Call and Song of Birds

পাখিসব করে রব

সনৎ কুমার ব্যানার্জ্জী

 

 

রাতি পোহাইল – ঘুম ভাঙে আমার দূর হতে ভেসে আসা ট্রেনের হুইস্‌লের শব্দে, মসজিদের আজানের সুরে আর পাখির কলতানে। হুইস্‌লের শব্দ, আজানের সুর থেমে যায় – থামে না কাক, চড়াই, শালিক, টুনটুনি, বুলবুলি আর হাড়িচাঁচাদের কনসার্ট। সময় বুঝে যোগ দেয় কোকিল, বেনেবৌ আর দোয়েল। নাগরিক জীবনযাত্রায় এর চেয়ে বেশী আর কি আশা করতে পারি? জীবনের প্রথম সকালগুলোর ঘুমও কেড়ে নিয়েছিল ঐ কেলে ঝাড়ুদার পাখিটা – ‘কাক ডাকে কা কা, আগে ও পরে আ’ – শুরু হয়েছিল লেখাপড়া করে বড় হওয়ার মতন এক দুঃসহ জীবনযাত্রার। আর এই লেখাপড়া করতে করতে কেটে গেল জীবনের ষাটটিরও বেশী বছর – বড় হওয়ার ইঁদুর দৌড়ে পাখির গান কোথায় গেল হারিয়ে। আজ দায়-দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া জীবনসায়াহ্নের অবসরে সেই ‘প্রভাত পাখির গান’ এতদিন পরে না জানি কেন বড় ভাল লাগছে। শুধু দোয়েল-কোকিলের গান কেন নিস্তব্ধ নিদাঘের মধ্যদিনে ঘুঘুর ডাক বা চিলের চিৎকারও আজকাল খারাপ লাগে না।   

ডেকে বা নানাবিধ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শব্দ করে নিজের অস্তিত্বকে জানান দেওয়া অধিকাংশ প্রাণীরই ধর্ম কিন্তু মনের আনন্দে গলা ছেড়ে গান গাইতে মানুষ বাদে পাখি ছাড়া আর কোন প্রাণী পারে কি – প্রাণীবিদ্যাবিশারদরা বলতে পারেন। মশার গুন্‌গুন্‌, মাছির ভ্যানভ্যান, ভ্রমরের গুঞ্জনকে-তো আর গান আখ্যা দেওয়া যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হ’ল পাখি গান গায় কি করে – কোথা থেকে, কার কাছে, কি ভাবে শিখল এই গান গাওয়া? কোনও ওস্তাদজীর কাছে নাড়া বেঁধে নিশ্চয়ই গান শেখে না। বাবা-মা পাখিরা তাদের ছানাদের উড়তে শেখাতে স্বচক্ষে দেখেছি কিন্তু পাশে বসিয়ে গান শেখাতে কখনও দেখিওনি, কারো কাছে শুনিওনি। অবশ্য সব পাখি যে গান গায় তা’ নয় – সব মানুষই কি পারে? টেনিদার গান শুনে কোন এক কাবুলীওয়ালা নাকি আঁতকে উঠে ড্রেনে পড়ে গিয়েছিল। এ পারে কেকা মুখর হ’লে আঁতকে উঠে ও পারে গিয়ে পড়তে হয়।  গান গাইয়ে পাখির দল আলাদা। আর অবস্থা, পরিবেশ বা ঋতুভেদে একই পাখির ডাকেরও বিভিন্নতা আছে। মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম ভাষা আর ভাষার বহিঃপ্রকাশ ঘটে মুখনিঃসৃত ধ্বনির সাহায্যে। নানারকম পাখিদের নানারকম ভাষা আর তাই তাদের রাগ-অনুরাগ-বিবাদ-বিসংবাদ-সাবধান বাণী সব প্রকাশ পায় ডাকের বিভিন্নতায়। কোনও কোনও পাখি আবার অন্য পশুপাখির গলা নকল করতে ওস্তাদ। টিয়া-চন্দনা-ময়না-কাকাতুয়ারাতো কথা বলা পাখি – Talking Birds – মানুষের গলা নকল করে রীতিমত যেন কথা বলে আর তার ফল – পরিপাটি খাঁচায় নিরালা গৃহকোনে বন্দীজীবন – কেমনে আর বনের গান গায়?  

কিন্তু খাঁচার গানই হোক আর বনের গানই হোক, পাখি গান গায় কি করে আর একই পাখি নানা রকমে ডাকেই বা কেন এ নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। প্রত্যেক পাখির ডাকের নিজস্ব ধরণ আছে। কত সময়তো পাখিদের গাছের ডালে, পাতার ফাঁকে লুকিয়ে থাকার জন্য দেখাই যায় না। কিন্তু  ডাক শুনে তাদের সনাক্ত করা সম্ভব হয়। ঘন পাতার ফাঁকে লুকিয়ে পরিত্রাহিতে চিৎকার করে ‘চোখ গেল’ ‘চোখ গেল’ করে মাথা ধরিয়ে দেয় তা’বলে সহজে কি এই পাপিয়া বা চোখ গেল (Common Hawk Cuckoo বা Brain Fever Bird) পাখিটাকে দেখা যায়? তাই পাখি দেখা, পাখির ছবি তোলা ছাড়াও পাখির ডাক ও গান রেকর্ডিং করা ও তার চর্চ্চা করা কোনও কোনও পক্ষী-পর্যবেক্ষকদের নেশা এবং পক্ষীবিজ্ঞানের গবেষনার বিষয়-তো বটেই।   

