Month: January 2018

Unfinished FIR

অসমাপ্ত এজাহার – কালিহাতির কথা -২

ফুলবিবি হত্যা মামলা

দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী

 

 

যাদব চন্দ্র মুন্সী ছিলেন পাঁচ নম্বর ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট। অত্যন্ত ভদ্র এং বিনয়ী। এন্ট্রান্স পাশ করে কলকাতায় পড়তে এসেছিলেন। পড়তে পড়তেই যার বাড়ি থেকে পড়াশুনা করতেন, তার চেষ্টায় কেন্দ্রীয় কোন দপ্তরে ভাল কাজ পান। চাকরী করে তার সঞ্চিত অর্থে গ্রাম পৌজানের পৈতৃক বাড়িটি পাকা করেন এবং বিস্তর জমিজমা কিনে সম্পত্তি বাড়িয়ে নেন। অবসর নিয়ে এখন দেশের বাড়িতে থাকেন এবং সম্পত্তি দেখাশোনা করেন। দুই ছেলে – সুনীল আর অনিল। দুটি ছেলেই বি,এ পাশ করে কলকাতা থেকে চাকরী করেন। দুটি ছেলেরই বিয়ে দিয়েছেন। নাতি নাতনি হয়েছে – জমজমাট সংসার। পৌজান ইউনিয়নের গ্রামগুলিতে মুসলমান অধিবাসী যদিও বেশী, কিন্তু হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে যাদববাবুকে সবাই ভক্তি শ্রদ্ধা করতেন এবং গ্রামের লোকই ভোট দিয়ে তাঁকে পর পর তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেছেন। যাদববাবুও বেশ নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে গ্রামবাসীদের সুখসুবিধা দেখছেন।  

প্রত্যেক রবিবার থানায় সমস্ত ইউনিয়ন এবং পঞ্চায়েতের চৌকিদার দফাদারগণ সংবাদ আদানপ্রদানের জন্য একত্র হয়। একে থানার চৌকিদারি হাজিরা বা চৌকিদার প্যারেড বলা হয়। এই দিনটায় থানা উপস্থিত থাকা অফিসারকে খুব ব্যাস্ত থাকতে হয়। কত রকমের সংবাদ, কারও বউ পালিয়ে গেছে, গোয়াল থেকে গরু নেই, সম্পত্তি বেহাত হয়ে গেছে, চুরি-ডাকাতি, জমির স্বত্ব নিয়ে দাঙ্গা বা অন্য কারণে ভীষন শান্তিভঙ্গের সম্ভাবনা – কত যে ঝামেলা, সবই ডায়েরীভুক্ত করতে হবে এবং আবশ্যকীয় “একশন” নিতে হবে। নচেৎ প্রতিপদেই বিপদের আশংকা রয়েছে। ঘটনা হতে দেওয়ার চেয়ে ঘটনা সময়মত হস্তক্ষেপ করে নিবারণ করার কৃতিত্ব বেশী। তাই কোন কোন প্রেসিডেন্ট চৌকিদার বা দফাদার মারফত আরও খবর পাঠাতেন কোথায় কোন দাগী চোর ডাকাত বা সন্দিগ্ধ চরিত্রের লোকের বাড়ি বিদেশী লোক বা ভিন্ন থানার অপরিচিত লোক এসে লুকিয়ে আছে বা ডাকাতি করার উদ্দেশ্যে তৈরি হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে একশন নিলে কিন্তু বহু অপরাধ নিবারণ করা চলে। কিন্তু সবইতো চলে – থানায় এত লোক কোথায়? কত বকেয়া কাজ থাকে। ইন্সপেক্টর বা পুলিশ সাহেব হয়তো থানা পরিদর্শনে আসছেন – অপরাধ নিবারণ করতে পনের মাইল দূরে চলে যাবেন না থানা রেকর্ড ঠিক করবেন? কিন্তু সবই করতে হবে – এটাও করবেন, ওটাও করবেন। কোনদিক বাদ দিলে আর রক্ষা নেই। এ হেন হাজিরার দিন ছোটবাবুরাই থানার বড় সাহেব।   

আমার সহকর্মী সাহেব আলী আমার সিনিয়র – কিন্তু কোনও গরিমা ছিল না। সব কাজেই আমরা পরামর্শ করে করতাম। খুব বড় এলাকা বলে থানার বড় সাহেব প্রায়ই তদন্তকার্যে বাইরে থাকতেন। মধ্যম দারোগা রসিকবাবু ছিলেন সত্যিই রসিক লোক। যত রাজ্যের ছোটখাট তদন্তের কাগজপত্র নিয়ে আমার আর সাহেব আলীর পিঠ চাপড়িয়ে সাইকেলে বের হয়ে যেতেন, দুই তিন দিনের মধ্যে আর ফিরতেন না। এলাকায় তার অজ্ঞাতবাস চৌকিদারও বলতে পারত না। সব সময়ই ব্যস্ত, আনন্দে ভরপুর। থানায় ফিরেই দিলদরিয়া ভাব। বলতেন – “এই ব্যানার্জ্জী, এই সাহেব আলী কি করছ?” – এদিকে এস। দেখি এক হাড়ি মিষ্টি – চালাও। আমি অবাক হয়ে ভাবতাম কি হেতু এত কাজের মধ্যেও এরূপ খুশী থাকতে পারে। তার বাসা ছিল আমার বাসার পাশে। দুঃখ হোত যখন তার স্ত্রী প্রতি রাত্রেই স্বামীর প্রতীক্ষায় জানালার ধারে বসে থাকতেন।

এ  হেন মধ্যমবাবুর আনন্দ ছিল বর্ষাকালেই বেশী। এলাকা জলে ডুবে যেত বলে প্রত্যেক তদন্তকারী অফিসারের নৌকার বন্দোবস্ত থাকে। সে নৌকাও খুব সুন্দর রঙিন ‘পটল বোট’। একটা লম্বা ধরণের পটলকে লম্বালম্বি কেটে নিলে যে আকার হয়, ঠিক সেই রকম। নৌকায় কাঠের কোঠা ঘর, বসবার যায়গা, বাথরুম ইত্যাদি সব রকম সুবিধা আছে। সন্ধ্যার কিছু আগেই হইহল্লা ব্যাপার – ‘এই গোবিন্দ (নৌকার প্রধান মাঝি) গড়গড়াটা উঠিয়েছিস? আর হারমোনিয়ামটা।’ আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি দেখে কি মনে করে একটু হাসলেন। বললেন – “আসি, সাবধানে কাজ করবেন”। কি আশ্চর্য্য! দায়িত্ব নেই, ধরাছোঁয়ায় পায় না। উর্ধতন কর্মচারীদের খুশী রেখে কতরকম অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন!  

সরকারী কাজে পৌজান এলে আমি যাদববাবুর বাড়ি থাকতাম। তিনি আমাকে তার ছেলের মতন ভালবাসতেন। কথায় কথায় একদিন বললেন – “ছোটবাবু পারেন তো মধ্যমবাবুকে একটু বলবেন, বড় বদনাম হয়ে যাচ্ছে।” যাদববাবু  তো আর আমাদের ডিপার্টমেন্টের আভ্যন্তরীণ খবর জানেন না। সরল মনে বলেছেন। কিন্তু এ জন্যই শুধু মধ্যমবাবুকে এমন বিপদে পড়তে হয়েছিল যে চাকরী তো যেতই, জেলও হতে পারত। কোন উপায়ে বেঁচে গেল। আমরাও জেনে গেলাম এই ক্ষুদে জমিদারের সাড়ম্বরে এলাকা পরিদর্শনের পরিণতি কোথায়।

এক দিনের কথা। চৌকিদারি হাজিরা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। পৌজানের দফাদার তখনও যায় নি। কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম – “কি মুকুন্দ কিছু বলবে? যাদববাবু ভাল আছেন তো?”

মুকুন্দ বলল – “স্যার! মুন্সীবাবু বলেছেন, সময় করে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। উনি নিজেই আসতেন কিন্তু শরীর বিশেষ ভাল না বলে আসতে পারলেন না।”

আমি ভাবলাম, ‘কি এমন হতে পারে?’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম – “কেন যেতে বলেছেন, তুমি কিছু জান?”

দফাদার যা বলল তাতে জানা গেল পৌজানের কাছে ইব্রাহিমপুর নামে একটা গ্রাম আছে। অধিবাসী প্রায় সবই মুসলমান। চাষবাস করে খায় কিন্তু বড়ই একজোট এবং উদ্ধত। আজ দু’তিন দিন হোল তমিজদ্দীন নামে একজন লোকের বউ নাকি নিরুদ্দেশ। থানায় বা প্রেসিডেন্টবাবুকে কিছুই জানায় নি। বউটির বাপের বাড়ি ইব্রাহিমপুর থেকে কিছু দূরে। সেখানেও যায় নি। লোকমুখে এখন শোনা  যাচ্ছে যে তমিজ্জদিন নাকি বউটাকে খুন করে গুম করে ফেলেছে। গ্রামের লোক এ ঘটনা জানে। সালিশ বসিয়ে তমিজ্জদীনের কাছ থেকে মোটা টাকা আদায়ের চেষ্টায় আছে।  

দফাদারকে বললাম – “খুব ভাল সংবাদ এনেছ! বউটার বাপের বাড়ি কে আছে?”

দফাদার বলল – “স্যার যতদূর খোঁজ নিয়েছি এক ভাই আছে নাম কাশেম, খুবই নিরীহ গোবেচারা গোছের। সেও সালিশে এসেছিল। গ্রামের লোকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে থানায় জানাতে সাহস পায় নি। তাঁকে টাকাপয়সার লোভ দেখান হয়েছে এবং একরকম নজরবন্দী করে রাখা হয়েছে। সংবাদ পেয়ে ইব্রাহিমপুর যেয়ে আমি প্রকৃত ঘটনা জানতে চেষ্টা করছি। কিন্তু কেউ কিছু বলছে না। সব চুপচাপ।”

দফাদারের কাছ থেকে সংবাদ ডায়েরীতে লিখে নিলাম। বলে দিলাম – “যাদববাবুকে বলো আমি কাল সকালেই তাঁর ওখানে যাব। আমার যাওয়ার কথা যেন গ্রামে প্রকাশ না পায়”। দফাদার চলে গেল।

থানায় অন্য কোন অফিসার নেই। সাহেব আলীও বাইরে। মধ্যমবাবু যে এলাকার সঠিক কোথায় আছেন জানা যাচ্ছে না। গড় এলাকায় আড়াইপাড়া ক্যাম্প পরিদর্শন করতে যাচ্ছেন বলে ডায়েরীতে লিখে গেছেন। কিন্তু আমি এখন তার চালচলন বেশ বুঝে নিয়েছি। তাকে আড়াইপাড়া কেন, তার ধারে কাছে কোথাও পাওয়া যাবে না। তার গমনাগমন সেই রূপকথার রাক্ষসীর মতন। বন্দিনী রাজকন্যাকে রাক্ষসী যখন বলত – এই কাছেই যাচ্ছি তিন দিনেও তখন ফিরত না। আর দূরে যাচ্ছি বললে সেই দিনই এসে পড়ত। তা ছাড়া পৌজান তো আড়াইপাড়ার সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে, পনের মাইল দূরে গড়ের এলাকার শেষ প্রান্তে।

কি সাঙ্ঘাতিক ঘটনা! বৌটাকে মেরে ফেলে গুম করা হয়েছে। একটা সংবাদ নেই থানায়! তায় আবার সম্পূর্ণরূপে গোপন করার প্রয়াস! যাদব মুন্সী দফাদারকে দিয়ে সংবাদ পাঠিয়ে যথাকর্ত্তব্য করেছেন। শাসন ব্যাবস্থা কি এই সব দুর্দান্ত প্রকৃতির লোক মানতে চায় না? দেখা যাক। বড় সাহেব সদর থেকে রাত্রে ফিরলে ভাল হবে। ভোর বেলা উঠে জানলাম বড় সাহেব এসে গেছেন। 

বড় সাহেবের বাসায় গিয়ে তাকে সব জানালাম। উনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন আমার দিকে তাকিয়ে। তারপর বললেন – “কি করবেন?” আমি বললাম -“দু’জন কনস্টেবল নিয়ে এখনই সাদা পোশাকে চলে যাই। পৌজানের যাদব মুন্সীর বাড়ি ক্যাম্প করি। সেখান থেকে গোপনে তদন্ত শুরু করব। বন্দুকধারী দু’জন কনস্টেবল রাতের অন্ধকারে যাবে আমি খবর পাঠালে। আর একজন যাবে আমাদের পোষাক নিয়ে আজই রাত্রে। সিপাই নৈমদ্দীন আর আব্দুস সামাদ আমার সঙ্গে যাবে। সংবাদ সংগ্রহ করার পদ্ধতি আমি ঠিক করে নেব। বড়সাহেব অনুমোদন করলে আমরা তিনজন আধ ঘণ্টার মধ্যে রওনা হয়ে গেলাম।  

