous Treepie) ভাল। প্রায়ই ওটার ডাকেই আমার ঘুম ভাঙে – ডাকটা যদিও ওর Alarm Call নয় তবে আমার Alarm এর Call হিসাবে ভাল কাজ দেয়। হাড়িঁচাচা অবশ্য অনেক রকমেই ডাকতে পারে – সবগুলোই যে কর্কশ তা নয়। ভুষো কালচে মাথা – গলা, পিঙ্গল বর্ণের দেহ ছাই সাদা লম্বা লেজঝোলা পাখীটা মন্দ নয় দেখতে – আমার তো ভালই লাগে।

পাঁচিলের ধার ঘেঁসে রঙ্গন ফুলের গাছটা ঘিরে Common Mormon প্রজাপতিটা কেবল ওড়াওড়ি করছে। কিন্তু পাতার ফাঁকে নড়ে কি? টুনিটা (টুনটুনি) (Common Tailor Bird) না? জলপাই-সবুজ পিঠ, মাথার ওপরটা লালচে দেড়-আঙ্গুলে পুঁচকে পাখী – লেজের দুটো পালক ঝাঁকিয়ে – ঝাঁটার কাঠির মতন পা নিয়ে পাঁচিলের ওপর লাফিয়ে চলে। টুইট টুইট করে সপ্তম সুরে চিৎকার করে যখন ডাকে – রবীন্দ্রনাথের কবিতা মনে হয় – “এতটুকু যন্ত্র হতে এত শব্দ হয়, শুনিয়া বিশ্বের লাগে বিষম বিস্ময়”। আর বারে এই গন্ধরাজ গাছেই দুটো পাতা জোড়া দিয়ে মাঝের ফাঁকে আঁস-ঘাস-কাদা দিয়ে কি সুন্দর ছোট্টো কাপের মতন বাসা বানিয়েছিল। কিন্তু ঐ বাসা বানানো পর্যন্ত, ছানা-টানা অবশ্য হতে দেখি নি। কি জানি কেন? টুনিই জানে।

আচ্ছা এই পাখীরা কি সুন্দর সুন্দর কত রকম রঙের কত রকম বাহারের হয় না? এক প্রজাপতি আর কিছু প্রজাতির মাছ ছাড়া আর কোনও প্রাণী এত বিচিত্র রঙবাহারি হয় না। পাখীর রঙ দিয়েই কত নতুন নামের রঙ হয়ে গেল – ময়ুরকন্ঠি, ক্যানারি ইয়েলো, প্যারট গ্রীন।

প্রশ্ন হচ্ছে পাখীরা এত রকমের রঙীন হয় কি করে? আসলে পাখীরা কখনও – পাখীরা কেন কোনও বস্তুই কখনও রঙীন হয় না – রঙীন আমরা দেখি। রঙ আমাদের চোখে, রঙ আমাদের মনে, চোখ বুজলে সবই কালো সবই অন্ধকার – “আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ, চুনী উঠল রাঙা হয়ে” – কথাটা কাব্য শোনালেও চুড়ান্ত বৈজ্ঞানিক সত্য।

সাদা হোক, কাল হোক আর রঙীনই হোক কোনও  বস্তুকে (Object) আমরা দেখি কি করে? আলো আর আমাদের চোখ ও মনের সমন্বয়ে। আলো তরঙ্গায়িত শক্তি – তড়িৎ-চুম্বক তরঙ্গের (electromagnetic wave) বর্ণালীর (spectrum) মোটামুটি ৪০০ ন্যানোমিটার (১ ন্যানোমিটার = ১০ মিটার) থেকে ৭০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ পর্যন্ত ক্রমবিন্যাসের তরঙ্গগুলিকে দৃশ্যমান আলো বলা হয় যার সাহায্যে আমরা কোনও বস্তু দেখে থাকি। আলো যখন কোনও বস্তুর উপর পড়ে আলোর কিছু অংশ প্রতিফলিত হয় (reflection), কিছুটা বস্তু শুষে নেয় (absorption) ও বাকি অংশ বস্তু ভেদ করে প্রতিসরিত (refraction) হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে (transmission)। বস্তু থেকে আলো প্রতিফলিত বা প্রতিসরিত হয়ে আমাদের চোখের অক্ষিপটে এসে পড়ে। এই অক্ষিপটে কোটি কোটি সংখ্যায় রড ও কোন্‌ (rods and cones) নামক আলো-অনুভূতি-গ্রাহক (photo receptors) রয়েছে যেগুলি সেই আলোর তীব্রতার ভিন্নতাকে স্নায়ু-প্রবাহরূপে (nerve impulse) optic nerve –এর স্নায়ু তন্তুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে (Brain) পাঠায়। মস্তিষ্ক স্নায়ু-প্রবাহরূপ তথ্যের পাঠোদ্ধার করে আমাদের মনে ঐ বস্তুর অস্তিত্ত্বের একটি ত্রিমাত্রিক প্রতিবিম্বের বোধ গড়ে তোলে আর আমাদের মনে হয় বস্তুটাকে দেখছি।