মানুষের নানা ভাষা আছে – যা বর্ণ, শব্দ, অর্থ ও ব্যাকরণের নিয়ম মেনে মানুষ চিন্তা করে, কথায় বা লেখায় তার ভাব প্রকাশ করে। এই মৌখিক ভাষা ছাড়াও মানুষ তার বিভিন্ন ভাব প্রকাশ করতে পারে যা ‘বিনি ভাষায় উক্ত’ (Non-verbal communication)। পাখিদেরও পরস্পরের প্রতি ভাবের আদান-প্রদানের জন্য নিজস্ব ভাষা আছে যার প্রকাশ হয় তাদের গান ও ডাকের মধ্য দিয়ে। তবে তাদের ভাষা মানুষের ভাষার মতন জটিল নয়। ব্যাকরণ একটা আছে বটে তবে তাতে সমাস-কারক-প্রত্যয়-বিভক্তির বা কোনও Tense-preposition-conjungtion এর উৎপাতটা নেই। পাখিরা চিন্তা-ভাবনা করে বা অতীতের কথা মনে করে বা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করে কিছু বলে বোলে মনে হয় না – তাদের সব ভাব প্রকাশই তাৎক্ষণিক অনুভবজনিত। মূহুর্তকালীন মেজাজ প্রকাশ পায় তাদের ডাক আর গানের মধ্য দিয়ে।

এখন পাখির ডাক আর গানের মধ্যে তফাৎ কোথায়?

পাখির ডাক (Call) সাধারণতঃ সংক্ষিপ্ত ধ্বনি (Mono-syllable), সাধারণ গঠনের শব্দ যেমন কা কা বা চির্প চির্প বা বকম বকম ইত্যাদি। আর গান (Song) হোলো একটু দীর্ঘ সুরেলা ধ্বনি যা পাখির ডাকের তুলনায় জটিল যেমন কোকিলের কুহুতান বা দোয়েলের, শ্যামার শিষ। সব পাখি গাইতে পারে না। গাইয়ে পাখির দল আলাদা – সাধারণতঃ তারা Passeriformes (Perching birds বা দাঁড়ে বসা) গোষ্ঠির। অর্থাৎ পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক পাখিই গাইতে পারে না – তবে তারা ডাকতে পারে। আবার সব পাখিই যে ডাকতে পারে তাও নয় – সারস (Stork) জাতীয় কিছু পাখি আছে যারা মূক অর্থাৎ গলার স্বর নেই কিন্তু ঠোঁটে ঠোঁটে (ঠোঁটতালি দিয়ে!) আঘাত করে শব্দ করতে পারে।     

পদার্থ বিজ্ঞানের ভাষায় শব্দ এক ধরণের শক্তি যা পদার্থের কম্পনের ফলে সৃষ্টি হয় ও বায়বীয়, তরল বা কঠিন পদার্থের মধ্য দিয়ে তরঙ্গাকারে প্রবাহিত হয়। শব্দ-তরঙ্গের প্রবাহের সময়ে মাধ্যমের সকল কণা স্পন্দিত হতে থাকে ও সেকেন্ড-প্রতি একবার স্পন্দনকে এক হার্জ (Hertz) বলা হয় যা শব্দ-তরঙ্গের একক। এই শব্দতরঙ্গ মানুষের কানের ভেতর যে স্পর্শকাতর পর্দা আছে যাকে কর্ণপটহ (Ear Drum বা Tympanic Membrane) বলে – তাকে স্পন্দিত করে এবং সেই স্পন্দন মধ্যকর্ণ ও অন্তঃকর্ণের মধ্য দিয়ে নানাভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে মস্তিস্কে পৌঁছলে আমাদের শব্দের অনুভুতি হয় বা আমরা শব্দ শুনতে পাই। কোনও স্পন্দিত পদার্থের সেকেন্ড-প্রতি স্পন্দন সংখ্যাকে বলে কম্পাঙ্ক (frequency)। সাধারণভাবে মানুষ ২০ হার্জ থেকে ২০,০০০ হার্জ কম্পাঙ্কবিশিষ্ট শব্দ কানে শুনতে পায়। কিন্তু পাখিদেরতো আমাদের মতন কান দেখতে পাই না। পাখিদের কি কান নেই? তারা কি শুনতে পায় না? তা’ কেন? পাখিদেরও কান আছে  শুনতেও ভালই পায় – না হ’লে আর হুস হুস করলে কাকটা পালায় কেন? পাখিদের আমাদের মতন কানের পাতা থাকে না – সে যায়গায় থাকে শুধু ছিদ্র – তাও আবার ভালরকমভাবে পালক দিয়ে ঢাকা– আর এই কানঢাকা পালকগুলিকে বলে অরিকিউলার (Auricular)। এর মস্ত সুবিধা আছে। পাখিরা যখন আকাশে ওড়ে – তাদের গতিবেগ থাকে খুব বেশী আর বিপরিত দিক থেকে প্রবল বাতাসের ঝাপটা তাদের শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। ফলে তারা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পারে না। এ ক্ষেত্রে এই অরিকিউলারগুলো কানঢাকা মাফলারের কাজ করে। এ ছাড়া যে সব পাখি জলে মাথা ডুবিয়ে খাবার খোঁজে যেমন হাঁস, পানকৌড়ি জাতীয় জলের পাখিরা বা মাছরাঙ্গা জাতীয় যারা জলে ডাইভ দিয়ে মাছ শিকার করে তাদের ক্ষেত্রে এই অরিকিউলার জল ও জলের চাপ থেকে কানকে রক্ষা করে। কোন কোন পাখির শ্রবণশক্তি খুবই তীক্ষ্ণ যেমন লক্ষ্মী প্যাঁচা (Barn Owl)। এদের কানের ছিদ্রের আকার প্রায় চোখেরই মতন। ঘন অন্ধকারেও শুধু মাত্র প্রায় নিঃশব্দ চলাফেরার শব্দতেই এরা শিকার ধরতে পারে। পাখিরা যদিও ৫০ হার্জেরও কম কম্পাঙ্কের শব্দ থেকে আরম্ভ করে ১২০০০ হার্জ কম্পাঙ্কবিশিষ্ট শব্দ শুনতে সক্ষম, ১০০০ হার্জ থেকে ৫০০০ হার্জ পর্য্যন্ত কম্পাঙ্কের শব্দে সর্ব্বাধিক সংবেদনশীল।