প্রায় দশটার মধ্যে পৌজান পৌঁছে গেলাম। যাদববাবু সর্দিজ্বরে সামান্য অসুস্থ। ভেতরে শুয়ে আছেন। সংবাদ পেয়ে আমাকে ডেকে পাঠালেন। কিছুক্ষণ আলাপের পর আমি বের হয়ে এলাম। দফাদার মুকুন্দ আর দু’জন চৌকিদার নূর মিঞা আর ফাগু সেখ বোর্ড ঘরে বসে আছে। দফাদার নতুন, কোন সংবাদ দিতে পারল না। কিন্তু জানলাম ফাগু সেখের মেয়ের শ্বশুরবাড়ি ইব্রাহিমপুরে। তার বাড়ির লাগোয়া পশ্চিমে একটা ছোট মসজিদ আছে। সেখানকার ইমাম ভিনদেশী লোক বৃদ্ধ। জুম্মাবারে বিশেষ করে এবং অন্য দিনেও গ্রামের প্রায় সব লোক মসজিদে নমাজ পড়তে আসে। আমি আমার কর্মপদ্ধতি ঠিক করে নিলাম। সবাইকে ডেকে কথা বলার ভান করে শেষে ফাগু সেখকে ডেকে গোপনে রাত্রে যেয়ে ইমামকে ডেকে আনতে বললাম। ফাগু সাদা পোশাকে ইমামকে ডেকে আনল। আমার সাদা পোষাক। ইমাম জানতে পারল না – আমি কে। শুধু বললাম আমি সার্কেল অফিসারের লোক। বুড়ো নৈমদ্দীনকে দেখিয়ে বললাম – আমার এই লোক ওনার মসজিদে থাকবে কিছুদিন। দেখবে ওখানে একটা মাদ্রাসা খোলা যায় কি না। উপযুক্ত মনে করলে সরকার থেকে সাহায্যের আশা আছে। এমন কি ইমামেরও কিছু প্রাপ্য হতে পারে।

নৈমদ্দীন একখানা সাদা লুঙ্গী আর সাদা বড় পাঞ্জাবী পরা। কাঁধে রেখেছে একটা হলুদ রঙের বড় যুগী গামছা। মাথায় সাদা লেস বর্ডার দেওয়া টুপি। ইমামকে আস্লামালেকুম করে দাঁড়াল। নৈমদ্দীন কথার মাঝে  দুএকটি আরবি শব্দ উচ্চারণ করল। সার্কেল অফিসারদের এরূপ কাজের কথা ইমাম আরও শুনেছে। সরকারী সাহায্যের কথা শুনে ইমাম খুব খুশী। তাকে বললাম এ কথা গ্রামের অন্য কেউ যেন না জানে। এটা প্রথমে গোপন করতে হয় বলে গ্রামে যাতে প্রকাশ না পায়, সে বিষয়ে ইমামকে সাবধান করে দিলাম। নৈমদ্দীন ভারিক্কি চালে ইমামের সঙ্গে রাত্রেই চলে গেল। ফাগু সেখের শরীর ভীষন অসুস্থ! সেও মেয়ের কাছে বিশ্রামের জন্য এল। এই ভাবে দুই চর গ্রামে ঢুকে পড়ল।      

নৈমদ্দীন পাঁচ ওয়ক্ত নমাজ পড়ে আর অবসর সময়ে কিতাব নিয়ে বসে। গ্রামের লোক তাকে দেখে মনে করল ইমামের লোক। ইমামকে সে কথা বলা ছিল। তা ছাড়া নৈমদ্দীনের খাওয়া দাওয়া খুব ভাল চলছে। ইমাম ভাগ পেয়ে খুব খুশী। কথায় কথায় ইমাম একদিন নৈমদ্দীনকে খুব দুঃখের সঙ্গে বলল – “কি যে হয়েছে আজকাল, লোক মরে গেলে গোরস্থানে কবরও দেয় না আর ইমামকেও ডাকে না”। নৈমদ্দীনও তো এই চায়। সেও ভীষণ দুঃখিত – মুসলমানের ইজ্জত আর থাকল না। এ রূপ তো হয় না। ইমাম কথায় কথায় বলল – এই তো সেদিন তমিজ্জদিনের বউ মরল কিন্তু গোরস্থানে কবর দিল না। কোথায় যে দিল তাও ইমামকে জানাল না। নৈমদ্দীনের কাজ অনেকটা এগোল। এ কথা জানা গেল যে তমিজদ্দিদের বউয়ের নিরুদ্দেশের কারণ হ’ল তমিজ্জদিন তার বউকে মেরে ফেলে কোথাও পুঁতে রেখেছে। কিন্তু সেই যায়গাটা কোথায় সেটা জানতে হবে।

এদিকে চৌকিদার ফাগু সেখ মসজিদে তার অসুস্থ শরীর নিয়েও রোজ নমাজ পড়তে আসে এবং ইমামের আশ্রিত নতুন লোকটিকে ও ইমামকে সেলাম জানায়। তারপর ইমাম এদিক সেদিক গেলেই নৈমদ্দিনের সঙ্গে সংবাদ আদানপ্রদান করে। ফাগু সেখ তার মেয়ের বাড়ির বাইরের ঘরে যায়গা নিয়েছে তার কাজের সুবিধার জন্য। একটু রাত হলে খাওয়া দাওয়া করে সে ঘুমের ভান করে পরে থাকে। গ্রামদেশে তাড়াতাড়ি সব শুয়ে পড়ে। তারপরে ফাগুসেখের অসুখ ভাল হয়ে যায়। সে সোজা পৌজান চলে আসে। দিনের সংবাদ আমাকে দিয়ে আর আমার উপদেশ নিয়ে সে ইব্রাহিমপুরে রাত্রেই ফিরে যায়। ভোরবেলা এবং সন্ধ্যায় ফাগু সেখ কোনও মতে মসজিদে নমাজ চালিয়ে যায়।   

মসজিদের কাছে একটা ছোট পুকুর আছে। এখানে মিঞাসাহেবরা উজু ও গোছল করে। দুপুর দিকে সাহেবরা যখন ক্ষেতে চাষ করতে যায় বা অন্য কাজে যায় নৈমদ্দিন তখন পুকুরে গোছল করতে যায়। সে সময়ে আশেপাশের বয়স্কা মেয়েছেলেরাও আসে। ঘনঘন আল্লার নাম করে নৈমদ্দীন ধীরে সুস্থে গোছল করে। এই ভাবে দুই তিন দিনের মধ্যে গ্রামের মুখরা মেয়েছেলে করিমন বেওয়ার সঙ্গে নৈমদ্দীন আলাপ জমিয়ে নিল। করিমন বেওয়া জানল নৈমদ্দিন মসজিদে থাকে, ইমামের লোক। নৈমদ্দিনের কথাবার্তায় কথার ফাঁকে ফাঁকে আল্লা নাম উচ্চারণে ও দুর্বোধ্য দুই একটা আরবী শব্দ শুনে করিমন তাকে একজন মোল্লা বলে ধরে নিল ও ভাব করতে চেষ্টা করল। নৈমদ্দীনের যা বয়স তাতে আরও গোটা দুই নিকা করা চলে। নৈমদ্দিন কিন্তু সুযোগ ছাড়ল না। তার তো খবরের দরকার লাশ কোথায় পুঁতেছে। তাই সুযোগ পেলেই করিমনের সাথে নৈমদ্দিনের নিভৃত আলাপ চলতে থাকে খুব সাবধানে। প্রকাশ পেলে নৈমদ্দিনের কবর আবার কোথায় হবে কে জানে!

এদিকে আব্দুস সামাদ ছেঁড়া কালো আলখাল্লা পরে, রঙবেরঙের পুঁতির মালা পরে একটি ধুনুচি হাতে নিয়ে শেষ রাতে বের হয়ে কাশেমের গ্রাম রসুলপুরে যায়। ফকির-দরবেশকে গ্রামে কেউ সন্দেহের চোখে দেখে না। কি হিন্দু, কি মুসলমান কেউ এদের শুধু হাতে ফিরিয়ে দেয় না। পয়সা বা চাল দেয় আর দোয়া মাগে। এ দিক সেদিক দু’চার বাড়ি ঘুরে সামাদ কাশেমের বাড়ি এল। কাশেমের মানসিক অবস্থা ভাল না। বাড়িতে চুপচাপ বসে আছে এমন সময়ে সামাদ আঙ্গিনায় এসে ‘মুশকিল আশা আ আ আ ন’ বলে দাঁড়াল। কাশেমকে দেখে বলল – “আয় বা’জান চুপচাপ যে, কোন বিপদ হয় নি তো?” কাশেম প্রথমটা কেমন আঁতকে উঠল। তারপর ফকিরকে বসতে দিল। ফকিরের সঙ্গে আলাপে ও তার উদাস কথাবার্তায় কাশেমের মনে অনেকটা শান্তি এল। বোনটাকে মেরে ফেলল। সালিশে কিছু টাকা দেবে কথা ছিল – তাও দিল না, থানায়ও খবর দেওয়া হোল না। এই সব ভেবে ভেবে তার মনে একটুও শান্তি ছিল না। ফকিরকে সে আবার আসতে বলে দিল। ফকিরও ক্রমান্বয়ে দুইতিন দিন কাশেমের সঙ্গে দেখা করে, নানা রকম কথাবার্তা বলে কাশেমের মনের উপর প্রভাব বিস্তার করল। ফকিরের উপর কাশেমের এত বিশ্বাস হোল যে একদিন কাশেম তার বোনাই যে তার বোনকে মেরে ফেলেছে সে কথা বলে এখন কি ভাবে এই বিপদ থেকে রেহাই পাওয়া যায় তার পরামর্শ চাইল ও আল্লাতালার দোয়া চাইল। ফকির গম্ভীর হয়ে কতক্ষণ চোখ বুজে থেকে বলল – “থানায় জানিয়েছিস?” কাশেম বলল – “ইব্রাহিমপুরের মোড়লরা সব ঘটনা গুম কইরা দিছে – থানায় জানাইতে দেয় নাই।”  

ফকির বলে উঠল – “আত্মার শান্তি হয় নাই। তোর বাড়ির আশে পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তোর ভীষণ বিপদ হতে পারে। কবরে মোম দিতে হবে।” কাশেম ভয় পেয়ে বলে উঠল – “কবর কোথায়? বাড়ির পিছন দিকে জঙ্গলে পুঁতে রেখেছে।” এই বলে ফকিরের পায়ে ধরে দোয়া চাইল। ফকির কিছুক্ষণ আবার চোখ বুজে রইল। তারপর বলে উঠল -“ভয় নাই। পীরের দরগায় আজ থেকে সাতদিন মানত করে সিন্নি দিব। তোর কোন খরচা লাগবেনা। কেউ জানবে না। তোরও কাজ হবে। সব মুশকিল আশান হবে”। এই বলে চলে এল। দিন থাকতে তো ফকির যাদব মুন্সীর বাড়ি ঢুকতে পারবে না। তাই সবাই দেখল – মুন্সীবাড়ির অনতিদূরে এক ফকির চুপচাপ বসে আছে। আর মুশকিল আশান বলে উঠছে মাঝে মাঝে।   

রাত্রি হোলে ফকির সামাদ হয়ে গেল। তারপর আমাকে সব সংবাদ বলে হাসতে লাগল। আমি সামাদকে বললাম -“সামাদ! তোমাকে আরও একটা কাজ করতে হবে। সেটা আরও একটু কঠিন। ফাগু চৌকিদার একটু পরেই আসছে। তার থেকে তোমাকে জানতে হবে তমিজ্জদিনের বাড়ির সঠিক অবস্থান। সত্যিই কোন জঙ্গল আছে কি না বাড়ির আশে পাশে। থাকলে সেখানে সন্দেহজনক কিছু বোঝা যায় কি না রাস্তার দিক থেকে বা কোন সুবিধাজনক পরিস্থিতি থেকে। তারপর তোমার তিন দিন ছুটি।” তিন দিন ছুটির কথায় সামাদ খুব খুশী। রাত প্রায় এগারোটার সময়ে ফাগু এল। হেসেই কুটিপাটি। নৈমদ্দিন আর করিমন বেওয়ার নিকা নাকি প্রায় ঠিক। করিমন থেকে নৈমদ্দিন যা জেনেছে তা’ সামাদের সংবাদের সঙ্গে মিলে গেল। এখন কেবল যায়গাটা দেখা। সামাদ চৌকিদার ফাগুর কাছ থেকে তমিজ্জদিনের বাড়ির অবস্থান জেনে নিল। 

পরদিন দেখা গেল ইব্রাহিমপুরের রাস্তায় এক ফকির হন হন করে চলেছে। হাতে তার ধুনুচি। মাঝে মাঝে মুশকিল আশান  বলে উঠছে। কোন দিকে তাকায় না। শেষে পাড়ার ভিতর ঢুকে পড়ল। এ বাড়ি সে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে চোখ বুজে দোয়া মাগে। তারপর চলে যায়। তমিজ্জদিনের বাড়ি দেখে বুঝে নিল। সেই জঙ্গল যায়গাটাও দেখল। তখন প্রায় দুপুর বেলা। পুরুষ লোক খুবই কম। কেউ গেছে আবাদে। কেউ মসজিদে দুপুরের নমাজ পড়তে। তবু নিশ্চিত হবার জন্য একটি ছোট ছেলেকে জিজ্ঞাসা করে জেনে নিল। ফকিরের অবাধ গতি। জঙ্গলের ভেতর সরু রাস্তার মত দেখে সেখান দিয়েই ছুটল। সন্ধানী দৃষ্টি – একটি সাত আট বছরের ছেলে জঙ্গলে দাঁড়িয়ে। কাছেই কিছু জঙ্গল কাটা ও মাটি দিয়ে ঢাকা। ফকিরকে দেখে ছেলেটি ছুটে বাড়ির ভেতর ঢুকল। ফকির এসে দাঁড়াল বাড়ির সামনে – মুশকিল আশান বলে। ছেলেটি বেড়িয়ে এসে বলল – “কেউ নেই। আম্মাজান মরে গেছে” – বলে জঙ্গলের দিকে তাকাল। ফকিরের বুঝতে বাকি থাকল না। হন হন করে ছুটল। এল মসজিদে নমাজ পড়তে। নৈমদ্দিনের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। বলে উঠল – “সব আশান ভাই সব আশান”। নৈমদ্দিন বুঝে নিল। তিন লাফে ফকির মসজিদ পেরিয়ে রাস্তা ধরল।    