এবারে আসা যাক রঙের কথায়। একই কম্পনসংখ্যা বিশিষ্ট আলোকে একবর্ণী আলো (monochromatic light) বলে। ৭০০ ন্যানোমিটার থেকে ৪০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ পর্যন্ত দৃশ্যমান আলোকে কয়েকটি একবর্ণী আলোবিশিষ্ট শ্রেণী বা ব্যান্ডে ভাগ করা যায়। এক একটি ব্যান্ডকে রঙ বলা হয় এবং তার মধ্যে তরঙ্গদৈর্ঘের ক্রম অনুসারে প্রধান প্রাথমিক ছয়টি রঙ হল বেগুনী, নীল, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল। যাকে আমরা সাদা আলো বলি (যেমন সূর্যের আলো) তা’ আসলে এই রঙগুলির সামগ্রীক মিশ্রণ। কালো কোনও রঙ নয় – আলোর অনুপস্থিতি। প্রত্যেক ব্যান্ডে আবার তরঙ্গদৈর্ঘের তারতম্য অনুযায়ী সেই রঙের মাত্রার তারতম্য হয়। বিভিন্ন রঙের বিভিন্ন অনুপাতের মিশ্রণে আবার অসংখ্য রকমের রঙ তৈরী হতে পারে। কোন তরঙ্গদৈর্ঘে এসে এক ব্যান্ড শেষ হচ্ছে আর পরের ব্যান্ড শুরু হচ্ছে তা নিয়ে যথেষ্ট দ্বন্দ আছে – তবুও এই একবর্ণী আলোর তরঙ্গদৈর্ঘের বিস্তৃতির একটি মোটামুটি ধারণা দেওয়া হল –


ColorSpectrum

(CRC Handbook of Chemistry and Physics. 1966).

এই লাল থেকে বেগুনী রঙের সারিকে বলে বর্ণালী (colour spectrum)। অনেক সময়ে বেগুনী ও নীলের মাঝামাঝি ইন্ডিগো নামে একটি রঙকেও বর্ণালীতে স্থান দেওয়া হয়।

আমাদের চোখ রড আর কোন বিশেষতঃ কোনের সাহায্যে ৭০ লক্ষ থেকে ১ কোটি রকমের রঙ চিনতে পারে। চোখের রেটিনাতে যদি শুধুই রড থাকতো তা হলে আমরা সাদা আর কালো ছাড়া আর কোনও রঙ দেখতে পারতাম না। চোখের সামনে জগৎটা হ’ত সাদা-কালো ছবি। কোন আমাদের নানান রঙ দেখতে সাহায্য করে। এই  কোন-গুলি তিন ধরণের হয় যা ইংরাজি বড় হাতের অক্ষর L, MS দিয়ে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে এবং যথাক্রমে বর্ণালীর লাল, সবুজ ও নীল আলোয় প্রতিক্রিয়াশীল।

অনেক ক্ষেত্রে বস্তু থেকে যখন আলোর প্রতিসরণ হয়, বর্ণালীর আলোগুলি বিভিন্ন প্রতিসরণ কোণে বেরিয়ে আসার ফলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ও নানা রঙের আলোর ব্যান্ডে পরিণত হয়। ঠিক এইভাবে আকাশে ভাসমান জলকনায় সূর্যের আলো প্রতিসরিত হয়ে রামধনুর সৃষ্টি হয়।