আমরা যে কথা বলি, গান করি বা নানাবিধ মৌখিক শব্দ করি তার উৎস স্বরযন্ত্র (Larynx) যার অবস্থান শ্বাসনালীর (Trachea) উপর দিকে। স্বরযন্ত্রের মধ্যে থাকে একজোড়া স্থিতিস্থাপক পর্দা যার নাম স্বরতন্ত্রী (Vocal Chords বা Vocal folds) যা ফুসফুসে বাতাস ঢোকার ও বেরোবার দরজা হিসাবে কাজ করে। এই পর্দাদুটো যে ছিদ্রপথকে বন্ধ করে বা খোলে তাকে বলে স্বররন্ধ্র (Glottis) (চিত্র – ১)। এই পথ দিয়েই শ্বাসবায়ু ফুসফুসে যাতায়াত করে। আমরা যখন শ্বাস-প্রশ্বাস নিই তখন স্বররন্ধ্রের পথ উন্মুক্ত থাকে। কিন্তু কথা বলা বা গান করার সময়ে আমাদের কন্ঠ হ’তে যে ধ্বনি নির্গত হয় তার প্রকৃতি অনুযায়ী স্বরতন্ত্রীদের সঙ্কোচন-প্রসারণ হয় এবং ফলে স্বররন্ধ্রের ছিদ্র ছোট-বড় হয়। স্বররন্ধ্র যখন সম্পূর্ণ বন্ধ হয় তখন ফুসফুস থেকে বাতাস বেরোতে পারে না ও কোনোও ধ্বনিও তৈরী হয় না। কিন্তু স্বররন্ধ্র যখন আংশিক বন্ধ থাকে তখন প্রবাহিত শ্বাসবায়ুর চাপের বিভিন্নতার জন্য স্বরতন্ত্রী দুটো সঙ্কুচিত-প্রসারিত হয় ও  তিব্রভাবে বা মৃদুভাবে বিভিন্ন কম্পাঙ্কে স্পন্দিত হতে থাকে যাকে নিয়ন্ত্রণ করে স্বরযন্ত্রের ভেতরের পেশীসমূহ ও এর ফলে বিভিন্ন ধ্বনির সৃষ্টি হয়। কন্ঠ হতে নির্গত শব্দতরঙ্গ আবার কন্ঠ, তালু, মূর্ধা, দাঁত, ঠোট, জিভ ও নাকের সাহায্যে বিবিধ রকমের বর্ণ (স্বরবর্ণ ও ব্যাঞ্জনবর্ণ) সৃষ্টি করে। বর্ণের সমন্বয়ে অর্থযুক্ত শব্দ, শব্দ ও ব্যাকরণের সমন্বয়ে বাক্য ও বাক্যের সমন্বয়ে কথা আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করে। কথায় সুর সংযোজিত হয়ে সৃষ্টি হয় গান।  

কোনও সুনির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের ধ্বনিকে বলে সুর (Tone) আর একাধিক সুরমিশ্রিত ধ্বনিকে বলে স্বর (Note)। স্বরের মধ্যে সর্ব্বনিম্ন কম্পাঙ্কের সুরকে বলা হয় মৌলিক সুর (Fundamental tone) আর তার চেয়ে চড়া সুরকে বলে উচ্চসুর (over tone)। মানুষ হাসে, কাঁদে, চিৎকার করে, কথা বলে, গান গায় – হরবোলারা মুখে কত রকমের শব্দের অনুকরণ করে। কারোর গলার স্বর মোটা, কারোর বা চিকন সরু। কখনো জোরে কথা হয় কখনো নিচুস্বরে – কখন বা ফিসফিস করে। এই সকল রকম ধ্বনির উদ্ভব হয় স্বরতন্ত্রী দুটোর বিভিন্ন কম্পাঙ্কের স্পন্দনে।  

জন্মাবধি মানুষের গলায় একটা মৌলিক সুর থাকে। এই মৌলিক সুর দিয়েই একজন মানুষের গলা চেনা যায়। এই মৌলিক সুরের কম্পাঙ্ক কম হলে গলার স্বর মোটা আর বেশী হলে স্বর সরু বা চিকন হয়। সাধারণতঃ এই মৌলিক স্বরের কম্পাঙ্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে ৮৫ থেকে ১৫৫ হার্জ, মহিলাদের ক্ষেত্রে ১৬৫ থেকে ২৫৫ হার্জ আর শিশুদের ক্ষেত্রে ২৫৫ থেকে ৩০০ হার্জ বা তার বেশীও হয়ে থাকে। অবশ্য মানুষের স্বরতন্ত্র আরও উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ সৃষ্টি করতে সক্ষম। মৌলিক স্বরের কম্পাঙ্ক কম হওয়ার কারণে পুরুষদের গলার স্বর হয় মোটা আর বেশী হওয়ার দরুন মহিলাদের হয় চিকন। মানুষ যখন জোরে কথা বলে তখন কিছুটা বাড়তি শক্তি প্রয়োগের ফলে শব্দতরঙ্গের বিস্তার (Amplitude) বেড়ে যায় – কম্পাঙ্কের হেরফের ঘটে না।   