বিকালের দিকে ইমামের সঙ্গে নৈমদ্দিনের কথা হচ্ছে। ইমামের বড় দুঃখ, মুসলমানি কানুন কেউ মানছে না। নৈমদ্দিনের কাজ হয়ে গেছে। করিমনের থেকে কথায় কথায় সব জেনে নিয়েছে। ইমামের কথায় সে প্রশ্ন করে বসল – “কি মানছে না?” এই কয় দিনে নৈমদ্দিনের সঙ্গে ইমামের বেশ ভাব হয়ে গেছে। ইমাম তখন চুপি চুপি তমিজ্জদিনের ব্যাপারটা বলে দিল। তমিজ্জদিন বলল – “এখানে মাদ্রাসার খুবই দরকার। এরা কোরান হাদিস মানে না। সব কাফের হয়ে গেছে।” পরদিন আজানের নমাজের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়ে ইমামের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে নৈমদ্দিন সার্কেল অফিসে যাই বলে চলে গেল। ফাগু সেখের অসুখ সারতে আরও দিন কতক লাগবে কারণ তাকে যে কবরের দিকে নজর রাখতে হবে। ইমাম মনের আনন্দে মাদ্রাসার স্বপ্ন দেখছে। গ্রামবাসীকে তাক লাগিয়ে দেবে। তারা তাকে না মানলেও সে যে গোপনে তাদের জন্য কত উপকার করছে তা বুঝিয়ে দেবে। তাই সে সবই গোপন রাখল।

চার পাঁচ দিনের মধ্যে আবশ্যকীয় সংবাদ সংগ্রহ করা হোল। আইন অনুযায়ী মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট থেকে আনান হ’ল লাশ কবর থেকে উঠিয়ে আনার অনুমতি। থানা থেকে এসে গেল সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী। দেড় দিনের মধ্যে সমস্ত বন্দোবস্ত শেষ করতে হোল। শেষ রাত্রে দলবল নিয়ে ঘেরাও করা হোল তমিজ্জদিনের আর সংশ্লিষ্ট চার পাঁচ জন মোড়লের বাড়ি। উঠান হোল মাটিতে পুঁতে রাখা তমিজ্জদিনের বউ ফুল বিবির মৃত দেহ। পচন শুরু হয়ে গেছে – দেহ ফুলে ঢোল। তবে যা সাধারণতঃ হয়ে থাকে তা এ ক্ষেত্রে হয় নি – হয়তো মাটির নিচে ছিল বলে। মৃতদেহে ধারাল অস্ত্রের দাগ দেখা গেল তিনটে। একটা গলায় – বেশ বড় মনে হোল। আর দুটো দুহাতের তালুতে। সেগুলি গলার আঘাতের তুলনায় ছোট। ‘সুরতহাল রিপোর্ট’ তৈরি করে নিলাম। তারপর আবশ্যকীয় কাগজপত্রাদিসহ মৃতদেহ ময়না তদন্তের জন্য টাঙ্গাইল মহকুমা পরীক্ষাগারে পাঠান হোল।       

তারপর তমিজ্জদিনের ঘরে তল্লাসি চালান হোল। কোথাও অপরাধমূলক কিছু রেখেছে বলেতো মনে হচ্ছে না। হঠাৎ ঘরের মেঝের একটা কোনার দিকে এমনভাবে নিকানো হয়েছে যে মেঝের অন্যান্য যায়গা থেকে বেশ পৃথক। ভাল করে পরীক্ষা করলে এরূপ বৈষম্য নজরে পড়ে। তাড়াহুড়ো করলে নজর এড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। যায়গাটা শাবল দিয়ে খোঁড়া হোল। কিছুটা মাটি সরাতেই বেরিয়ে এল রক্তাক্ত কাপড়চোপড়। অনেক তল্লাশি করে কিন্তু কোন অস্ত্র পাওয়া গেল না।  মৃতদেহ এবং রক্তাক্ত কাপড়চোপড় দেখে তমিজ্জদিনের মুখ শুকিয়ে উঠল। ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদে তমিজ্জদিন প্রথমে কিছুই বলতে চাইল না। তল্লাশি শেষ করে এবার তমিজ্জদিনকে নিয়ে চলল অবিরত জিজ্ঞাসাবাদ। কাটারি বা অন্য কোন ধারাল অস্ত্র যা দ্বারা খুন করা হয়েছে তা’ যে বের করতেই হবে। জিজ্ঞাসাবাদের যতরকম পদ্ধতি আমার জানা ছিল সবই প্রয়োগ করা হোল। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই তমিজ্জদিন ভেঙে পড়ল। স্বীকারোক্তিতে আনুপূর্ব্বিক সমস্ত ঘটনা বলে গেল। জঙ্গলের মধ্য থেকে বের করল কাটারি। রক্তের দাগ তাতে শুকিয়ে আছে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য নেওয়া হোল কাটারি ও রক্তমাখা কাপড়চোপড়। কত সামান্য কারণে এরা এরূপ নৃশংস হত্যাকাণ্ড করতে পারে তা শুনে আমরা হতবাক হয়ে গেলাম।   

তমিজ্জদিনের জমি কম। তাই তাকে জন খাটতে হয়। ঘটনার আগের দিন সন্ধ্যারাত্রে বউ ফুলবিবির সাথে তমিজ্জদিনের খুব ঝগড়া হয়। যে কটা চাল ঘরে ছিল তাই সিদ্ধ করে রেখেছিল। ভাত কম দেখে তমিজ্জদিন রাগ করে ভাত ফেলে উঠে যায়। তারপর ফুলবিবিকে মারধোর করে। ফুলবিবি সকালেই চালের কথা বলেছিল। কিন্তু তমিজ্জদিন সে কথা স্বীকার করে নি। হয়তো অন্যমনস্ক ছিল বলে শুনতে পায় নি এমন হতে পারে। যা হোক ঘটনার দিন সকালে তমিজ্জদিন না খেয়েই সকালে কাটারী হাতে বেরিয়ে যায়। যাবার সময় বলে যায় যে ফুলবিবি যেন হাফেজ মোড়লের বাড়ি থেকে চাল নিয়ে আসে সে বলে যাবে। কিন্তু ফুলবিবি যায় না। রাগ করে সারাদিন বসে থাকে।

সন্ধ্যায় তমিজ্জদিন ঘরে ফিরে এসে কাটারি রেখে তামাক খায়। ফুলবিবি বারান্দার এক কোনে চুপচাপ বসে আছে। সারাদিন কিছু না খাওয়ায় তার শরীরে এসেছে ক্লান্তি ও অবসাদ। তমিজ্জদিন তামাক খায় ও তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। সাত আট বছরের ছেলেটা ঘরের ভেতরে ঘুমাচ্ছে। এক ছিলিম তামাক শেষ করে তমিজ্জদিন হাতমুখ ধুতে গেল। এসে দেখল ফুলবিবি তেমনই বসে আছে। তমিজ্জদিনের মেজাজ গরম হয়ে গেল। সারাদিন খেটেখুটে এসেছে। এ কি লেহাজ তরিকৎ।

এই কথা বলতে বলতে তমিজ্জদিন হঠাৎ কেঁদে ফেলল। তারপর বলল –   

“কয়েন সায়েব! এর পর আর মেজাজ ঠিক থাকে। ভাত দিতে কইলাম তাও দিলে না। উইঠা ঘরের মধ্যে চইলা গেল। তখনই আমি জিগাইলাম – ‘চাউল আনছিলি’। কইল – ‘না’। আমার যে কি অইয়া গেল।  দা’টা উঠাইয়া লইলাম। তারপর ঘরের মধ্যে যাইয়া দা দিয়া কোপ দিতে লাগলাম। ফুলবিবি দুই হাত দিয়া ফিরাইল। কিন্তু আমি থামলাম না। দায়ের কোপ হাতে লাগায় শুইয়া পড়ল। আমি গলায় কোপ দিলাম। কাটারী খুব ধার লগে লগে গলায় বইসা গেল। কইয়া উঠলাম – ‘আজ তরে শেষ কইরা দিমু’। ফুলবিবি দুই তিন চীৎকারে শেষ। পোলাটা চীৎকারে জাইগা উঠল। কাইন্দা কাইন্দা কইল – “বা’জান আম্মাজানরে মাইরো না। সারাদিন আমরা কিছু খাই নাই”। আমি তখন পাগল অইয়া গেছি। চীৎকার শুইনা পড়শিরা ছুইটা আইল। হানিফ মিঞা, ঝুইনার বাপ, আব্দুল, মতি সেখ, করিমন বেওয়া আরও অনেকে, খেয়াল রাখি নাই। আমি সক্কলকার পা ধইরা কাইন্দতে লাগলাম আর কইলাম – ‘কি সর্বনাশ করলাম! আমারে বাঁচাও।’

সকলের পরামর্শে রক্ত সাফা করলাম। মাটি খুইড়া রক্তের কাপড় লুকাইলাম। কাটারি জঙ্গলে লুকাইয়া রাখলাম। ফুলবিবিরে জঙ্গলে পুইতা দিলাম। রাইত বইলা কাজ শেষ করতে অসুবিধা অইল না। আমি আমার ভিটা জমি বেইচা দিয়া মোড়লদের টাকা দিমু কইলাম। তারপর কইলাম – ‘কাশেম আইলে কি কইমু?’ মোড়লরা কইল – ‘সে আমরা দেখমু’। তারপর সব চুপচাপ ছিল। যারা এই সব জানে না তাগো কইলাম যে ফুলবিবি পলাইয়া গেছে। মোড়লরা কাশেমকে খবর দিয়া আনাইয়া বুঝাইল ও টাকা দিব কইল। কইল পুলিশরে জানাইলে কাইট্যা ফেলামু। কাশেম সুজা সরল মানু। ভয় পাইয়া গেল।”  

তমিজ্জদিন, হানিফ মিঞা ও আরও যারা এ ব্যাপারে সাথে ছিল সকলকে গ্রেপ্তার করা হোল। বড় সাহেব মামলা হাতে নিলেন। তদন্ত শেষ করে তমিজ্জদিন ও আরও আটদশ জনকে কোর্টে বিচারের জন্য চালান দেওয়া হোল। এক বছরের মধ্যে বিচার শেষ হয়ে গেল। দায়রার বিচারে জজ সাহেব তমিজ্জদিনকে দিলেন ফাঁসির হুকুম। ফুল বিবির লাশ ও অন্যান্য প্রমাণাদি গোপন করার জন্য যারা তমিজ্জদিনকে সাহায্য করেছিল তারা পেল বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড।  

Advertisements

Call and Song of Birds

পাখিসব করে রব

সনৎ কুমার ব্যানার্জ্জী

 

 

রাতি পোহাইল – ঘুম ভাঙে আমার দূর হতে ভেসে আসা ট্রেনের হুইস্‌লের শব্দে, মসজিদের আজানের সুরে আর পাখির কলতানে। হুইস্‌লের শব্দ, আজানের সুর থেমে যায় – থামে না কাক, চড়াই, শালিক, টুনটুনি, বুলবুলি আর হাড়িচাঁচাদের কনসার্ট। সময় বুঝে যোগ দেয় কোকিল, বেনেবৌ আর দোয়েল। নাগরিক জীবনযাত্রায় এর চেয়ে বেশী আর কি আশা করতে পারি? জীবনের প্রথম সকালগুলোর ঘুমও কেড়ে নিয়েছিল ঐ কেলে ঝাড়ুদার পাখিটা – ‘কাক ডাকে কা কা, আগে ও পরে আ’ – শুরু হয়েছিল লেখাপড়া করে বড় হওয়ার মতন এক দুঃসহ জীবনযাত্রার। আর এই লেখাপড়া করতে করতে কেটে গেল জীবনের ষাটটিরও বেশী বছর – বড় হওয়ার ইঁদুর দৌড়ে পাখির গান কোথায় গেল হারিয়ে। আজ দায়-দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া জীবনসায়াহ্নের অবসরে সেই ‘প্রভাত পাখির গান’ এতদিন পরে না জানি কেন বড় ভাল লাগছে। শুধু দোয়েল-কোকিলের গান কেন নিস্তব্ধ নিদাঘের মধ্যদিনে ঘুঘুর ডাক বা চিলের চিৎকারও আজকাল খারাপ লাগে না।   

ডেকে বা নানাবিধ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শব্দ করে নিজের অস্তিত্বকে জানান দেওয়া অধিকাংশ প্রাণীরই ধর্ম কিন্তু মনের আনন্দে গলা ছেড়ে গান গাইতে মানুষ বাদে পাখি ছাড়া আর কোন প্রাণী পারে কি – প্রাণীবিদ্যাবিশারদরা বলতে পারেন। মশার গুন্‌গুন্‌, মাছির ভ্যানভ্যান, ভ্রমরের গুঞ্জনকে-তো আর গান আখ্যা দেওয়া যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হ’ল পাখি গান গায় কি করে – কোথা থেকে, কার কাছে, কি ভাবে শিখল এই গান গাওয়া? কোনও ওস্তাদজীর কাছে নাড়া বেঁধে নিশ্চয়ই গান শেখে না। বাবা-মা পাখিরা তাদের ছানাদের উড়তে শেখাতে স্বচক্ষে দেখেছি কিন্তু পাশে বসিয়ে গান শেখাতে কখনও দেখিওনি, কারো কাছে শুনিওনি। অবশ্য সব পাখি যে গান গায় তা’ নয় – সব মানুষই কি পারে? টেনিদার গান শুনে কোন এক কাবুলীওয়ালা নাকি আঁতকে উঠে ড্রেনে পড়ে গিয়েছিল। এ পারে কেকা মুখর হ’লে আঁতকে উঠে ও পারে গিয়ে পড়তে হয়।  গান গাইয়ে পাখির দল আলাদা। আর অবস্থা, পরিবেশ বা ঋতুভেদে একই পাখির ডাকেরও বিভিন্নতা আছে। মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম ভাষা আর ভাষার বহিঃপ্রকাশ ঘটে মুখনিঃসৃত ধ্বনির সাহায্যে। নানারকম পাখিদের নানারকম ভাষা আর তাই তাদের রাগ-অনুরাগ-বিবাদ-বিসংবাদ-সাবধান বাণী সব প্রকাশ পায় ডাকের বিভিন্নতায়। কোনও কোনও পাখি আবার অন্য পশুপাখির গলা নকল করতে ওস্তাদ। টিয়া-চন্দনা-ময়না-কাকাতুয়ারাতো কথা বলা পাখি – Talking Birds – মানুষের গলা নকল করে রীতিমত যেন কথা বলে আর তার ফল – পরিপাটি খাঁচায় নিরালা গৃহকোনে বন্দীজীবন – কেমনে আর বনের গান গায়?  