আবার কিছু কিছু পদার্থ আছে যাদের উপর সাদা আলো পড়লে তারা আলোর বর্ণালীর বাছাই করা তরঙ্গদৈর্ঘের আলো শোষণ করে বাকি অংশ ছেড়ে দেয়। ফলে ঐ পদার্থ থেকে সাদা আলো প্রতিফলিত না হয়ে রঙীন আলো আমাদের চোখে এসে পড়ায় আমরা পদার্থটিকে রঙীন দেখি। পিগমেন্ট বা রঞ্জক বস্তু এই জাতীয় পদার্থ। ‘আলট্রামেরিন ব্লু’ পিগমেন্ট সাদা আলোর অন্য সব রঙ শুষে নিয়ে শুধু নীল রঙকে ছেড়ে দেয় বলে এই পদার্থটিকে আমরা নীল দেখি। পিগমেন্টকে আমরা কি রঙের দেখব তা অবশ্যই নির্ভর করে পিগমেন্টে পড়া আলোর রঙের উপর। পিগমেন্ট পদার্থগুলিতে আলো পড়লে যে ভৌতিক (physical) ক্রিয়া হয় তা ফ্লুরেসেন্স বা ফস্‌ফোরেসেন্স (পদার্থ থেকে উৎসারিত স্বতঃদীপ্ত আলো) পদ্ধতি থেকে আলাদা। প্রকৃতিতে জৈব ও অজৈব (খনিজ) এই দুই ধরণের পিগমেন্ট পাওয়া যায়। লোহার অক্সাইড যেমন anhydrous Fe2O3 (Red Ochre), hydrated Fe2O3.H2O (Yellow Ochre), Carbon Black, রঙীন পাথর (semi-precious stone) – ইত্যাদি নানাবিধ প্রাকৃতিক অজৈব পিগমেন্টের ব্যবহার অতি প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে। এখন কৃত্রিম উপায়ে পিগমেন্ট তৈরী করা হয়। নানা ধরনের রঙ তৈরী করতে এই পিগমেন্ট ব্যবহৃত হয় । প্রাণী ও উদ্ভিদ জাতীয় জৈব শরীরে বিভিন্ন ধরণের পিগমেন্টের উপস্থিতির জন্য আমরা এদের নানা রঙের দেখতে পাই।    

বিশেষ তিন ধরণের জৈবিক পিগমেন্ট হল মেলানিন (melanin), ক্যারটেনয়েডস (carotenoids) আর পরফিরিনস (porphyrins)

মেলানিন (melanin) – প্রকৃতির জীবমন্ডলে প্রায় সর্বত্রই মেলানিন বিরাজমান। প্রাণীশরীরে মেলানিন পিগমেন্টগুলি অ্যামাইনো অ্যাসিড (amino acid)  টাইরোসিনের (tyrosine) ডেরিভেটিভ (derivative)। জৈবিক মেলানিনের একটি প্রকার ইউমেলানিন (eumelanin) যা dihydroxyindole carboxylic acids ও তার বিজারিত রূপগুলির (reduced forms) কালচে-বাদামী পলিমার। ডোপামেলানিন (dopamelanin) হল polyacetylene, polyanilinepolypyrrole এর মিশ্র কো-পলিমার এবং আর এক প্রকার ফিওমেলানিন (pheomelanin)benzothiazine এর লালচে বাদামী পলিমার। মানুষের শরীরে মেলানিন প্রধাণতঃ ত্বকের রঙের নির্ধারক – চুল, চোখের কনীনিকাতেও এর উপস্থিতি আছে। এ ছাড়া মেলানিন ক্ষতিকারক আল্ট্রা-ভাইওলেট রশ্মী শোষণ করে তার শতকরা ৯৯.৯ ভাগেরও বেশী অংশকে সাধারণ তাপে রূপান্তরিত করে ত্বককে ক্যানসার জাতীয় রোগের হাত থেকে বাঁচায়। মেলানিনকে মাইক্রোস্কোপে ৮০০ ন্যানোমিটারেরও কম ব্যাসের ক্ষুদ্র দানার মতন দেখায়।

ক্যারটেনয়েডস (carotenoids) এক জাতীয় জৈবিক পিগমেন্ট যা প্রকৃতিতে উদ্ভিদের ক্লোরোপ্লাস্ট (chloroplasts) ও ক্রোমোপ্লাস্ট (chromoplasts) – এ এবং কিছু কিছু সালোকসংশ্লেষক অবয়বী (photosynthetic organisms) যেমন অ্যালজি (শৈবালশ্রেণী), ছত্রাক (fungus), ব্যাকটিরিয়া এবং একশ্রেণীর জাবপোকার (aphid) মধ্যে পাওয়া যায়। প্রায় ৬০০ ধরণের জানা ক্যারটেনয়েডদের দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায় – অক্সিজেন-যুক্ত xanthophylls ও অক্সিজেন-মুক্ত ক্যারটিনস (carotenes)। ক্যারটেনয়েডসরা সাধারনতঃ আলোর বর্ণালীর নীল রঙ শোষণ করে। উদ্ভিদ ও অ্যালজির রাজ্যে এদের দুই প্রধান কাজ – সালোকসংশ্লেষের জন্য আলোকশক্তি শোষণ ও ক্লোরোফিলকে আলোক-জনিত ক্ষতি থেকে রক্ষা করা। মানুষের শরীরে অনেক রকমের ক্যারটেনয়েড পাওয়া যায় যেমন beta-carotenealpha-carotenegamma-carotene, beta-cryptoxanthin, lutein zeaxanthin ইত্যাদি।   