পাখিদের ব্যাপারই আলাদা। তাদের স্বরযন্ত্রের অবস্থান আমাদের মতন শ্বাসনালীর উপরদিকে নয় – বরঞ্চ নিচের দিকে। আর তার নাম সিরিঙ্কস (Syrinx)। পাখিদের শ্বাসনালীর শেষপ্রান্তে যেখানে শ্বাসনালী দু’ভাগ হয়ে দু’টি পথ দু’টি দিকে বেকে দু’টি ফুসফুসে চলে গেছে – সেই তিন মাথার মোড়ে এর অবস্থান। এটি একটি বিশেষ ধরণের মাংস পেশী (Syringeal Muscles) জড়ানো স্থিতিস্থাপক ঝিল্লি দিয়ে তৈরী কুঠরি। এর ভেতরে আছে একটা ছোটো বাতাস ভরা থলে (Clavicular air sac) যার উপরি ভাগে আছে অর্ধচন্দ্রাকৃতি ঝিল্লি দিয়ে জড়ানো কার্টিলেজ – পেসুলাস (Pessulus), যা পাশাপাশি দ্রুত স্পন্দিত হতে পারে ও ফুসফুস থেকে আসা বাতাসের প্রবাহকে প্রভাবিত করে। সিরিঞ্জিয়াল পেশীগুলো সিরিঙ্কসকে নিয়ন্ত্রন করে।

পাখিদের নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়ে বাতাস যায় দুটো ফুসফুস সংলগ্ন কয়েকটি বাতাস-থলেতে (Air sac) আর সেখান থেকে ফুসফুসের ভেতর দিয়ে ক্লোমশাখাদ্বয় (Bronchii), সিরিঙ্কস ও শ্বাসনালী (Trachea) হয়ে বেরিয়ে আসে। পাখিরা যখন ডাকে – তখন বুক ও পেটের পেশীদের সংকোচনের ফলে ফুসফুস থেকে বাতাস ক্লোমশাখাদ্বয়, সিরিঙ্কস ও শ্বাসনালীর সরু পথ দিয়ে জোরে প্রবাহিত হয়। এর ফলে সিরিঙ্কস-এর দেয়ালরূপ ঝিল্লিগুলোর কোন কোন অংশ বা পুরোটাই এবং পেসুলাস প্রভৃতি স্পন্দিত হয়ে শব্দের সৃষ্টি করে।

সিরিঙ্কস হ’তে সৃষ্ট শব্দতরঙ্গকে একটা পাখি দু’ভাবে বদলাতে পারে। এক – সিরিঞ্জিয়াল পেশীগুলোকে নিপুনভাবে নিয়ন্ত্রিত করে সিরিঙ্কস-এর ঝিল্লিগুলোর টান ও অবস্থানের পরিবর্তন করতে পারে ও এর ফলে শব্দতরঙ্গের কম্পনাঙ্কের হ্রাস-বৃদ্ধি হয়ে কর্কশ বা উচ্চ ও তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকতে পারে। আর দুই – ফুসফুস থেকে আসা বায়ুর চাপ কম-বেশী করে গলার আওয়াজ জোরে বা আস্তে করতে পারে। যেহেতু বিভিন্ন পাখির ক্ষেত্রে শ্বাসনালীর আয়তন ও গঠনের তারতম্য আছে তাই শ্বাসনালীতে (Wind-pipe) শব্দের সৃষ্ট অনুরণন (Resonance) পাখির কন্ঠস্বরকে প্রভাবিত করে।

সাধারণতঃ একটা পাখির যত বেশী সিরিঞ্জিয়াল পেশী থাকবে তত তার পক্ষে বিভিন্ন ভাবে ডাকা বা গান করা সম্ভব হবে। পায়রার এক জোড়া সিরিঞ্জিয়াল পেশী থাকে আর সে মুখ বন্ধ করে গলা দিয়ে বকবকম বকবকম এর মতন আওয়াজ করে। অপরদিকে গায়ক পাখিদের পাঁচ থেকে নয় জোড়া সিরিঞ্জিয়াল পেশী থাকে। পাখিদের ডাকের ধরন আবার কতকটা নির্ভর করে তাদের দৈহিক গঠনের উপর। ছোট ছোট পাখিরা উচ্চ কম্পাঙ্কের তীক্ষ্ণ একস্বরা শব্দ করে ডাকে যেমন চির্প বা পিপ। আবার লম্বা গলা রাজহাঁস বা পেলিকানদের লম্বা শ্বাসনালীতে অনুরনণের জন্য তাদের ডাক অনেকটা ভেঁপুর মতন।