কিন্তু খাঁচার গানই হোক আর বনের গানই হোক, পাখি গান গায় কি করে আর একই পাখি নানা রকমে ডাকেই বা কেন এ নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। প্রত্যেক পাখির ডাকের নিজস্ব ধরণ আছে। কত সময়তো পাখিদের গাছের ডালে, পাতার ফাঁকে লুকিয়ে থাকার জন্য দেখাই যায় না। কিন্তু  ডাক শুনে তাদের সনাক্ত করা সম্ভব হয়। ঘন পাতার ফাঁকে লুকিয়ে পরিত্রাহিতে চিৎকার করে ‘চোখ গেল’ ‘চোখ গেল’ করে মাথা ধরিয়ে দেয় তা’বলে সহজে কি এই পাপিয়া বা চোখ গেল (Common Hawk Cuckoo বা Brain Fever Bird) পাখিটাকে দেখা যায়? তাই পাখি দেখা, পাখির ছবি তোলা ছাড়াও পাখির ডাক ও গান রেকর্ডিং করা ও তার চর্চ্চা করা কোনও কোনও পক্ষী-পর্যবেক্ষকদের নেশা এবং পক্ষীবিজ্ঞানের গবেষনার বিষয়-তো বটেই।   

মানুষের নানা ভাষা আছে – যা বর্ণ, শব্দ, অর্থ ও ব্যাকরণের নিয়ম মেনে মানুষ চিন্তা করে, কথায় বা লেখায় তার ভাব প্রকাশ করে। এই মৌখিক ভাষা ছাড়াও মানুষ তার বিভিন্ন ভাব প্রকাশ করতে পারে যা ‘বিনি ভাষায় উক্ত’ (Non-verbal communication)। পাখিদেরও পরস্পরের প্রতি ভাবের আদান-প্রদানের জন্য নিজস্ব ভাষা আছে যার প্রকাশ হয় তাদের গান ও ডাকের মধ্য দিয়ে। তবে তাদের ভাষা মানুষের ভাষার মতন জটিল নয়। ব্যাকরণ একটা আছে বটে তবে তাতে সমাস-কারক-প্রত্যয়-বিভক্তির বা কোনও Tense-preposition-conjungtion এর উৎপাতটা নেই। পাখিরা চিন্তা-ভাবনা করে বা অতীতের কথা মনে করে বা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করে কিছু বলে বোলে মনে হয় না – তাদের সব ভাব প্রকাশই তাৎক্ষণিক অনুভবজনিত। মূহুর্তকালীন মেজাজ প্রকাশ পায় তাদের ডাক আর গানের মধ্য দিয়ে।

এখন পাখির ডাক আর গানের মধ্যে তফাৎ কোথায়?

পাখির ডাক (Call) সাধারণতঃ সংক্ষিপ্ত ধ্বনি (Mono-syllable), সাধারণ গঠনের শব্দ যেমন কা কা বা চির্প চির্প বা বকম বকম ইত্যাদি। আর গান (Song) হোলো একটু দীর্ঘ সুরেলা ধ্বনি যা পাখির ডাকের তুলনায় জটিল যেমন কোকিলের কুহুতান বা দোয়েলের, শ্যামার শিষ। সব পাখি গাইতে পারে না। গাইয়ে পাখির দল আলাদা – সাধারণতঃ তারা Passeriformes (Perching birds বা দাঁড়ে বসা) গোষ্ঠির। অর্থাৎ পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক পাখিই গাইতে পারে না – তবে তারা ডাকতে পারে। আবার সব পাখিই যে ডাকতে পারে তাও নয় – সারস (Stork) জাতীয় কিছু পাখি আছে যারা মূক অর্থাৎ গলার স্বর নেই কিন্তু ঠোঁটে ঠোঁটে (ঠোঁটতালি দিয়ে!) আঘাত করে শব্দ করতে পারে।     

পদার্থ বিজ্ঞানের ভাষায় শব্দ এক ধরণের শক্তি যা পদার্থের কম্পনের ফলে সৃষ্টি হয় ও বায়বীয়, তরল বা কঠিন পদার্থের মধ্য দিয়ে তরঙ্গাকারে প্রবাহিত হয়। শব্দ-তরঙ্গের প্রবাহের সময়ে মাধ্যমের সকল কণা স্পন্দিত হতে থাকে ও সেকেন্ড-প্রতি একবার স্পন্দনকে এক হার্জ (Hertz) বলা হয় যা শব্দ-তরঙ্গের একক। এই শব্দতরঙ্গ মানুষের কানের ভেতর যে স্পর্শকাতর পর্দা আছে যাকে কর্ণপটহ (Ear Drum বা Tympanic Membrane) বলে – তাকে স্পন্দিত করে এবং সেই স্পন্দন মধ্যকর্ণ ও অন্তঃকর্ণের মধ্য দিয়ে নানাভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে মস্তিস্কে পৌঁছলে আমাদের শব্দের অনুভুতি হয় বা আমরা শব্দ শুনতে পাই। কোনও স্পন্দিত পদার্থের সেকেন্ড-প্রতি স্পন্দন সংখ্যাকে বলে কম্পাঙ্ক (frequency)। সাধারণভাবে মানুষ ২০ হার্জ থেকে ২০,০০০ হার্জ কম্পাঙ্কবিশিষ্ট শব্দ কানে শুনতে পায়। কিন্তু পাখিদেরতো আমাদের মতন কান দেখতে পাই না। পাখিদের কি কান নেই? তারা কি শুনতে পায় না? তা’ কেন? পাখিদেরও কান আছে  শুনতেও ভালই পায় – না হ’লে আর হুস হুস করলে কাকটা পালায় কেন? পাখিদের আমাদের মতন কানের পাতা থাকে না – সে যায়গায় থাকে শুধু ছিদ্র – তাও আবার ভালরকমভাবে পালক দিয়ে ঢাকা– আর এই কানঢাকা পালকগুলিকে বলে অরিকিউলার (Auricular)। এর মস্ত সুবিধা আছে। পাখিরা যখন আকাশে ওড়ে – তাদের গতিবেগ থাকে খুব বেশী আর বিপরিত দিক থেকে প্রবল বাতাসের ঝাপটা তাদের শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। ফলে তারা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পারে না। এ ক্ষেত্রে এই অরিকিউলারগুলো কানঢাকা মাফলারের কাজ করে। এ ছাড়া যে সব পাখি জলে মাথা ডুবিয়ে খাবার খোঁজে যেমন হাঁস, পানকৌড়ি জাতীয় জলের পাখিরা বা মাছরাঙ্গা জাতীয় যারা জলে ডাইভ দিয়ে মাছ শিকার করে তাদের ক্ষেত্রে এই অরিকিউলার জল ও জলের চাপ থেকে কানকে রক্ষা করে। কোন কোন পাখির শ্রবণশক্তি খুবই তীক্ষ্ণ যেমন লক্ষ্মী প্যাঁচা (Barn Owl)। এদের কানের ছিদ্রের আকার প্রায় চোখেরই মতন। ঘন অন্ধকারেও শুধু মাত্র প্রায় নিঃশব্দ চলাফেরার শব্দতেই এরা শিকার ধরতে পারে। পাখিরা যদিও ৫০ হার্জেরও কম কম্পাঙ্কের শব্দ থেকে আরম্ভ করে ১২০০০ হার্জ কম্পাঙ্কবিশিষ্ট শব্দ শুনতে সক্ষম, ১০০০ হার্জ থেকে ৫০০০ হার্জ পর্য্যন্ত কম্পাঙ্কের শব্দে সর্ব্বাধিক সংবেদনশীল।

আমরা যে কথা বলি, গান করি বা নানাবিধ মৌখিক শব্দ করি তার উৎস স্বরযন্ত্র (Larynx) যার অবস্থান শ্বাসনালীর (Trachea) উপর দিকে। স্বরযন্ত্রের মধ্যে থাকে একজোড়া স্থিতিস্থাপক পর্দা যার নাম স্বরতন্ত্রী (Vocal Chords বা Vocal folds) যা ফুসফুসে বাতাস ঢোকার ও বেরোবার দরজা হিসাবে কাজ করে। এই পর্দাদুটো যে ছিদ্রপথকে বন্ধ করে বা খোলে তাকে বলে স্বররন্ধ্র (Glottis) (চিত্র – ১)। এই পথ দিয়েই শ্বাসবায়ু ফুসফুসে যাতায়াত করে। আমরা যখন শ্বাস-প্রশ্বাস নিই তখন স্বররন্ধ্রের পথ উন্মুক্ত থাকে। কিন্তু কথা বলা বা গান করার সময়ে আমাদের কন্ঠ হ’তে যে ধ্বনি নির্গত হয় তার প্রকৃতি অনুযায়ী স্বরতন্ত্রীদের সঙ্কোচন-প্রসারণ হয় এবং ফলে স্বররন্ধ্রের ছিদ্র ছোট-বড় হয়। স্বররন্ধ্র যখন সম্পূর্ণ বন্ধ হয় তখন ফুসফুস থেকে বাতাস বেরোতে পারে না ও কোনোও ধ্বনিও তৈরী হয় না। কিন্তু স্বররন্ধ্র যখন আংশিক বন্ধ থাকে তখন প্রবাহিত শ্বাসবায়ুর চাপের বিভিন্নতার জন্য স্বরতন্ত্রী দুটো সঙ্কুচিত-প্রসারিত হয় ও  তিব্রভাবে বা মৃদুভাবে বিভিন্ন কম্পাঙ্কে স্পন্দিত হতে থাকে যাকে নিয়ন্ত্রণ করে স্বরযন্ত্রের ভেতরের পেশীসমূহ ও এর ফলে বিভিন্ন ধ্বনির সৃষ্টি হয়। কন্ঠ হতে নির্গত শব্দতরঙ্গ আবার কন্ঠ, তালু, মূর্ধা, দাঁত, ঠোট, জিভ ও নাকের সাহায্যে বিবিধ রকমের বর্ণ (স্বরবর্ণ ও ব্যাঞ্জনবর্ণ) সৃষ্টি করে। বর্ণের সমন্বয়ে অর্থযুক্ত শব্দ, শব্দ ও ব্যাকরণের সমন্বয়ে বাক্য ও বাক্যের সমন্বয়ে কথা আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করে। কথায় সুর সংযোজিত হয়ে সৃষ্টি হয় গান।  

কোনও সুনির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের ধ্বনিকে বলে সুর (Tone) আর একাধিক সুরমিশ্রিত ধ্বনিকে বলে স্বর (Note)। স্বরের মধ্যে সর্ব্বনিম্ন কম্পাঙ্কের সুরকে বলা হয় মৌলিক সুর (Fundamental tone) আর তার চেয়ে চড়া সুরকে বলে উচ্চসুর (over tone)। মানুষ হাসে, কাঁদে, চিৎকার করে, কথা বলে, গান গায় – হরবোলারা মুখে কত রকমের শব্দের অনুকরণ করে। কারোর গলার স্বর মোটা, কারোর বা চিকন সরু। কখনো জোরে কথা হয় কখনো নিচুস্বরে – কখন বা ফিসফিস করে। এই সকল রকম ধ্বনির উদ্ভব হয় স্বরতন্ত্রী দুটোর বিভিন্ন কম্পাঙ্কের স্পন্দনে।  

জন্মাবধি মানুষের গলায় একটা মৌলিক সুর থাকে। এই মৌলিক সুর দিয়েই একজন মানুষের গলা চেনা যায়। এই মৌলিক সুরের কম্পাঙ্ক কম হলে গলার স্বর মোটা আর বেশী হলে স্বর সরু বা চিকন হয়। সাধারণতঃ এই মৌলিক স্বরের কম্পাঙ্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে ৮৫ থেকে ১৫৫ হার্জ, মহিলাদের ক্ষেত্রে ১৬৫ থেকে ২৫৫ হার্জ আর শিশুদের ক্ষেত্রে ২৫৫ থেকে ৩০০ হার্জ বা তার বেশীও হয়ে থাকে। অবশ্য মানুষের স্বরতন্ত্র আরও উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ সৃষ্টি করতে সক্ষম। মৌলিক স্বরের কম্পাঙ্ক কম হওয়ার কারণে পুরুষদের গলার স্বর হয় মোটা আর বেশী হওয়ার দরুন মহিলাদের হয় চিকন। মানুষ যখন জোরে কথা বলে তখন কিছুটা বাড়তি শক্তি প্রয়োগের ফলে শব্দতরঙ্গের বিস্তার (Amplitude) বেড়ে যায় – কম্পাঙ্কের হেরফের ঘটে না।   