গাজঁরের হলদে-কমলা রঙ এই ক্যারটিনের জন্য। ফেকাশে হলুদ থেকে শুরু করে উজ্জ্বল কমলা হয়ে গাঢ় লাল পর্যন্ত ক্যারটিনদের যে রঙ আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় তার কারণ বর্ণালীর অন্য বাকি রঙগুলি তারা শোষণ করে নেয় তাদের আনবিক গঠনের জন্য। সাধারণতঃ হলদে রঙ জাতীয় সব্জীতে থাকে ক্যারোটিন আর সবুজ রঙ জাতীয় সব্জীতে থাকে xanthophylls। লাল টম্যাটো, তরমুজ, পেঁপে, আঙুর ইত্যাদিতে থাকে lycopene জাতীয় ক্যারটেনয়েড। রঙের প্রকাশ ছাড়াও এই রাসায়নিক পদার্থগুলির পুষ্টিকর গুণ অনেক আছে।   

পরফিরিনস (porphyrins) পিগমেন্ট এক শ্রেণীর জৈব যৌগ পদার্থ অনেকগুলিই যার প্রকৃতিতে পাওয়া যায়। এদের মধ্যে সবচেয়ে নামজাদা হল লোহিত রক্ত কণিকার পিগমেন্ট হিমি (heme) – হিমোগ্লোবিন প্রোটিনের একটি সহ-উৎপাদক (co-factor)। মূল রাসায়নিক যৌগের নাম পরফিন (porphine) – আর অনুকল্পিত (substituted) পরফিনসদের বলা হয় পরফিরিনস (porphyrins)। এরা সাধারনতঃ গাঢ় রঙের হয়।   

এই তিন প্রধান পিগমেন্ট মেলানিন, ক্যারটেনয়েডস ও পরফিরিনস পাখীদের শরীরের নানান রঙের উৎস যা আসে খাদ্য-শৃঙ্খলের মাধ্যমে।  

পাখীর সারা শরীর ঢাকা থাকে পালকে আর পাখীর ডানা’তো পালক দিয়েই তৈরী। তাই পাখীদের রঙ বলতে সাধারনতঃ বোঝায় পালকের রঙ, এ ছাড়া পাখীর ঠোঁট, পা, চোখ ও কনীনিকা (চোখের মণি)ও নানা রঙের হয়। পাখীর পালকের এই পোষাককে বলে প্লুমেজ (plumage)। বহু ধরণের পাখীর ক্ষেত্রে প্রজাতিভেদে, উপজাতিভেদে, ঋতুভেদে, লিঙ্গভেদে প্লুমেজের রঙ-রূপ-নক্সার পরিবর্তন বা বৈসাদৃশ্য পাখীর সনাক্তকরণে সাহায্য করে। তাই পাখীর বিবিধ রঙের কারণ অনুসন্ধানে এই প্লুমেজের বিভিন্নতার ধারণার প্রয়োজন। পাখীদের দৃষ্টিশক্তি খুব প্রখর আর মানুষের থেকেও অনেক বেশী রকমের রঙ চিনতে পারে – এমন কি কোনও কোনও পাখী নাকি আল্ট্রাভায়ওলেট রঙেও দেখতে পায়। পাখীদের এই রঙের বৈচিত্র ও উজ্জ্বলতা তাদের বেঁচে থাকার তাগিদে। রঙ পাখীদের নিজেদের স্বজাতিকে চেনায়। রঙ ও রূপের প্রাধাণ্য পুরুষ পাখীদের মধ্যেই দেখা যায় বিশেষ করে প্রজনন ঋতুতে স্ত্রী পাখীকে আকর্ষনের জন্য। রঙের উজ্জ্বলতা পাখীদের সুস্বাস্থ্য ও প্রাণশক্তির পরিচায়ক। শত্রুর চোখের আড়ালে থেকে আত্মরক্ষার জন্যও রঙের একটা বড় ভূমিকা আছে।    

পাখীদের কোনও লোম থাকে না – থাকে সারা শরীরে থাকে শুধু ছোটো, বড়, মাঝারি নানান ধরনের নানান মাপের পালক আর একমাত্র পাখীদেরই আছে পালক। পালক কেরাটিন নামক একপ্রকার প্রোটিন দ্বারা গঠিত। পাখীর পালক প্রধাণতঃ পাখীকে উড়তে সাহায্য করে যা কিনা মানুষের বিশেষ ঈর্ষার বস্তু, দেহের গঠনে মসৃনতা আনে ও সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে শরীরকে গরম রাখে এবং প্রতিকুল প্রাকৃতিক আবহাওয়া থেকে রক্ষা করে।