সিরিঙ্কসের দুটি ভাগ দুটি ক্লোমশাখায় অবস্থিত এবং এই দুটি ভাগই শব্দ সৃষ্টি করতে সক্ষম। এর অর্থ একটি পাখি একই সময়ে দুটি ভিন্ন সুরে গাইতে পারে – এমন কি একই সাথে সে দ্বৈতকন্ঠেও গাইতে পারে। কিছু কিছু পাখি আছে যেমন থ্রাস (Thrush) জাতীয়, যারা একই সাথে একদিকে ক্রমোচ্চ স্বরে ও অপরদিকে ক্রমনিম্ন স্বরে ডাকতে বা গাইতে সক্ষম। অনেক পাখি তাদের এই দ্বৈত কন্ঠস্বরকে বিভিন্ন ভাবে ব্যবহার করে যথা একপাশ দিয়ে নিম্নসুর ও অপর পাশ দিয়ে উচ্চসুর সৃষ্টি করা অথবা এক দিক দিয়ে ডাকা ও অপর দিক দিয়ে শ্বাস গ্রহণ করা ইত্যাদি। কোন কোন পাখি আবার পর্যায়ক্রমে দুই পাশে দ্রুত স্বর বদল করতে পারে। এই ধরণের ক্ষমতার ফলে কিছু পাখি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিরিশটি বা তারও অনেক বেশী পৃথক স্বরে গাইতে পারে। কন্ঠ হ’তে পাখিরা যে শব্দ সৃষ্টি করে তার কম্পাঙ্কের প্রসার ১০০০ হার্জ থেকে ৮০০০ হার্জ অবধি হতে পারে অর্থাৎ মানুষের কানে যে শব্দ বেশ শ্রুতিমধুর হয়।

নানা পাখির নানা ভাষা – নানা রকম ডাক। গাইয়ে পাখিদের কথা তো বাদই দিলাম। তাদের আবার “সুরে সুরে কত প্যাঁচ গিটকিরি ক্যাঁচ ক্যাঁচ”। আবার একই পাখির কত রকম ডাক – মনের নানা রকম ভাব প্রকাশ করতে হবে তো। প্রত্যেক ধরণের ডাকের আলাদা রকম বিশেষত্ব আছে এবং অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পাখি তার ডাকের ধরণ বদলায়। পাখিদের এই বিভিন্ন রকমের ডাককে কয়েকটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে।  

বিপদ সঙ্কেত ধ্বনি বা বিশেষ বিপদ সঙ্কেত ধ্বনি (Alarm Call) / সঙ্কটাপন্ন অবস্থার ধ্বনি (Distress Call) / আক্রমনাত্মক ধ্বনি (Aggressive Call) / এলাকা রক্ষার ধ্বনি (Territorial defense Call)    –

পাখিদেরতো আর শত্রুর অভাব নেই। নানাবিধ শত্রুর হাত থেকে আত্মরক্ষা করে তাদের চলতে হয়। কোন পাখি যখন কোন বিপদের আশংকা করে বা শত্রুর মুখোমুখি হয় তখন তারা বিশেষভাবে ডাকে। এই বিপদ-সঙ্কেত ধ্বনিগুলো সাধারণতঃ সংক্ষিপ্ত অথচ তীব্র ও তীক্ষ্ণ স্বরবিশিষ্ট হয় যা অনেক দূর থেকেও শোনা যায় যাতে দলের বা অন্যান্য পাখিরাও সাবধান হয়ে যায়। বিপদের গুরুত্ব বুঝে অর্থাৎ শত্রু নিকটে এসে গেলে বা আক্রমন করলে সঙ্কেত ধ্বনির দ্রুত লয়ে পুনরাবৃত্তি হতে থাকে। কখনও বা পাখি এলাকা দখলের জন্য বা রক্ষার জন্য স্বয়ং আক্রমনাত্মক হয়ে শত্রুকে তাড়া করার সময়ে এ ধরণের ডাক ডেকে থাকে।  

সংযোগ-রক্ষা ধ্বনি (Flock Call) – পাখিরা যখন দল বেঁধে চলে তখন পরস্পরের সাথে সংযোগ রক্ষার জন্য মাঝারি রকম জোড়ে সাধারণ ভাবে ডাকে – কখনওবা খাবারের উৎসের সন্ধান পেলে জানান দেয়।

উড়ান-ধ্বনি (Flight Call) – অনেক পাখি ঝাঁকে বা একা উড়ে যেতে যেতে কখনো কখনো নির্দিষ্ট ভাবে ডাকতে ডাকতে যায়। এই বিশেষ ডাকটি শুধুমাত্র ওড়ার কালে ডাকে বলে একে উড়ান ধ্বনি বলে। এই ধ্বনি কতকটা সংযোগ রক্ষা ধ্বনির মতন তবে কিছুটা তিব্র অথচ সুরেলা। অনেক পাখিদের ক্ষেত্রে বিশেষতঃ উড়ন্ত পরিযায়ী পাখিদের ক্ষেত্রে এই ডাকটাই বেশী শোনা যায় আর এই ডাকের বৈশিষ্ট দিয়েই কি পাখি তা না দেখেও চিহিত করা যায়। নিদাঘের নিস্তব্ধ দুপুরে দূর আকাশ থেকে ভেসে আসা চিলের ডাক শুনে বলে দিতে হয় না ওটা কি পাখি।  

খিদের ডাক (Begging Call)  – সাধারণতঃ পাখির ছানারা খিদে পেলে মা-বাবার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য একটু নিম্নস্বরে ঘ্যানঘ্যানে কিচমিচ শব্দ করে থাকে যাকে বলা যেতে পারে খিদের ডাক ।