পাখিদের ব্যাপারই আলাদা। তাদের স্বরযন্ত্রের অবস্থান আমাদের মতন শ্বাসনালীর উপরদিকে নয় – বরঞ্চ নিচের দিকে। আর তার নাম সিরিঙ্কস (Syrinx)। পাখিদের শ্বাসনালীর শেষপ্রান্তে যেখানে শ্বাসনালী দু’ভাগ হয়ে দু’টি পথ দু’টি দিকে বেকে দু’টি ফুসফুসে চলে গেছে – সেই তিন মাথার মোড়ে এর অবস্থান। এটি একটি বিশেষ ধরণের মাংস পেশী (Syringeal Muscles) জড়ানো স্থিতিস্থাপক ঝিল্লি দিয়ে তৈরী কুঠরি। এর ভেতরে আছে একটা ছোটো বাতাস ভরা থলে (Clavicular air sac) যার উপরি ভাগে আছে অর্ধচন্দ্রাকৃতি ঝিল্লি দিয়ে জড়ানো কার্টিলেজ – পেসুলাস (Pessulus), যা পাশাপাশি দ্রুত স্পন্দিত হতে পারে ও ফুসফুস থেকে আসা বাতাসের প্রবাহকে প্রভাবিত করে। সিরিঞ্জিয়াল পেশীগুলো সিরিঙ্কসকে নিয়ন্ত্রন করে।

পাখিদের নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়ে বাতাস যায় দুটো ফুসফুস সংলগ্ন কয়েকটি বাতাস-থলেতে (Air sac) আর সেখান থেকে ফুসফুসের ভেতর দিয়ে ক্লোমশাখাদ্বয় (Bronchii), সিরিঙ্কস ও শ্বাসনালী (Trachea) হয়ে বেরিয়ে আসে। পাখিরা যখন ডাকে – তখন বুক ও পেটের পেশীদের সংকোচনের ফলে ফুসফুস থেকে বাতাস ক্লোমশাখাদ্বয়, সিরিঙ্কস ও শ্বাসনালীর সরু পথ দিয়ে জোরে প্রবাহিত হয়। এর ফলে সিরিঙ্কস-এর দেয়ালরূপ ঝিল্লিগুলোর কোন কোন অংশ বা পুরোটাই এবং পেসুলাস প্রভৃতি স্পন্দিত হয়ে শব্দের সৃষ্টি করে।

সিরিঙ্কস হ’তে সৃষ্ট শব্দতরঙ্গকে একটা পাখি দু’ভাবে বদলাতে পারে। এক – সিরিঞ্জিয়াল পেশীগুলোকে নিপুনভাবে নিয়ন্ত্রিত করে সিরিঙ্কস-এর ঝিল্লিগুলোর টান ও অবস্থানের পরিবর্তন করতে পারে ও এর ফলে শব্দতরঙ্গের কম্পনাঙ্কের হ্রাস-বৃদ্ধি হয়ে কর্কশ বা উচ্চ ও তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকতে পারে। আর দুই – ফুসফুস থেকে আসা বায়ুর চাপ কম-বেশী করে গলার আওয়াজ জোরে বা আস্তে করতে পারে। যেহেতু বিভিন্ন পাখির ক্ষেত্রে শ্বাসনালীর আয়তন ও গঠনের তারতম্য আছে তাই শ্বাসনালীতে (Wind-pipe) শব্দের সৃষ্ট অনুরণন (Resonance) পাখির কন্ঠস্বরকে প্রভাবিত করে।

সাধারণতঃ একটা পাখির যত বেশী সিরিঞ্জিয়াল পেশী থাকবে তত তার পক্ষে বিভিন্ন ভাবে ডাকা বা গান করা সম্ভব হবে। পায়রার এক জোড়া সিরিঞ্জিয়াল পেশী থাকে আর সে মুখ বন্ধ করে গলা দিয়ে বকবকম বকবকম এর মতন আওয়াজ করে। অপরদিকে গায়ক পাখিদের পাঁচ থেকে নয় জোড়া সিরিঞ্জিয়াল পেশী থাকে। পাখিদের ডাকের ধরন আবার কতকটা নির্ভর করে তাদের দৈহিক গঠনের উপর। ছোট ছোট পাখিরা উচ্চ কম্পাঙ্কের তীক্ষ্ণ একস্বরা শব্দ করে ডাকে যেমন চির্প বা পিপ। আবার লম্বা গলা রাজহাঁস বা পেলিকানদের লম্বা শ্বাসনালীতে অনুরনণের জন্য তাদের ডাক অনেকটা ভেঁপুর মতন।

সিরিঙ্কসের দুটি ভাগ দুটি ক্লোমশাখায় অবস্থিত এবং এই দুটি ভাগই শব্দ সৃষ্টি করতে সক্ষম। এর অর্থ একটি পাখি একই সময়ে দুটি ভিন্ন সুরে গাইতে পারে – এমন কি একই সাথে সে দ্বৈতকন্ঠেও গাইতে পারে। কিছু কিছু পাখি আছে যেমন থ্রাস (Thrush) জাতীয়, যারা একই সাথে একদিকে ক্রমোচ্চ স্বরে ও অপরদিকে ক্রমনিম্ন স্বরে ডাকতে বা গাইতে সক্ষম। অনেক পাখি তাদের এই দ্বৈত কন্ঠস্বরকে বিভিন্ন ভাবে ব্যবহার করে যথা একপাশ দিয়ে নিম্নসুর ও অপর পাশ দিয়ে উচ্চসুর সৃষ্টি করা অথবা এক দিক দিয়ে ডাকা ও অপর দিক দিয়ে শ্বাস গ্রহণ করা ইত্যাদি। কোন কোন পাখি আবার পর্যায়ক্রমে দুই পাশে দ্রুত স্বর বদল করতে পারে। এই ধরণের ক্ষমতার ফলে কিছু পাখি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিরিশটি বা তারও অনেক বেশী পৃথক স্বরে গাইতে পারে। কন্ঠ হ’তে পাখিরা যে শব্দ সৃষ্টি করে তার কম্পাঙ্কের প্রসার ১০০০ হার্জ থেকে ৮০০০ হার্জ অবধি হতে পারে অর্থাৎ মানুষের কানে যে শব্দ বেশ শ্রুতিমধুর হয়।

নানা পাখির নানা ভাষা – নানা রকম ডাক। গাইয়ে পাখিদের কথা তো বাদই দিলাম। তাদের আবার “সুরে সুরে কত প্যাঁচ গিটকিরি ক্যাঁচ ক্যাঁচ”। আবার একই পাখির কত রকম ডাক – মনের নানা রকম ভাব প্রকাশ করতে হবে তো। প্রত্যেক ধরণের ডাকের আলাদা রকম বিশেষত্ব আছে এবং অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পাখি তার ডাকের ধরণ বদলায়। পাখিদের এই বিভিন্ন রকমের ডাককে কয়েকটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে।  

বিপদ সঙ্কেত ধ্বনি বা বিশেষ বিপদ সঙ্কেত ধ্বনি (Alarm Call) / সঙ্কটাপন্ন অবস্থার ধ্বনি (Distress Call) / আক্রমনাত্মক ধ্বনি (Aggressive Call) / এলাকা রক্ষার ধ্বনি (Territorial defense Call)    –

পাখিদেরতো আর শত্রুর অভাব নেই। নানাবিধ শত্রুর হাত থেকে আত্মরক্ষা করে তাদের চলতে হয়। কোন পাখি যখন কোন বিপদের আশংকা করে বা শত্রুর মুখোমুখি হয় তখন তারা বিশেষভাবে ডাকে। এই বিপদ-সঙ্কেত ধ্বনিগুলো সাধারণতঃ সংক্ষিপ্ত অথচ তীব্র ও তীক্ষ্ণ স্বরবিশিষ্ট হয় যা অনেক দূর থেকেও শোনা যায় যাতে দলের বা অন্যান্য পাখিরাও সাবধান হয়ে যায়। বিপদের গুরুত্ব বুঝে অর্থাৎ শত্রু নিকটে এসে গেলে বা আক্রমন করলে সঙ্কেত ধ্বনির দ্রুত লয়ে পুনরাবৃত্তি হতে থাকে। কখনও বা পাখি এলাকা দখলের জন্য বা রক্ষার জন্য স্বয়ং আক্রমনাত্মক হয়ে শত্রুকে তাড়া করার সময়ে এ ধরণের ডাক ডেকে থাকে।  

সংযোগ-রক্ষা ধ্বনি (Flock Call) – পাখিরা যখন দল বেঁধে চলে তখন পরস্পরের সাথে সংযোগ রক্ষার জন্য মাঝারি রকম জোড়ে সাধারণ ভাবে ডাকে – কখনওবা খাবারের উৎসের সন্ধান পেলে জানান দেয়।

উড়ান-ধ্বনি (Flight Call) – অনেক পাখি ঝাঁকে বা একা উড়ে যেতে যেতে কখনো কখনো নির্দিষ্ট ভাবে ডাকতে ডাকতে যায়। এই বিশেষ ডাকটি শুধুমাত্র ওড়ার কালে ডাকে বলে একে উড়ান ধ্বনি বলে। এই ধ্বনি কতকটা সংযোগ রক্ষা ধ্বনির মতন তবে কিছুটা তিব্র অথচ সুরেলা। অনেক পাখিদের ক্ষেত্রে বিশেষতঃ উড়ন্ত পরিযায়ী পাখিদের ক্ষেত্রে এই ডাকটাই বেশী শোনা যায় আর এই ডাকের বৈশিষ্ট দিয়েই কি পাখি তা না দেখেও চিহিত করা যায়। নিদাঘের নিস্তব্ধ দুপুরে দূর আকাশ থেকে ভেসে আসা চিলের ডাক শুনে বলে দিতে হয় না ওটা কি পাখি।  

খিদের ডাক (Begging Call)  – সাধারণতঃ পাখির ছানারা খিদে পেলে মা-বাবার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য একটু নিম্নস্বরে ঘ্যানঘ্যানে কিচমিচ শব্দ করে থাকে যাকে বলা যেতে পারে খিদের ডাক ।

পাখির গান (Song)  – প্রাণীজগতে পাখির বিশেষত্ব প্রধাণতঃ দুটি কারণে – পাখি উড়তে পারে আর গান গাইতে পারে। হাতে গোণা কয়েকটা বড় পাখি ছাড়া সব পাখিই উড়তে পারে। আর গায়ক পাখিদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। সারা পৃথিবীতে যত পাখি আছে তাদের মোট ২৩টি বর্গ (Order), ১৪২টি গোত্র (Family), ২০৫৭টি গণ (genus) এবং ৯৭০২টি প্রজাতিতে (species) বিন্যস্ত করা হয়েছে। হিসাবে অল্পস্বল্প এদিক ওদিক হতে পারে। এদের মধ্যে সবথেকে বড় বর্গ হোল Passeriformes যাকে বলে দাঁড়ে বসা পাখি । এদের পায়ে চারটে আঙ্গুল – তিনটে সামনের দিকে আর একটা পেছনের দিকে – যার প্রজাতি সংখ্যা প্রায় ৫৭০০। এই দলে প্রায় ৪০০০ প্রজাতির পাখি আছে যারা গায়ক পাখি বলে পরিচিত (Oscines or Songbirds)।  

পাখির বিভিন্ন ধরণের ডাকের মধ্যে গান হ’ল সবথেকে বৈশিষ্টপুর্ণ ও পরিচিত শব্দ। সাধারণভাবে গানগুলি একটু দীর্ঘায়িত, জটিল ও সুরারোপিত হয়ে থাকে। গান গাইবার ক্ষমতা পাখির কিছটা সহজাত আর কিছুটা শুনে শুনে শেখা। সাধারণতঃ পুরুষ পাখিরাই গান গায় তবে ব্যাতিক্রমের সংখ্যা খুব কম নয় – অনেক প্রজাতির স্ত্রী পাখিরাও গান গায়। পাখির গানের উদ্দেশ্য প্রধাণতঃ প্রজনন ঋতুতে সঙ্গী আকর্ষণের জন্য আর এলাকা দখলের নিমিত্ত নিজেকে বিজ্ঞাপিত করা বা তার এলাকায় তারই প্রজাতির অপর কোন অনুপ্রবেশকারীকে নিরুৎসাহিত করা। প্রত্যেক প্রজাতির পাখির গানের বিশিষ্টতা আছে আর এই গানের  মান, স্থায়িত্ব এবং সুর বা ছন্দের বদল পাখির বয়স, লিঙ্গ, ভৌগলিক অবস্থান, ঋতু ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীল। গায়ক পাখি দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে গাইতে পারে, কোন কোন পাখি শুধু সকালে আর বিকেলের সময়ে গায় আর  কেউ বা সারাদিনই গান গায়। ভোর বা সকালের দিকে পাখিদের গানের এক ঐকতান শোনা যায় বিশেষ করে বসন্তকালে যাকে বলে প্রভাতী সঙ্গীত (Dawn Chorus)। আসলে সারা রাত বিশ্রামের পর ভোরবেলা শরীরটা তাজা থাকে, সকালের পোকামাকড়ের জলখাবারটা ভালই মেলে। সঙ্গিনীকে আকর্ষণের জন্য ও আগেভাগে যে যার এলাকা দখলের জন্য শুরু করে দেয় জলসা। তা ছাড়া সকালবেলায় প্রকৃতি কিছুটা নিস্তব্ধ থাকে, বাতাসের গতিবেগ থাকে মন্থর, কোন রকম আলোড়ন থাকে না – ফলে পাখির গানটাও অনেক দূর থেকে বেশ ভালভাবেই শোনা যায়। কারুর কারুর আবার বসন্তকালে বা প্রজনন ঋতুতে গলা খোলে। কোন কোন ওস্তাদ গায়ক আবার অন্য পাখিদের গলাও নকল করতে পারে। আমাদের আশেপাশে খুব পরিচিতদের মধ্যে দোয়েল, কোকিল, পাপিয়া, বুলবুলি, টুনটুনি, দামা, বেনেবৌ, ফটিক জল, চড়াই – এরা প্রতিষ্ঠিত গায়ক পাখি। অন্যান্য ভারতীয় পাখি যেমন শ্যামা, মালাবার হুইসলিং থ্রাস, বিদেশী পাখিদের মধ্যে ক্যানারি, রবিন, নাইটিংগেল, মকিংবার্ড, চাইনিজ হোয়ামি থ্রাস বিশ্বের সেরা গায়কপাখি রূপে গণ্য হয়।   