সদ্যোজাত পাখীর শাবকের প্লুমেজ হয় সাধারণ হাল্কা রঙের, নরম ফেঁসোর বা তুলোর মতন, যা তাদের শরীর রক্ষা করে। কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের অল্পবয়স্ক পাখির ছানাদের প্লুমেজ বৈশিষ্ট্যহীন যদিও তাতে অল্পস্বল্প রঙরূপ ধরা শুরু করে। অনেক দ্বিরূপ প্রজাতির (dimorphic species)  পাখীদের ছানারা কতকটা স্ত্রী পাখীদের মতন দেখতে লাগে – পরিনত হবার সাথে সাথে ছানাদের প্লুমেজও রঙ, রূপ ও নক্সায় পূর্ণতা পেতে থাকে।

অনেক শ্রেণীর পূর্ণ পরিণত প্রাপ্তবয়স্ক পাখীর স্বাভাবিক বা মৌলিক প্লুমেজ (basic plumage) সারা বছর একই রকম দেখা যায় – কেবল প্রজনন ঋতুতে (পুরুষ পাখীর) রঙের উজ্জ্বলতা ও নক্সার স্পষ্টতা বৃদ্ধি পায়। দ্বিরূপ প্রজাতির পাখীদের সাধারণ অবস্থায় স্ত্রী ও পুরুষ পাখীর মৌলিক প্লুমেজ একই রকম দেখতে এবং একে শীতকালীন প্লুমেজ (winter plumage) বা অপ্রজননকালীন প্লুমেজ (non-breeding plumage) বলা যেতে পারে। হাঁস (Ducks) প্রজাতি পাখীদের ক্ষেত্রে এ’কে সাধারণতঃ eclipsed প্লুমেজ বলে কারণ তাদের এই প্লুমেজ কম সময়ের জন্য থাকে। প্রজনন ঋতুতে পুরুষ পাখীদের প্লুমেজের বিশেষ লক্ষণীয় ও আকর্ষণীয় রঙ ও নক্সার পরিবর্তন হয় যাকে প্রজননকালীন বা বসন্তকালীন প্লুমেজ (breeding plumage, spring plumage or nuptial plumage) বলা হয়। কোনও কোনও প্রজাতির পাখীদের এই বসন্তকালীন প্লুমেজ কয়েক সপ্তাহ থাকে আবার কারও বা সারা বসন্ত ও গ্রীষ্মকাল জুড়ে থাকে। পুরুষ পাখীদের এই পরিবর্তন এতই প্রকট যে এদের স্ত্রীপাখীদের যেন ভিন্ন প্রজাতির বলে বোধ হয়।

অনেক সময়ে জনন-সংক্রান্ত প্রতিবন্ধতার জন্য পালকের রঙের অস্বাভাবিকত্ব চোখে পড়ে – যেমন স্বাভাবিকের চেয়ে ফেকাশে (leucism) বা সাদাটে ছোপ কিংবা অতিরিক্ত গাঢ় রঙ (melanism)। এমন কি জলবায়ু বা ভৌগলিক কারণেও প্লুমেজ ভিন্নরূপ হতে পারে।   

পাখীর পালক পূর্ণ পরিণত অবস্থায় মানুষের নখের মতনই মৃত পদার্থ এবং তার জীবদ্দশায় চিরস্থায়ী নয় – সময়ের সাথে সাথে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, অকেজো হয়ে যায়। তাই পাখীদের দেহে নিয়মিত নতুন করে প্রজাতিভেদে বছরে একবার বা দু’বার পালক গজায়। পুরানো পালকের বদলে নতুন পালকের এই প্রতিস্থাপনকে বলা হয় নির্মোচন (moult or moulting)। দ্বিরূপ প্রজাতির পাখীদের ঋতুভেদে বছরে একবার কি দু’বার এই নির্মোচন হয় এবং এই সময়ে পাখীদের পরিচিত প্লুমেজে পাওয়া যায় না। এ ছাড়া অন্যান্য পাখীদের সারা বছর ধরেই এই নির্মোচন হতে পারে।   

পাখীদের পালকের যে রঙ আমরা দেখি তার দু’টি উৎস – পিগমেন্ট (pigment colour ) ও পালকের গঠন বিন্যাস (structural colour)। মেলানিন, ক্যারটেনয়েডস ও পরফিরিনস এই তিন জাতীয় জৈবিক পিগমেন্ট প্রধানতঃ পালকে থাকে। পিগমেন্টজনিত রঙ পিগমেন্টের আনবিক গঠন ও উপস্থিতির ঘনত্বর উপর নির্ভর করে।   