পাখির গান (Song)  – প্রাণীজগতে পাখির বিশেষত্ব প্রধাণতঃ দুটি কারণে – পাখি উড়তে পারে আর গান গাইতে পারে। হাতে গোণা কয়েকটা বড় পাখি ছাড়া সব পাখিই উড়তে পারে। আর গায়ক পাখিদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। সারা পৃথিবীতে যত পাখি আছে তাদের মোট ২৩টি বর্গ (Order), ১৪২টি গোত্র (Family), ২০৫৭টি গণ (genus) এবং ৯৭০২টি প্রজাতিতে (species) বিন্যস্ত করা হয়েছে। হিসাবে অল্পস্বল্প এদিক ওদিক হতে পারে। এদের মধ্যে সবথেকে বড় বর্গ হোল Passeriformes যাকে বলে দাঁড়ে বসা পাখি । এদের পায়ে চারটে আঙ্গুল – তিনটে সামনের দিকে আর একটা পেছনের দিকে – যার প্রজাতি সংখ্যা প্রায় ৫৭০০। এই দলে প্রায় ৪০০০ প্রজাতির পাখি আছে যারা গায়ক পাখি বলে পরিচিত (Oscines or Songbirds)।  

পাখির বিভিন্ন ধরণের ডাকের মধ্যে গান হ’ল সবথেকে বৈশিষ্টপুর্ণ ও পরিচিত শব্দ। সাধারণভাবে গানগুলি একটু দীর্ঘায়িত, জটিল ও সুরারোপিত হয়ে থাকে। গান গাইবার ক্ষমতা পাখির কিছটা সহজাত আর কিছুটা শুনে শুনে শেখা। সাধারণতঃ পুরুষ পাখিরাই গান গায় তবে ব্যাতিক্রমের সংখ্যা খুব কম নয় – অনেক প্রজাতির স্ত্রী পাখিরাও গান গায়। পাখির গানের উদ্দেশ্য প্রধাণতঃ প্রজনন ঋতুতে সঙ্গী আকর্ষণের জন্য আর এলাকা দখলের নিমিত্ত নিজেকে বিজ্ঞাপিত করা বা তার এলাকায় তারই প্রজাতির অপর কোন অনুপ্রবেশকারীকে নিরুৎসাহিত করা। প্রত্যেক প্রজাতির পাখির গানের বিশিষ্টতা আছে আর এই গানের  মান, স্থায়িত্ব এবং সুর বা ছন্দের বদল পাখির বয়স, লিঙ্গ, ভৌগলিক অবস্থান, ঋতু ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীল। গায়ক পাখি দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে গাইতে পারে, কোন কোন পাখি শুধু সকালে আর বিকেলের সময়ে গায় আর  কেউ বা সারাদিনই গান গায়। ভোর বা সকালের দিকে পাখিদের গানের এক ঐকতান শোনা যায় বিশেষ করে বসন্তকালে যাকে বলে প্রভাতী সঙ্গীত (Dawn Chorus)। আসলে সারা রাত বিশ্রামের পর ভোরবেলা শরীরটা তাজা থাকে, সকালের পোকামাকড়ের জলখাবারটা ভালই মেলে। সঙ্গিনীকে আকর্ষণের জন্য ও আগেভাগে যে যার এলাকা দখলের জন্য শুরু করে দেয় জলসা। তা ছাড়া সকালবেলায় প্রকৃতি কিছুটা নিস্তব্ধ থাকে, বাতাসের গতিবেগ থাকে মন্থর, কোন রকম আলোড়ন থাকে না – ফলে পাখির গানটাও অনেক দূর থেকে বেশ ভালভাবেই শোনা যায়। কারুর কারুর আবার বসন্তকালে বা প্রজনন ঋতুতে গলা খোলে। কোন কোন ওস্তাদ গায়ক আবার অন্য পাখিদের গলাও নকল করতে পারে। আমাদের আশেপাশে খুব পরিচিতদের মধ্যে দোয়েল, কোকিল, পাপিয়া, বুলবুলি, টুনটুনি, দামা, বেনেবৌ, ফটিক জল, চড়াই – এরা প্রতিষ্ঠিত গায়ক পাখি। অন্যান্য ভারতীয় পাখি যেমন শ্যামা, মালাবার হুইসলিং থ্রাস, বিদেশী পাখিদের মধ্যে ক্যানারি, রবিন, নাইটিংগেল, মকিংবার্ড, চাইনিজ হোয়ামি থ্রাস বিশ্বের সেরা গায়কপাখি রূপে গণ্য হয়।   

অনেক প্রজাতির পুরুষ পাখিরা সাধারণতঃ কোন উঁচু গাছের ডাল, ইলেকট্রিকের তার বা পোস্টে বসে গান করে আর তার ফলে তার গান অনেক দূর থেকেও শোনা যায়। যে সব পাখি ঘাসজমিতে বিচরণ করে তাদের ডাক সাধারণতঃ ওড়বার কালে শোনা যায়। যারা বনে বা ঘন গাছপালার আড়ালে থাকে তাদের গানের গলার জোড় বেশী হয় কারণ শব্দের অনেকটা গাছপালা শুষে নেয়। পাখির গানের ওপর আবহাওয়ারও প্রভাব আছে। খুব গরমে বা ঠান্ডায়, প্রবল ঝড়বাতাসে কি আর পাখি গান গায়?  