অনেক প্রজাতির পুরুষ পাখিরা সাধারণতঃ কোন উঁচু গাছের ডাল, ইলেকট্রিকের তার বা পোস্টে বসে গান করে আর তার ফলে তার গান অনেক দূর থেকেও শোনা যায়। যে সব পাখি ঘাসজমিতে বিচরণ করে তাদের ডাক সাধারণতঃ ওড়বার কালে শোনা যায়। যারা বনে বা ঘন গাছপালার আড়ালে থাকে তাদের গানের গলার জোড় বেশী হয় কারণ শব্দের অনেকটা গাছপালা শুষে নেয়। পাখির গানের ওপর আবহাওয়ারও প্রভাব আছে। খুব গরমে বা ঠান্ডায়, প্রবল ঝড়বাতাসে কি আর পাখি গান গায়?  

শুধু কি গায়ক পাখি? তোতা জাতীয় পাখি যেমন টিয়া, ময়না, কাকাতুয়া, ম্যাকাও – এরা আবার মানুষের গলা এমনভাবে নকল করতে পারে মনে হয় যেন কথা বলছে। সত্যি কথা বলতে পাখিরা কখনই মানুষের মতন ভেবে চিন্তে কথা বলে না। এরা আসলে কোন শব্দ শুনে শব্দের অনুকরণ করতে পারে। এ জাতীয় পাখিগুলোকে মানুষ সাধারণত খাঁচায় পোষে। মানুষের সাথে সামাজিক পরিবেশে থাকার কালে মানুষের টুকরো টুকরো কথা বা ছোট ছোট বাক্য সে অনুকরণ করে ডাকে। তবে অন্যান্য পাখিদের তুলনায় এরা যথেষ্ট চালাক ও বুদ্ধিমান হয়। এরা দ্রুত শিখতে পারে আর বহুসংখ্যক শব্দতালিকা মনে রাখতে পারে। তোতা জাতীয় পাখিদের জিভ মোটা আর মানুষের আঙুলের মতন হওয়ায় তাকে চালনা করে আর অনেকটা নিম্নস্বরে শব্দ সৃষ্টি করতে পারে বলে মানুষের কথা অনুকরণ করতে সক্ষম হয়।   

পক্ষীবিজ্ঞানে পাখির ডাক রেকর্ড করা আর তার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও চর্চ্চা করা হয়ে থাকে। গত প্রায় সত্তর বছরে ক্রমান্বয়ে ভয়েস রেকর্ডিং সিস্টেমের প্রযুক্তিগত উন্নতি ও উন্নততর প্রজন্মের কম্পিউটার ও সফটওয়্যারের বিকাশের ফলে পাখীর ডাক ও গানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে। যে পদ্ধতিতে পাখির ডাক বা গান বিশ্লেষণ করা হয়ে থাকে তাকে বলা হয় সোনিক অ্যানালিসিস বা অডিও স্পেক্ট্রোগ্রাম অ্যানালিসিস। এই পদ্ধতিতে পাখির ডাক বা গান জনিত যে শব্দতরঙ্গের সৃষ্টি হয় সময়ের সাথে তার বিস্তারের ও কম্পনাঙ্কের ক্রম-পরিবর্তনকে রেখচিত্রের (Sonogram) মাধ্যমে চিত্রিত করা হয় ও তার বিশদ বিশ্লেষণ করা হয়। কখনও আবার বিস্তারের ও কম্পনাঙ্কের রেখচিত্র পরীক্ষা করা হয়। এই ধরণের রেখচিত্রে পাখীর বিভিন্ন রকমের কন্ঠস্বরকে যেমন শিস, স্বরের কম্পন, কর্কশ স্বর বা একমাত্রার ডাক যথা চিপ বা অনুনাসিক শব্দ যথা কোয়াক ইত্যাদি আলাদা ভাবে চিহ্নিত করা যায়। গায়ক পাখিদের দ্রুত স্বরের পরিবর্তনের পার্থক্য নিরূপন করা সম্ভব।     

পাখির ডাকের চারটি মৌলিক প্যাটার্ন হ’ল Phrases, Series, WarblesTrill – এর মধ্যে ফ্রেসেস, সিরিজ বিলম্বিত লয়ের ধ্বনি যার স্বতন্ত্র স্বরগুলিকে গণনা করা যায়। ফ্রেসেসে যে স্বর থাকে তার পুনরাবৃত্তি হয় না কিন্তু সিরিজের স্বরগুলির পুনরাবৃত্তি হয়। ওয়ারবল্‌স (কলনাদ) বা ট্রিল (স্বরের কম্পন) দ্রুত লয়ের যার স্বরগুলি গণনা করা যায় না (প্রতি সেকেন্ডে আটটিরও বেশী)। এই দ্রুত লয়ে একক স্বরগুলি একসাথে ধ্বনিত হয়ে একটি ওয়ারবল্‌স পরিণত হয় ও অনুরূপ ওয়ারবল্‌সগুলি মিলে আবার একটি ট্রিল সৃষ্ট হয়।         

পাখির কন্ঠঃনিসৃত ধ্বনি সনাক্তকরণে কম্পাঙ্কের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ কি ভাবে কম্পাঙ্কের পরিবর্তন সাধিত হয়। পাখির ডাকের বা গানের যে সকল দৃষ্টিকোন থেকে কোন প্রজাতির পাখিকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায় তা হ’ল – কম্পাঙ্কের বিন্যাস, লয় (দ্রুত অথবা বিলম্বিত), পুনরাবৃত্তি, বিরতি এবং স্বরের গুণমান যা অডিও স্পেক্ট্রোগ্রাম থেকে গুণগত (Qualitative) ও মাত্রিক (Quantitative) উভয়ভাবেই নিরূপণ করা যায়। এ জাতীয় চর্চ্চায় দেখা গেছে, পাখিরা যে ধ্বনি সৃষ্টি করে তার এক নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক সারি থাকে। প্রত্যেক প্রজাতির পাখির একটি বিশিষ্ট কম্পাঙ্ক থাকে যার প্রাধান্য সবচেয়ে বেশী।     

প্রতিটি প্রজাতির প্রতিটি পাখির বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ডাকার বা গাইবার জন্য বিভিন্ন ধরণের ডাক বা গানের সম্ভার (Repertoire) থাকে যাকে তার গীতসম্ভার বা গানের ঝুলি বলা যেতে পারে যার প্রতিটি ডাক বা গান বিশেষ কোন বার্তা বহন করে নিয়ে যায়। গায়ক দলের পুরুষ পাখিদের গানের ঝুলিতে দুই বা ততোধিক গান থাকে যাদের প্রত্যেকের স্বর ও তার বাঁধাধরা লয়, পুনরাবৃত্তি ইত্যাদি মিলে একটি নির্দিষ্ট গান তৈরী হয়।  কোন কোন নামজাদা গায়ক পাখির ঝুলিতে অসংখ্য গান থাকে। এর চরমসীমার উদাহরণে বলতে হয় উত্তর আমেরিকার পুরুষ ব্রাউন থ্রাসার পাখি (Toxostoma rufum) যার ঝুলিতে আছে প্রায় এক হাজারেরও বেশী গান। ইউরেশিয়ান রেন (Troglodytes troglodytes) পাখি  প্রতি মিনিটে সাতশ চল্লিশটি ভিন্ন রকমের স্বরে গাইতে পারে যা প্রায় পাঁচশ মিটার দূর থেকে শোনা যায়। পাখিটির আকার প্রায় দশ সেন্টিমিটারের মতন – যদি মানুষের আকারের হ’ত তা হ’লে এ গান চার-পাঁচ মাইল দূর থেকে শোনা যেত – সেই ভীষ্মলোচন শর্মার মতন – “আওয়াজখানা দিচ্ছে হানা দিল্লি থেকে বর্মা”। চিত্র ৩ ও ৪ এ দুটি পাখির গানের সোনোগ্রাম চিত্রের নমুনা। কোকিলের গানের তুলনায় ইউরেশিয়ান রেনের গান যে কত জটিল তা শুধু চিত্র দেখেই বোঝা যায়।

চিত্র – ৩ (ক)  কোকিলের গানের সোনোগ্রাম চিত্র (সময় ১ মিনিট)

 

চিত্র – ৩(খ) কোকিলের গানের সোনোগ্রাম চিত্র (সম্প্রসারিত)

 

চিত্র – ৪ (ক)  ইউরেশিয়ান রেন পাখির গানের সোনোগ্রাম চিত্র (সময় ১ মিনিট)

 

চিত্র – ৪ (খ)  ইউরেশিয়ান রেন পাখির গানের সোনোগ্রাম চিত্র (সম্প্রসারিত)

এক একটা পাখিকে দেখা যায় কি রকম মাথা ঝাঁকিয়ে সারা শরীর ঝাঁকিয়ে, লেজ নাচিয়ে, গলা ফুলিয়ে ডাকে বা গান করে থাকে। আসলে ডাকা বা গান করার সময়ে পাখিদের শরীরের যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি খরচ হয়। কোন প্রাণীর শরীরে তার সম্পূর্ণ নিশ্চল অবস্থায় যে শক্তি খরচ হয় অর্থাৎ শ্বাসপ্রশ্বাস ও শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে – তাকে বলে মৌলবিপাকের হার (Basal Metabolic Rate) । ডাকা বা গান গাইবার কালে পাখির শরীরে যে শক্তি খরচ হয় তার পরিমাণ মৌলবিপাকের হারের ১.২ – ১.৪ গুণ। এই গবেষণালব্ধ তথ্য অবশ্য খাঁচার পাখিদের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রাপ্ত। মুক্ত পাখিদের ক্ষেত্রে এ জাতীয় ল্যাবরেটরি-পরীক্ষা সম্ভবপর হয় না।  

বর্তমানে বিশ্বের অনেক শিক্ষামূলক ও গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানে পক্ষীশব্দতত্ত্ব (Bird Acoustics) নিয়ে বিভিন্ন ধরণের যেমন পাখির ডাকের বা গানের গাঠনিক বৈশিষ্ট, পাখির গলায় গানের উদ্ভব কি ভাবে হয়, ডাক বা গানের সাথে তার পেশীর, স্নায়ুর বা বিপাকিয় প্রক্রিয়ার কি ভূমিকা, পরিবেশ ও পাখির সাময়িক আচরণের সাথে পাখির ডাক বা গানের সম্বন্ধ, ডাক বা গান কি করে নিশ্চিতভাবে পাখিকে চিহ্নিত করতে পারে, বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে ক্রমবিবর্তনমূলক সম্পর্ক (Phylogenetic Reltionship), সামাজিক জীববিদ্যা (Social Biology), আচরণগত বাস্তব্যবিজ্ঞান (Behavioral Ecology) ইত্যাদি বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে গবেষণার কাজ চলছে। এতে পদার্থবিদ, জীবরসায়নবিদ, পক্ষীতত্ত্ববিদ, স্নায়ুবিজ্ঞানী, জীনতত্ত্ববিদ, কম্পিউটার বিজ্ঞানী অনেকেই জড়িত আছেন। আমাদের ভারতবর্ষের অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানে পক্ষীশব্দতত্ত্ব নিয়ে গবেষণার কাজ হয়েছে এবং হচ্ছে। তা সত্ত্বেও এখনও এ বিষয়ে মানুষের জ্ঞান অনেক সীমিত এবং অনেক কিছুই জানা বাকি রয়ে আছে।     

তথ্যসুত্র – বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও ইন্টারনেটে প্রাপ্ত গবেষণাপত্র

[চিত্র ৩ ও ৪ এর সোনোগ্রাম কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউ, এস, এ) কর্নেল ল্যাব অফ অরনিথোলজির দ্বারা উদ্ভাবিত Raven Pro 64 Sound Analysis Software এর সাহায্যে নেওয়া হয়েছে। কোকিল ও ইউরেশিয়ান রেনের গান ইউটিউব থেকে ডাউনলোড করা। এই বিশেষ সফটওয়্যারটি উপহার হিসেবে পাওয়ার জন্য লেখক কর্নেল ল্যাব অফ অরনিথোলজির নিকট কৃতজ্ঞ।]    

 

বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকায় (৭১ তম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা – ১০ই জানুয়ারী, ২০১৮, পৃঃ ২৮) প্রকাশিত। 

 

 

 

 

 

 

অপার্থিব মেধার সন্ধানে

অপার্থিব মেধার সন্ধানে – ১

ফের্মি প্যারাডক্স

পৃথিবী ছাড়া অন্য কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব আছে – এ ধারণা নিশ্চয়ই প্রাচীন – না হ’লে পৌরাণিক কাহিনীতে দেবতা বা রাক্ষসের আবির্ভাব হ’ত না। স্বর্গ বা পাতাল ভিনগ্রহ বলে চিহ্নিত না হলেও মর্ত্যলোক বা আমাদের পৃথিবীতো নয়। দেবতারা কি গ্রহান্তরের মানুষ – এই সব ভাবনা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যাথা নেই – কিন্তু যখন লাল মঙ্গল গ্রহটা দেখি মনে পড়ে এইচ জি ওয়েলসের লেখা ‘ওয়ার অফ দা ওয়ারল্ডস’। টেলিস্কোপে মঙ্গল গ্রহ দেখে তার ম্যাপ করতে গিয়ে ১৮৭৭ সালে ইটালির বৈজ্ঞানিক জিওভানি ভার্জিনিও শিয়াপারেলি মঙ্গলের মাটিতে কিছু সরু রেখা ও কালছে ছোপ দেখে সন্দেহ করেছিলেন যে রেখাগুলি হ’ল উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরী জলের নালা বা খাল আর ছোপগুলি সমুদ্র। ১৮৯৪ সালে আমেরিকান বৈজ্ঞানিক পার্সিভাল লোয়েলও নাকি টেলিস্কোপে মঙ্গলের তৃণভূমি ও মরুভূমি দেখতে পেয়েছেন এবং ধারণা করেন যে মঙ্গলের উত্তরমেরুতে যে বরফের টুপি আছে সেখান থেকে জল খাল দিয়ে আসে চাষ আবাদের জন্য এবং সেখানে উন্নত সভ্যতা বিরাজ করছে। সম্ভবতঃ এরই ফলশ্রুতি ১৮৯৮তে লেখা কল্পবিজ্ঞান ভিত্তিক উপন্যাস এইচ জি ওয়েলসের ‘ওয়ার অফ দা ওয়ারল্ডস’ – বিকট দর্শন মঙ্গলবাসীদের পৃথিবী আক্রমণ। শুরু হ’ল কল্পবিজ্ঞানে ভিনগ্রহের অধিবাসীদের আবির্ভাব। গত একশ বছরেরও বেশী সময় ধরে এই ভিনগ্রহীদের নিয়ে কত যে গল্প, উপন্যাস, চিত্র, কমিকস, চলচ্চিত্র এমন কি হাল আমলে ভিডিও গেমস-এর সৃষ্টি হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কল্পনা, স্বপ্নজগৎ, গল্প, সিনেমা চিত্ত বিনোদনের জন্য ঠিক আছে কিন্তু বাস্তব কি বলছে? পেয়েছি কি আমরা অন্তত একটা ভিনগ্রহীরও সন্ধান? না কি ‘আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে’! এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের বক্তব্য কি?

সেটা জানতেই এক রবিবার সকালে এসেছিলাম প্রফেসর ভট্টের বাড়িতে। প্রফেসর মহাকাশ ভট্ট – আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট। বিদেশেই প্রায় সারাজীবন কাটিয়েছেন। একসময়ে নাসাতেও কয়েকবছর ছিলেন। এখন আমার প্রতিবেশী। লম্বা দোহারা চেহারা – চোখে পুরু কালো ফ্রেমের হাই পাওয়ারের চশমা। এক মাথা সাদা চুল – আর তার সাথে মানানসই সাদা দাড়ি। একজন ফরাসী মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন। বছর চারেক আগে স্ত্রীবিয়োগ হলে প্রফেসর ভট্ট সব ছেড়ে অবসর নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। দুই ছেলে আমেরিকাতেই থেকে যায়। উনি বছরে একবার করে ছেলেদের কাছে যান। কয়েকমাস থেকে আবার ফিরে আসেন।

এখানকার পৈতৃক বাড়িটা নতুন করে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়েছেন। সংসার বলতে দুটো চাকর, একটি রান্নার ঠাকুর, ড্রাইভার আর বাগান দেখার জন্য মালী। প্রায়ই আমি আসি ওনার সাথে গল্প করার জন্য। ওনার ড্রয়িং রুম, বেড রুম, স্টাডিরুম শুধু বই আর বিদেশী বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নালে ঠাসা। শুধু বিজ্ঞান নয় – ভারতীয় ও পাশ্চাত্ত্য দর্শনেও ওনার অগাধ জ্ঞান। বিদেশে থাকতেই বিজ্ঞান ও দর্শনের ওপর একটা বই লিখেছিলেন – ‘আই অ্যাম ইনফিনিটি’ – নিউ ইয়র্কের এক নামকরা প্রকাশনা সংস্থা রেডিয়াম হাউস এটি প্রকাশ করে। এক সময়ে বইটি বেস্ট সেলার ছিল। আামাকে এক কপি উপহার দিয়েছিলেন। পড়েছিলাম – ভাল বুঝতে পারি নি। এখন আর একটা বই লিখছেন – ‘ফ্রম সিঙ্গুলারিটি টু ইনফিনিটি’। রেডিয়াম হাউসই প্রকাশ করবে।

আমরা স্টাডি রুমেই বসলাম। বয়স্ক সহকারী ধরণীকে ডেকে জলখাবার আর কফি স্টাডিতেই দিতে বললেন – স্যার আবার চাকর বলাটা পছন্দ করেন না।  আমি বললাম – “আচ্ছা স্যার এই যে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে কত কোটি কোটি তারা রয়েছে – তাদেরওতো আমাদের পৃথিবীর মতন গ্রহ থাকা স্বাভাবিক আর সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চয়ই  আছে এমনকি আমাদের মতন বা আমদের থেকেও উন্নত সভ্যতা বিরাজ করতে পারে। কিন্তু এখনও পর্য্যন্ত অন্য গ্রহে কোনও রকম প্রাণ থাকার আভাষটুকুও পাওয়া গেল না। বিজ্ঞানীরা এ পর্য্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজারের ওপর অসৌর গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন। তাদের মধ্যেও কি কোন প্রাণের সন্ধান পাওয়া যায় নি? তা হ’লে কি ধরে নিতে হবে শুধুমাত্র পৃথিবীতেই প্রাণ আছে?”

ইতিমধ্যে কফি আর স্যান্ডউইচ এসে গেছে। স্যার আমাকে একটা প্লেট হাতে ধরিয়ে নিজেরটা নিলেন। খেতে খেতেই আলোচনা চলতে লাগল। স্যার বললেন – “তুমি যে প্রশ্নটা করলে অর্থাৎ ভিনগ্রহে প্রাণ থাকার প্রবল সম্ভাবনা অথচ কোন রকম প্রমাণের একান্ত অভাবের এই আপাত বিরোধিতাকে বলা হয়ে থাকে ফের্মি প্যারাডক্স। ফের্মির নাম তো জান – নোবেল পুরস্কার পাওয়া বিখ্যাত ইটালিয়ান বৈজ্ঞানিক এনরিকো ফের্মি, যিনি অ্যাটমিক রিএক্টরের উদ্ভাবক। যদিও এই প্যারাডক্স ফের্মির নাম দিয়ে চালানো হয়, ফের্মি নিজে কিন্তু এরকম ভাবে কোন মন্তব্য করেন নি বা গবেষণাও করেন নি। আসল ঘটনাটা তোমায় বলি। এটা জানা দরকার। ১৯৫০ সালের মে মাসের কথা। ফের্মি তখন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বছরে কয়েক সপ্তাহের জন্য তাঁর প্রাক্তন কর্মস্থল লস অ্যালামস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে পরামর্শদাতা রূপে আসতেন। একদিন দুপুরে তাঁর তিন সহকর্মী এমিল কোনোপিনস্কি, এডোয়ার্ড টেলার আর হার্বার্ট ইয়র্কের সাথে ফুলার লজ নামে একটা বাড়িতে লাঞ্চে যাবার পথে ‘দা নিউ ইয়র্কার’ ম্যাগাজিনের কার্টুনিস্ট অ্যালান ডনের আঁকা একটা কার্টুন নিয়ে কথা বলছিলেন। কার্টুনটা ছিল এক দল ভিনগ্রহী ইউফো থেকে নেমে এসে নিউ ইয়র্কের রাস্তা থেকে ডাস্টবিনগুলো চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে।

 

এই সময়ে তাঁদের মধ্যে খুবই সাধারণভাবে মহাকাশ ভ্রমণ, ভিনগ্রহী ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তারপরে অবশ্য আলোচনার প্রসঙ্গ পালটে যায়। খাবার টেবিলে ফের্মি হঠাৎ দুম করে প্রশ্ন করেন – “Where is everybody?” উপস্থিত সকলে হেসে ওঠেন ও ধরে নেন যে ফের্মি ভিনগ্রহীদের কথা বলছেন। পরবর্ত্তীকালে ফের্মির এই ধারণাটা ফের্মি প্যারাডক্স রূপে খ্যাত হয়। এর মূল বক্তব্যটা আমি তোমাকে একটু বলি।

আমাদের মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গা ছায়াপথের মধ্যে কোটি কোটি পৃথিবীর মতন বাসযোগ্য গ্রহ থাকতেই পারে। দেখ আমাদের এই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেই খুব কম করে হলেও দশ হাজার কোটি তারা আছে। তুমি যদি একটুও না থেমে মিনিটে একশ করে গুণে যাও তোমার সময় লাগবে এক হাজার নয়শ দুই বছর ছয় মাস। কাজেই বুঝতে পারছ সংখ্যাটা কত বড়। তাদের কম করে গড়ে যদি একটা করেও গ্রহ থাকে তা হলেও দশ হাজার কোটি গ্রহ আছে। এদের এক শতাংশ আমাদের পৃথিবীর মতন গ্রহ হয় তবে তার সংখ্যা একশ কোটি। এদের মধ্যে ধরে নেওয়া যাক এক শতাংশ অর্থাৎ এক কোটি গ্রহে প্রাণ আছে। তারও এক শতাংশে যদি আমাদের মতন বুদ্ধিমান জীবন ও প্রযুক্তিগত সভ্যতা বা তার থেকেও উন্নত সভ্যতা থেকে থাকে তো তার সংখ্যাও এক লক্ষ।  তাদের মধ্যে কেউ না কেউ অতি দূরপাল্লার আন্তর্তারকা ভ্রমণের উপায় আবিষ্কার করবে ও কাছাকাছি কোন তারার বাসযোগ্য গ্রহে উপনিবেশ স্থাপন করবে। কালক্রমে এই ঔপনিবেশিকরা অন্যান্য গ্রহে তাদের নিজস্ব উপনিবেশ স্থাপন করার জন্য অভিযান করবে এবং ছায়াপথের প্রতিটি বাসযোগ্য গ্রহেতে না পৌঁছানো পর্যন্ত প্রক্রিয়া ক্রমাগত চলতে থাকবে। এই প্রক্রিয়ায় যদি কয়েক কোটি বছরও লাগে অসুবিধা নেই কারণ আমাদের গ্যালাক্সির প্রায় তেরশ কোটি বছর বয়সের তুলনায় এই সময়টা কিছুই নয়। এ রকম যদি ঘটে থাকে তবে আমাদের পৃথিবীতে ইতিমধ্যেই এক বা একাধিক ভিনগ্রহীর পদার্পন হতোই এবং তার প্রমাণও যথেষ্ট পাওয়া যেত। আজ পর্য্যন্ত যখন সে রকম কোন প্রমাণই আমরা পাই নি তা হলে কি আমাদের একমাত্র পৃথিবী ছাড়া এই গ্যালাক্সিতে আর কোথাও কোন রকম বুদ্ধিমান জীব নেই?