মেলানিন (eumelanin ও phaeomelanin) ক্ষুদ্র দানার আকারে পাখীর গায়ের চামরা ও পালকে পাওয়া যায়। অবস্থিতি ও ঘনত্ব অনু্যায়ী মেলানিন ঘন কালো থেকে শুরু করে লালচে বাদামি হয়ে ফেকাশে হলুদ বা ছাই রঙ সৃষ্টি করে। রঙ দেওয়া ছাড়াও মেলানিন পালককে মজবুত করে ও দ্রুত ক্ষয়ের হাত থেকে বাচাঁয়। পিগমেন্টহীন পালক সবচেয়ে দুর্বল। অনেক সাদা রঙের পাখী আছে যাদের ডানার উড়ান পালকের (primaries), লেজের পালকের রঙ বা তাদের ডগার রঙ কালো হয় (যেমন শামুখখোল – Asian Openbill)। ওড়ার কালে এই পালকগুলিকেই সবচেয়ে ক্ষয়-ক্ষতির মুখোমুখী হতে হয়। পিগমেন্টের রঙ এদের বাড়তি শক্তি দেয়। এই মেলানিন পিগমেন্ট পাখীর শরীরেই তৈরী হয়।

পাখীর দেহে লাল, কমলা ও হলুদ রঙ আসে ক্যারটেনয়েডস (lutein, zeaxanthin, beta-carotene, astaxanthin, rhodoxanthin ও canthaxanthin) পিগমেন্ট থেকে যেগুলো মূলত উদ্ভিদে সংশ্লেষিত হয় এবং পাখীর দেহে আসে খাবারের বা খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে ও পালকের ক্রমবৃদ্ধির সময়ে গ্রন্থির (follicle) কোষে প্রবেশ করে। হলুদ ক্যারটেনয়েড আসে শস্যদানা ও বীজ থেকে। ফ্লেমিঙ্গোদের গোলাপী রঙের উৎস কঠিন খোলাযুক্ত জলচর প্রাণী যেমন কাকঁড়া, চিংড়ি, শামুখ ইত্যাদি যা তাদের প্রধান খাদ্য।   

পরফিরিনস পিগমেন্ট (coproporphyrin III, uroprophyri, turacoverdin ইত্যাদি) পালকের গ্রন্থির (follicle) কোষে তৈরী হয় এবং লাল ও সবুজ রঙ ছাড়া গোলাপী ও বাদামি রঙও সৃষ্টি করে। আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মিতে এই পিগমেন্ট উজ্জ্বল লাল দেখায়। প্যাচাঁদের বাদামি রঙের অনেকটাই আসে পরফিরিনস বা পরফাইরিনস থেকে। মেলানিনের সাথে ক্যারটেনয়েডস বা পরফিরিনস মিলে পাখীদের রঙ আরও বর্ণময় হয়ে ওঠে।

দেহে এই পিগমেন্টগুলি সঠিক মাত্রায় না থাকলেই পাখীর রঙের যথেষ্ট হেরফের ঘটে। ফ্লেমিঙ্গোরা যদি তাদের খাবারের সাথে সঠিক মতন ক্যারটেনয়েডস না পায় তবে তাদের শরীরের চোখ-ধাধাঁন গোলাপী রঙ ফেকাশে হয়ে যায়।   

পালকের সুক্ষ্ম কাঠামোতে আলো পড়ে যে প্রতিক্রিয়া হয় তা’ পাখীদের রঙের দ্বিতীয় উৎস। এই জাতীয় রঙকে গাঠনিক রঙ (structural colours) বলা যায়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে পালকের আনবিক গঠনবিন্যাসে প্রতিসরিত হয়ে সাদা আলো তার বর্ণালীর বিশেষ কিছু নির্বাচিত উজ্জ্বল ঝলমলে রঙীন আলোয় (iridescence) বিচ্ছুরিত হয়। প্রজনন ঋতুতে দূর্গাটুনটুনির পুরুষ পাখীর দেহকে কোনও কোনও দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে বা আমাদের সাধারণ পায়রাগুলোর (Rock Pigeon) গলা-ঘাড় লক্ষ্য করলে উজ্জ্বল ঝলমলে নীলাভ-সবুজ আলো দেখা যায়। আবার দৃষ্টিকোন বদলে গেলে কোনও আলো চোখে প্রতিফলিত না হওয়ায় কালো দেখায়। অনেক প্রজাতির পাখীর পালক থেকে এ রকম ঝলমলে নীল, সবুজ বা লাল রঙ দেখা যায়।