শুধু কি গায়ক পাখি? তোতা জাতীয় পাখি যেমন টিয়া, ময়না, কাকাতুয়া, ম্যাকাও – এরা আবার মানুষের গলা এমনভাবে নকল করতে পারে মনে হয় যেন কথা বলছে। সত্যি কথা বলতে পাখিরা কখনই মানুষের মতন ভেবে চিন্তে কথা বলে না। এরা আসলে কোন শব্দ শুনে শব্দের অনুকরণ করতে পারে। এ জাতীয় পাখিগুলোকে মানুষ সাধারণত খাঁচায় পোষে। মানুষের সাথে সামাজিক পরিবেশে থাকার কালে মানুষের টুকরো টুকরো কথা বা ছোট ছোট বাক্য সে অনুকরণ করে ডাকে। তবে অন্যান্য পাখিদের তুলনায় এরা যথেষ্ট চালাক ও বুদ্ধিমান হয়। এরা দ্রুত শিখতে পারে আর বহুসংখ্যক শব্দতালিকা মনে রাখতে পারে। তোতা জাতীয় পাখিদের জিভ মোটা আর মানুষের আঙুলের মতন হওয়ায় তাকে চালনা করে আর অনেকটা নিম্নস্বরে শব্দ সৃষ্টি করতে পারে বলে মানুষের কথা অনুকরণ করতে সক্ষম হয়।   

পক্ষীবিজ্ঞানে পাখির ডাক রেকর্ড করা আর তার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও চর্চ্চা করা হয়ে থাকে। গত প্রায় সত্তর বছরে ক্রমান্বয়ে ভয়েস রেকর্ডিং সিস্টেমের প্রযুক্তিগত উন্নতি ও উন্নততর প্রজন্মের কম্পিউটার ও সফটওয়্যারের বিকাশের ফলে পাখীর ডাক ও গানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে। যে পদ্ধতিতে পাখির ডাক বা গান বিশ্লেষণ করা হয়ে থাকে তাকে বলা হয় সোনিক অ্যানালিসিস বা অডিও স্পেক্ট্রোগ্রাম অ্যানালিসিস। এই পদ্ধতিতে পাখির ডাক বা গান জনিত যে শব্দতরঙ্গের সৃষ্টি হয় সময়ের সাথে তার বিস্তারের ও কম্পনাঙ্কের ক্রম-পরিবর্তনকে রেখচিত্রের (Sonogram) মাধ্যমে চিত্রিত করা হয় ও তার বিশদ বিশ্লেষণ করা হয়। কখনও আবার বিস্তারের ও কম্পনাঙ্কের রেখচিত্র পরীক্ষা করা হয়। এই ধরণের রেখচিত্রে পাখীর বিভিন্ন রকমের কন্ঠস্বরকে যেমন শিস, স্বরের কম্পন, কর্কশ স্বর বা একমাত্রার ডাক যথা চিপ বা অনুনাসিক শব্দ যথা কোয়াক ইত্যাদি আলাদা ভাবে চিহ্নিত করা যায়। গায়ক পাখিদের দ্রুত স্বরের পরিবর্তনের পার্থক্য নিরূপন করা সম্ভব।     

পাখির ডাকের চারটি মৌলিক প্যাটার্ন হ’ল Phrases, Series, WarblesTrill – এর মধ্যে ফ্রেসেস, সিরিজ বিলম্বিত লয়ের ধ্বনি যার স্বতন্ত্র স্বরগুলিকে গণনা করা যায়। ফ্রেসেসে যে স্বর থাকে তার পুনরাবৃত্তি হয় না কিন্তু সিরিজের স্বরগুলির পুনরাবৃত্তি হয়। ওয়ারবল্‌স (কলনাদ) বা ট্রিল (স্বরের কম্পন) দ্রুত লয়ের যার স্বরগুলি গণনা করা যায় না (প্রতি সেকেন্ডে আটটিরও বেশী)। এই দ্রুত লয়ে একক স্বরগুলি একসাথে ধ্বনিত হয়ে একটি ওয়ারবল্‌স পরিণত হয় ও অনুরূপ ওয়ারবল্‌সগুলি মিলে আবার একটি ট্রিল সৃষ্ট হয়।         

পাখির কন্ঠঃনিসৃত ধ্বনি সনাক্তকরণে কম্পাঙ্কের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ কি ভাবে কম্পাঙ্কের পরিবর্তন সাধিত হয়। পাখির ডাকের বা গানের যে সকল দৃষ্টিকোন থেকে কোন প্রজাতির পাখিকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায় তা হ’ল – কম্পাঙ্কের বিন্যাস, লয় (দ্রুত অথবা বিলম্বিত), পুনরাবৃত্তি, বিরতি এবং স্বরের গুণমান যা অডিও স্পেক্ট্রোগ্রাম থেকে গুণগত (Qualitative) ও মাত্রিক (Quantitative) উভয়ভাবেই নিরূপণ করা যায়। এ জাতীয় চর্চ্চায় দেখা গেছে, পাখিরা যে ধ্বনি সৃষ্টি করে তার এক নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক সারি থাকে। প্রত্যেক প্রজাতির পাখির একটি বিশিষ্ট কম্পাঙ্ক থাকে যার প্রাধান্য সবচেয়ে বেশী।     