সব  গাঠনিক রঙই যে ঝলমলে হয় তা নয় – অনেক সময়ে কোনও কোনও পাখীর পালকের বার্বের ও বার্বিউলস সংলগ্ন অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাতাসের বুদ্‌বুদ্‌ (micro air bubbles) সূর্যের সাদা আলোকে রামধনু রঙে ভেঙে ছড়িয়ে দেয়। এই বুদ্‌বুদ্‌গুলির আয়তনে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘের তুলনীয় হওয়ায় অধিক নীল আলো ছড়িয়ে পড়ে পালকের রঙ নীল দেখায় – ঠিক যেমন ভাবে আমরা আকাশের রঙ নীল দেখি (Raleigh scattering)। সাম্প্রতিককালের প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র (Eric R. Dufresne et al, Soft Matter, Online 30 March 2009, DOI: 10.1039/b902775k) বলছে যে পাখীর পালকের বার্বের কোষে ছিদ্রযুক্ত বিটা-কেরাটিন (beta-keratin) ও বদ্ধ বায়ুর ন্যানোস্ট্রাকচার (nanostructure – অতি ক্ষুদ্র কাঠামো) এই রঙের বিচ্ছুরনের কারণ। পালকের গঠনকালে জীবন্ত কোষে প্রোটিন-সমৃদ্ধ সূপে দশা-পৃথক্‌করণের (phase-separation) জন্য যে অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র জল-বুদ্‌বুদের সৃষ্টি হয় – পালকের পূর্ণতাপ্রাপ্তির সাথে তা বায়ুর বুদ্‌বুদে পরিণত হয়। এর ফলে পালকের বার্বে যে ন্যানোস্ট্রাকচার তৈরী হয় – তা’ নির্বাচিত তরঙ্গের আলো বিচ্ছুরন করে পাখীর রঙের সৃষ্টি করে। ন্যানোস্ট্রাকচার থেকে বিচ্ছুরিত আলোর নির্গমন কোনের উপরও আলোর রঙ নির্ভর করে।

নীলকন্ঠ (না নীলকান্ত?) (Indian Roller) বা মাছরাঙা (Kingfisher)  পাখীদের পালকের নীল রঙ গাঠনিক রঙ। এই ন্যানোস্ট্রাকচারের স্তরের সাথে মেলানিন পিগমেন্ট থাকলে, অন্য রঙ শোষিত হয়ে নীল রঙ আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। অধিকাংশ নীল বা সবুজ রঙের পাখীদের পালকে নীল বা সবুজ পিগমেন্ট থাকে না। ন্যানোস্ট্রাকচার থেকে বিচ্ছুরিত নীল রঙ যদি হলুদ ক্যারটেনয়েডস পিগমেন্টের পাতলা স্বচ্ছ স্তর ভেদ করে আসে তবে পালকের রঙ সবুজ দেখাবে যেমন টিয়া (Parakeet) জাতীয় পাখীদের। আবার মেলানিনের স্তর ভেদ করে এলে জলপাই-সবুজ রঙ দেখাবে। এইভাবে পিগমেন্টের রঙ আর গাঠনিক রঙ মিশে পাখীর পালকে বর্ণবৈচিত্রের সৃষ্টি হয়। সাদা আলোকে সব রঙের মিশ্রণ ধরা হয় – পাখীর সাদা পালকে কোনও পিগমেন্ট না থাকায় আলোর শোষণ হয় না – তবে বহু ক্ষেত্রে ন্যানোস্ট্রাকচার থেকে সব আলো বিচ্ছুরিত হয়ে সাদা পালক আরও উজ্জ্বল দেখায়।

   

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে পালকের তিন শ্রেণীর গঠন আছে যা পাখীর গাঠনিক রঙের উৎস –

১) বিশেষত্বহীন, পিগমেন্টবিহীন কেরাটিনে অশৃঙ্খলিত বায়ু-বুদবুদের ন্যানোস্ট্রাকচার যা সব রঙের আলো বিচ্ছুরিত করে সাদা রঙ দেয়।

২) পালকের বার্বিউলসের কেরাটিনে মেলানিনের দানা ও বায়ু-বুদবুদের crystal lattice – এর মতন শৃঙ্খলিত ম্যাট্রিক্স গঠন যাতে আলো পড়ে দৃষ্টিকোনের উপর নির্ভর করে নানা রঙে ঝলমল করে।  

৩) পালকের বার্বসে medullary কোষে বিটা-কেরাটিন ও বায়ু-বুদবুদের স্পঞ্জের মতন বিশেষ গঠন যাতে আলো পড়ে প্রধানতঃ নীল এবং কখনও বেগুনী বা সবুজ রঙ দেখা যায়।  

বার্বিউলসের sub-microscopic গঠন ও পিগমেন্টের যৌথ সহযোগ ময়ূরের লেজের পালকের অসাধারণ উজ্জ্বল রঙের বাহারের উৎস। সাম্প্রতিককালে চীনের পদার্থবিদ Jian Zi Xiaochan Liu (Fudan University, Shanghai) এবং জাপানের Shinya Yoshioka ও Shuichi Kinosita (Osaka University, Japan) ময়ূরের পালকের রঙের উৎস নিয়ে যে গবেষণা করেছেন তার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে লেজের পালকের বার্বিউলসে মেলানিন দানা, কেরাটিন ও বায়ু-বুদবুদের কয়েকটি পাতলা স্তর থাকে এবং এর গঠন কৃস্ট্যালের গঠনের মতন শৃঙ্খলিত। এই পাতলা স্তরগুলিতে মেলানিন দানার সংখ্যা ও তাদের মধ্যেকার স্থানের পরিমাপের উপর নির্ভর করে সাদা আলো উজ্জ্বল নীল, সবুজ, সোনালী-হলুদ, বাদামী ইত্যাদি রঙে প্রতিফলিত হয় ঠিক যেমন ভাবে সাবানের স্বচ্ছ ফেনায় আলো পড়লে রামধনু রঙের সৃষ্টি হয় (thin-film interference)। কিন্তু ময়ূরের পালকে যে চোখের মতন সুন্দর নক্সা দেখা যায় তার কোনও ব্যাখ্যা তারা কেউ দিতে পারেন নি।

পাখীর ঠোঁটের রঙ প্রধানতঃ epidermal স্তরের মেলানিন ও ক্যারটেনয়েডস পিগমেন্টের ঘনত্বের উপর নির্ভরশীল। ইউমেলানিনের (eumelanin) জন্য কালো ও ছাই রঙ আর ফিওমেলানিনের জন্য সোনালী, মেটে লাল ও নানান শেডের বাদামী রঙ হয়। বিভিন্ন ধরণের ক্যারটেনয়েডসের উপস্থিতি ও তাদের সংমিশ্রণ ঠোঁটের লাল, কমলা ও হলুদ রঙের কারণ।

সাধারণতঃ পাখীর চোখের কনীনিকার রঙ ঘন বাদামী থেকে ঘন লাল, সাদা, হলুদ, নীল বা সবুজ হয়ে থাকে। প্রথাগতভাবে মনে করা হয় যে এই রঙ মেলানিন ও ক্যারটেনয়েডস পিগমেন্টের উপস্থিতির জন্য। কিন্তু এ ছাড়াও বহু পাখীর চোখে কৃস্ট্যাল গঠনের purinespteridines পাওয়া গেছে যা চোখের গাঠনিক রঙের উৎস।

আত্মরক্ষার স্বার্থে রঙ পাখীদের শত্রুর চোখের আড়ালে রাখে। প্যাঁচা (Owl), নাইটজার প্রভৃতি রাতচরা (Nightjar) ও চড়াই, মাঠচড়াই (Paddyfield Pipit), তুলিকা (Indian Tree Pipit) ইত্যাদি অনেক পাখীদের গায়ের রঙ বাদামি, ধুসর, হলদেটে বা তামাটে হয় ও তাতে ঘন রঙের নানান ছোপ থাকে  ও তার ফলে তারা তাদের পরিবেশের সাথে এমন মিশে থাকে যে চট করে নজরে আসে না। আবার বহু পাখীর পিঠের দিক ঘন রঙের হয়ে হাল্কা হতে হতে পেটের কাছে প্রায় সাদা হয়ে আসে। এর ফলে পিঠের দিক যেখানে বেশী আলো পড়ে সেখানে আলো শোষিত হয় ও পেটের দিক যেখানে আলো কম পড়ে সেখান থেকে আলো প্রতিফলিত হয় – এর ফলে উপরে-নীচে আলোর সমতার জন্য পাখীকে স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। একে বলে ‘countershading’। সাধারণতঃ যে সমস্ত পাখীরা খুব উজ্জ্বল রঙের তাদের দেখা যায় গাছের উপর, আকাশে বা জলে আর যাদের রঙের তেমন বৈশিষ্ট নেই তাদের দেখা যায় মাটির কাছাকাছি, ঝোপেঝাড়ে।

ও বাবা! পাখীর রঙের কথা ভাবতে ভাবতে এত বেলা হয়ে গেল? – পাখীদের ডাকাডাকিতে ভাঁটা পড়েছে। শুধু ও বাড়ির বেলগাছটায় গোটা কয়েক বুলবুলি (Red-vented Bulbul) সুরেলা গলায় ঝগড়া লাগিয়েছে আর তাদের নাকের ডগা দিয়ে একটা টেলড জ়ে প্রজাপতি অযথা ওড়াওড়ি করছে। রোদ বেশ চড়া উঠছে। দূর আকাশ থেকে চিল চিৎকার শোনা যাচ্ছে আর কোন ভিটের থেকে ঘুঘুর (Spotted Dove) ডাক ভেসে আসছে – ঠাকুর গোপাল ওঠো ওঠো ওঠো ওঠো! ♦

[এই প্রবন্ধটি ‘এখন আরণ্যক’ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০১৩) শারদীয়া সংখ্যায় প্রকাশিত।]

Advertisements