প্রতিটি প্রজাতির প্রতিটি পাখির বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ডাকার বা গাইবার জন্য বিভিন্ন ধরণের ডাক বা গানের সম্ভার (Repertoire) থাকে যাকে তার গীতসম্ভার বা গানের ঝুলি বলা যেতে পারে যার প্রতিটি ডাক বা গান বিশেষ কোন বার্তা বহন করে নিয়ে যায়। গায়ক দলের পুরুষ পাখিদের গানের ঝুলিতে দুই বা ততোধিক গান থাকে যাদের প্রত্যেকের স্বর ও তার বাঁধাধরা লয়, পুনরাবৃত্তি ইত্যাদি মিলে একটি নির্দিষ্ট গান তৈরী হয়।  কোন কোন নামজাদা গায়ক পাখির ঝুলিতে অসংখ্য গান থাকে। এর চরমসীমার উদাহরণে বলতে হয় উত্তর আমেরিকার পুরুষ ব্রাউন থ্রাসার পাখি (Toxostoma rufum) যার ঝুলিতে আছে প্রায় এক হাজারেরও বেশী গান। ইউরেশিয়ান রেন (Troglodytes troglodytes) পাখি  প্রতি মিনিটে সাতশ চল্লিশটি ভিন্ন রকমের স্বরে গাইতে পারে যা প্রায় পাঁচশ মিটার দূর থেকে শোনা যায়। পাখিটির আকার প্রায় দশ সেন্টিমিটারের মতন – যদি মানুষের আকারের হ’ত তা হ’লে এ গান চার-পাঁচ মাইল দূর থেকে শোনা যেত – সেই ভীষ্মলোচন শর্মার মতন – “আওয়াজখানা দিচ্ছে হানা দিল্লি থেকে বর্মা”। চিত্র ৩ ও ৪ এ দুটি পাখির গানের সোনোগ্রাম চিত্রের নমুনা। কোকিলের গানের তুলনায় ইউরেশিয়ান রেনের গান যে কত জটিল তা শুধু চিত্র দেখেই বোঝা যায়।

চিত্র – ৩ (ক)  কোকিলের গানের সোনোগ্রাম চিত্র (সময় ১ মিনিট)

 

চিত্র – ৩(খ) কোকিলের গানের সোনোগ্রাম চিত্র (সম্প্রসারিত)

 

চিত্র – ৪ (ক)  ইউরেশিয়ান রেন পাখির গানের সোনোগ্রাম চিত্র (সময় ১ মিনিট)

 

চিত্র – ৪ (খ)  ইউরেশিয়ান রেন পাখির গানের সোনোগ্রাম চিত্র (সম্প্রসারিত)

এক একটা পাখিকে দেখা যায় কি রকম মাথা ঝাঁকিয়ে সারা শরীর ঝাঁকিয়ে, লেজ নাচিয়ে, গলা ফুলিয়ে ডাকে বা গান করে থাকে। আসলে ডাকা বা গান করার সময়ে পাখিদের শরীরের যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি খরচ হয়। কোন প্রাণীর শরীরে তার সম্পূর্ণ নিশ্চল অবস্থায় যে শক্তি খরচ হয় অর্থাৎ শ্বাসপ্রশ্বাস ও শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে – তাকে বলে মৌলবিপাকের হার (Basal Metabolic Rate) । ডাকা বা গান গাইবার কালে পাখির শরীরে যে শক্তি খরচ হয় তার পরিমাণ মৌলবিপাকের হারের ১.২ – ১.৪ গুণ। এই গবেষণালব্ধ তথ্য অবশ্য খাঁচার পাখিদের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রাপ্ত। মুক্ত পাখিদের ক্ষেত্রে এ জাতীয় ল্যাবরেটরি-পরীক্ষা সম্ভবপর হয় না।  

বর্তমানে বিশ্বের অনেক শিক্ষামূলক ও গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানে পক্ষীশব্দতত্ত্ব (Bird Acoustics) নিয়ে বিভিন্ন ধরণের যেমন পাখির ডাকের বা গানের গাঠনিক বৈশিষ্ট, পাখির গলায় গানের উদ্ভব কি ভাবে হয়, ডাক বা গানের সাথে তার পেশীর, স্নায়ুর বা বিপাকিয় প্রক্রিয়ার কি ভূমিকা, পরিবেশ ও পাখির সাময়িক আচরণের সাথে পাখির ডাক বা গানের সম্বন্ধ, ডাক বা গান কি করে নিশ্চিতভাবে পাখিকে চিহ্নিত করতে পারে, বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে ক্রমবিবর্তনমূলক সম্পর্ক (Phylogenetic Reltionship), সামাজিক জীববিদ্যা (Social Biology), আচরণগত বাস্তব্যবিজ্ঞান (Behavioral Ecology) ইত্যাদি বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে গবেষণার কাজ চলছে। এতে পদার্থবিদ, জীবরসায়নবিদ, পক্ষীতত্ত্ববিদ, স্নায়ুবিজ্ঞানী, জীনতত্ত্ববিদ, কম্পিউটার বিজ্ঞানী অনেকেই জড়িত আছেন। আমাদের ভারতবর্ষের অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানে পক্ষীশব্দতত্ত্ব নিয়ে গবেষণার কাজ হয়েছে এবং হচ্ছে। তা সত্ত্বেও এখনও এ বিষয়ে মানুষের জ্ঞান অনেক সীমিত এবং অনেক কিছুই জানা বাকি রয়ে আছে।     

তথ্যসুত্র – বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও ইন্টারনেটে প্রাপ্ত গবেষণাপত্র

[চিত্র ৩ ও ৪ এর সোনোগ্রাম কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউ, এস, এ) কর্নেল ল্যাব অফ অরনিথোলজির দ্বারা উদ্ভাবিত Raven Pro 64 Sound Analysis Software এর সাহায্যে নেওয়া হয়েছে। কোকিল ও ইউরেশিয়ান রেনের গান ইউটিউব থেকে ডাউনলোড করা। এই বিশেষ সফটওয়্যারটি উপহার হিসেবে পাওয়ার জন্য লেখক কর্নেল ল্যাব অফ অরনিথোলজির নিকট কৃতজ্ঞ।]    

 

বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকায় (৭১ তম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা – ১০ই জানুয়ারী, ২০১৮, পৃঃ ২৮) প্রকাশিত। 

 

 

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s