 এই তত্ত্বটাকে ফের্মি প্যারাডক্স বলে চালান হলেও না ফের্মি এটার অবতারণা করেছেন না এটা একটা প্যারাডক্স। আসলে এর প্রবক্তা ছিলেন আমেরিকার কলোরাডোর ন্যাশনাল সেন্টার ফর অ্যাটমোস্ফিয়ারিক রিসার্চের জনৈক জ্যোতির্বিদ মাইকেল হার্ট। তিনি ১৯৭৫ সালে নানারকম যুক্তির জাল বিস্তার করে সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে পৃথিবীতে মানুষ যেমন বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে উপনিবেশ স্থাপন করেছে সে রকম বহির্বিশ্বে কোথাও বুদ্ধিমান সত্ত্বা থাকলে তারা এতদিনে সমস্ত গ্যালাক্সিতে ছড়িয়ে পড়ত এবং আমাদের পৃথিবীতেও আসতো। যেহেতু তারা কেউ আমাদের পৃথিবীতে কোনদিন আসে নি সেই হেতু পৃথিবী ছাড়া আর কোথাও তাদের অস্তিত্ব নেই। তাঁর গবেষণাপত্রটি পড়লে তাঁর যুক্তিগুলো খুব একটা সবল গ্রহনযোগ্য বলে আমার অন্তত মনে হয় না। আমাদের পৃথিবী ছাড়া আর কোথাও কোন উন্নত বুদ্ধিমান প্রাণের অস্তিত্ব নেই – এই সিদ্ধান্তের সাথে হার্ট আরও দুটি অনুসিদ্ধান্ত করেন। প্রথমটি এই যে ব্যাপকভাবে ভিনগ্রহীদের অনুসন্ধান চালান হচ্ছে এটা নিছক সময় ও বিপুল অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। আর দ্বিতীয় সুদূর ভবিষ্যতে একমাত্র আমাদের পৃথিবীর সংস্কৃতির পরম্পরাই গ্যালাক্সির সমস্ত বাসযোগ্য গ্রহে ছড়িয়ে পড়বে। ১৯৮০ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক টিপলার আরও জোরাল যুক্তি দিয়ে হার্টের বক্তব্যকে সমর্থন করেন।

মজার কথা হচ্ছে হার্ট তার প্রবন্ধে কোথাও ফের্মির নাম উল্লেখ করেন নি। অপার্থিব মেধা নিয়ে ফের্মির ওই সেদিনের এক লাইনের কথা ছাড়া আর কোথাও কোনও বক্তব্য বা রচনা পাওয়া যায় নি। ১৯৬৩ সালে কার্ল সাগানের একটি প্রবন্ধের পাদটিকায় শুধু ফের্মির এই এক লাইনের কথাটার উল্লেখ আছে। ভিনগ্রহীদের অস্তিত্ব ও তাদের সাথে যোগাযোগের বিষয়ে গত অর্ধ শতাব্দীতে যাঁরা গবেষণা করেছেন তাঁদের মধ্যে নিঃসন্দেহে কার্ল সাগানের নাম এক নম্বরে থাকবে। টিপলার ধরেই নিয়েছিলেন ফের্মির মতন প্রথম সারির বিজ্ঞানীও ভিনগ্রহীদের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন না। সে সময়ে অর্থাৎ ষাট-সত্তর-আশীর দশকে একদিকে যেমন কার্ল সাগান, জিল টার্টার, ফ্রাঙ্ক ড্রেক, চার্লস টাউনস, ফিলিপ মরিসন, জিউসেপি ককোনি জোর কদমে অপার্থিব মেধার সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন অপরদিকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী মাইকেল হার্ট ও ফ্রাঙ্ক টিপলার এবং জর্জ সিম্পসনের মতন বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানীদের বক্তব্য ছিল একমাত্র পৃথিবী ছাড়া আর কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব নয়। টিপলার এর সাথে ফের্মির মতন বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর নামটা জুড়ে দল ভারী করে নিলেন।

অ্যামেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে মহাকাশ সংক্রান্ত গবেষণার প্রধান সংস্থা ন্যাশনাল এরোনটিকস এন্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেসন বা নাসা। ভিনগ্রহী অনুসন্ধানের গবেষণার জন্য নাসার প্রকল্প ছিল SETI বা Search for Extra-terrestrial Intelligence। বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সময় ব্যায় করেও কিন্তু কুড়ি বছরেও কোন রকম অপার্থিব মেধার সংকেত পাওয়া গেল না। ১৯৮১ সালে উইসকনসিনের ডেমোক্র্যাট সিনেটর উইলিয়াম প্রক্সমাইয়ার টিপলারদের মত সমর্থন করে এই অবাস্তব প্রকল্পের জন্য জনগণের প্রদত্ত করের টাকার অপচয় হচ্ছে বলে শেষ পর্য্যন্ত নাসার SETI প্রকল্পটি বন্ধ করান। পরে ১৯৮৩ সালে আবার কার্ল সাগানের উদ্যোগে SETI প্রকল্প নতুন করে শুরু হয় কিন্তু ফলাফলের ব্যর্থতা, নানাজনের বিরূপ মন্তব্য ও বিশেষতঃ  নেভাডার  ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্রায়ানের উদ্যোগে নাসার এই অপার্থিব মেধা সন্ধানের প্রকল্পটি একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

১৯৫৪ সালে ক্যান্সার রোগে ফের্মির মৃত্যু হয়। এর প্রায় তিরিশ বছর পরে লস অ্যালামস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী এরিক জোনস ফের্মি সেদিন ঠিক কি বলেছিলেন তার অনুসন্ধান করার প্রচেষ্টা করেন। ফের্মির সেদিনের তিন আলোচনা সঙ্গী এমিল কোনোপিনস্কি, এডোয়ার্ড টেলার আর হার্বার্ট ইয়র্ক তখনও জীবিত। জোনস তাঁদের কাছে ইমেইল পাঠিয়ে জানতে চান ফের্মি তাঁদের সাথে এ বিষয়ে কি আলোচনা করেছিলেন। তিন জনই তাঁদের স্মৃতি থেকে সেদিনের ঘটনার বিবরণ জোনসকে জানিয়েছিলেন।

আমেরিকা থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞান জার্নাল ‘আস্ট্রোবায়োলজি’ মার্চ ২০১৫ সংখ্যায় তথ্য বিশ্লেষক, লেখক ও জ্যোতির্বিদ রবার্ট গ্রে ফের্মি প্যারাডক্সের ওপর একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এরিক জোনসের রিপোর্ট ও এই বিষয়ের ওপর প্রকাশিত তৎকালীন বিবিধ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ ছিল তাঁর আলোচনার ভিত্তি। ‘ফের্মি প্যারাডক্স’ কথাটি প্রথম ব্যাবহার করেন ডি জি স্টিভেনসন ১৯৭৭ সালে তাঁর ব্রিটিশ ইন্টারপ্ল্যানেটরি সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে অর্থাৎ ফের্মি মারা যাবার তেইশ বছর পরে। আসলে এই তত্ত্বটি যিনি প্রথম বিশদ ভাবে আলোচনা করেন তিনি বিজ্ঞানী মাইকেল হার্ট – রয়াল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির জার্নালে ১৯৭৫ সালে। কার্ল সাগান তাঁর এক গবেষণা পত্রের পাদটিকায় ফের্মির প্রশ্নটিকে “Where are They?” বলে উল্লেখ করেছেন। পরবর্ত্তীকালে ফের্মির প্রশ্নটি অধিকাংশ লোকে “Where are They?” বলে জানে। এই ফের্মি প্যারাডক্সকে বিষয় করে অনেক সেমিনার, কনফারেন্সও হয়েছে।

এমিল কোনোপিনস্কি, এডোয়ার্ড টেলার আর হার্বার্ট ইয়র্ক তাঁদের স্মৃতি থেকে সেদিন কি আলোচনা হয়েছিল তা এরিক জোনসকে ইমেইলে জানিয়েছিলেন যার প্রতিলিপি জোনস তাঁর রিপোর্টে দাখিল করেছিলেন। সেখানে দেখা যাচ্ছে যে ফের্মি কথাটা বলেছিলেন – “Where is everybody” এবং তিনজনেই সেটা উল্লেখ করেছেন। তিন জনের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে ফের্মি কখনোই ভিনগ্রহীদের অস্তিত্বে সন্দেহ প্রকাশ করেন নি। তিনি বরং আলোচনা করেছিলেন আন্তর্তারকা ভ্রমণের সম্ভাব্যতা নিয়ে। এডোয়ার্ড টেলার যাঁকে ‘ফাদার অফ হাইড্রোজেন বম্ব’ বলা হয় – তিনি বলেছিলেন যে আলোচনাটা মূলতঃ হয়েছিল মহাকাশ ভ্রমণ নিয়ে। ফের্মি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন –“টেলার, তুমি কি মনে কর? আগামী দশ বছরের মধ্যে কোন বস্তুর আলোর চেয়ে দ্রুত গতিতে যাবার সম্ভাবনা কতটা?” টেলার বলেছিলেন সম্ভাবনাটা দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ। আলোচনাটা হাল্কা চালেই হয়েছিল – এ কথা সে কথার মাঝখানে ফের্মি হঠাৎ দুম করে বলে বসেন – “Where is everybody?” ফের্মির বলার আকস্মিকতায় সকলে হেসে উঠেছিল এবং এটা সবাই ধরে নিয়েছিল যে ফের্মি ভিনগ্রহীদের সম্বন্ধেই কথাটা বলেছেন।

হার্বার্ট ইয়র্ক জানিয়েছিলেন যে ফের্মি এর পরে কিছু সম্ভাব্যতার হিসেব করতে থাকেন যেমন আমাদের পৃথিবীর মতন কত গ্রহ থাকতে পারে, তাদের মধ্যে কতগুলিতে প্রাণ এবং কতগুলিতে মানব থাকা সম্ভব, তাদের মধ্যে আবার কতগুলিতে উন্নত প্রযুক্তিগত সভ্যতা থাকতে পারে ইত্যাদি। গণনার ভিত্তিতে তিনি বলেছিলেন যে – ইতিমধ্যেই ভিনগ্রহীদের পৃথিবীতে আসা উচিৎ ছিল এবং তাও অনেকবার। কিন্তু এ পর্য্যন্ত কোন ভিনগ্রহীর পৃথিবীতে না আসার কারণ, আন্তর্তারকা মহাকাশ  ভ্রমণ সম্ভব নয়। যদি সম্ভব হয়ও তারাদের মধ্যে দূরত্ব এতটাই বেশী যে সে প্রচেষ্টা করা অর্থহীন। অথবা কোন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিক সভ্যতা এ জাতীয় ঘটনা ঘটানোর মতন তত দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এমিল কোনোপিনস্কি জানিয়েছিলেন যে উনি যখন পার্টিতে যোগদান করেন তখন ফ্লাইং সসার নিয়ে কথা হচ্ছিল এবং উনি এই প্রসঙ্গে দা নিউ ইয়র্কার কাগজের কার্টুনটার কথা তুলেছিলেন। সেখান থেকে আলোচনাটা ওঠে যে ফ্লাইং সসারের গতি আলোর গতি থেকে বেশী করা সম্ভব কি না”।

আমি বললাম – “স্যার তা’ হ’লেতো দেখা যাচ্ছে যে পরবর্ত্তীকালে ‘ফের্মি প্যারাডক্স’ বলে যে তত্ত্বটি প্রতিষ্ঠা পেল তা’ ফের্মির আসল বক্তব্যের সাথে মিলছে না”।

প্রফেসর ভট্ট বললেন – “সেটাই তো তোমাকে বলতে চাইছি – কোথাও ফের্মি বলেন নি যে ভিনগ্রহীদের কোন অস্তিত্ব নেই। ফের্মির আসল বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করে তাঁর নাম দিয়ে দিব্যি একটা তত্ত্ব চালান হ’ল। বরং এটার নাম হওয়া উচিৎ ছিল ‘হার্ট-টিপলার যুক্তি’ যেখানে তারা স্পষ্টভাবে বলেছেন যে পৃথিবী ছাড়া আর কোথাও মানুষের মতন বুদ্ধিমান প্রাণী নেই। কাজেই সেখানে প্যারাডক্স কথাটা কোথা থেকে আসছে? জানি না এর পেছনে কোন রাজনীতির খেলা চলেছিল কি না।  হার্ট বা টিপলারের থেকে ফের্মির বক্তব্যের গুরুত্ব অনেক বেশী। তাই ফের্মির নামে এই তত্ত্বটি চালনোর ফলে সিনেটর প্রক্সমাইয়ার ও সিনেটর ব্রায়ানের পক্ষে সুবিধাই হয়েছিল নাসার উদ্যোগ ও অর্থানুকূল্যে SETI প্রকল্পটিকে কবরে পাঠানোর। তাই তোমাকে প্রথমেই আমি বলেছি এই যাকে ফের্মি প্যারাডক্স বলে এত হৈচৈ করা হয়ে থাকে তা’ আসলে না ফের্মির না কোনও প্যারাডক্স।

এই প্রসঙ্গে অবশ্য আরও একজনের কথা বলতে হয়। তিনি বিখ্যাত রাশিয়ান রকেট বিজ্ঞানী ও অ্যাস্ট্রোনটিক তত্ত্বের অগ্রদূত কন্সটান্টিন সিওলকোভস্কি। ১৯৩০ সালে তিনি এই ধরণের এক প্যারাডক্সের কথা বলেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন – মহাকাশ ভ্রমণ সম্ভব ও অন্যান্য তারাদের গ্রহে নিশ্চয়ই প্রাণের অস্তিত্ব আছে। তবে আপাতবিরোধ হিসাবে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে যদি অপার্থিব মেধাবী জীবন যদি সত্যিই থাকে তবে তারা এতদিনে নিশ্চয়ই পৃথিবী ভ্রমণে আসত অথবা তাদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে কোন না কোন রকম সংকেত পাঠাত। এই অসঙ্গতির সমাধান হিসাবে তিনি বলেছিলেন যে ভিনগ্রহীদের আসার সময় এখনই ফুরিয়ে যায় নি আর যদি কোন সংকেত তারা পাঠিয়েও থাকে আমাদের বর্তমান যান্ত্রিক পদ্ধতি তাকে গ্রহণ করার পক্ষে খুব দুর্বল। সিওলকোভস্কির দ্বিতীয় যুক্তিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদিও তিনি এ কথা বলেছিলেন ১৯৩০ সালে কিন্তু আমাদের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গের সিগন্যাল প্রেরণ বা গ্রহন পদ্ধতির প্রভূত উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও আজও এই ২০১৭ সালে আমরা কোন ভিনগ্রহীদের পাঠান কোন সংকেত এখনও ধরতে পারিনি। তার অবশ্যই অনেক কারণ আছে”।

আমি বললাম – “আচ্ছা স্যার মেনে নিলাম ভিনগ্রহীদের থাকা সম্ভব। কিন্তু এই আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেইতো প্রায় কমপক্ষে দশ হাজার কোটি তারা আছে। কিন্তু এর মধ্যে কোন তারার গ্রহে আমাদের মতন মানুষ আছে তা কি করেই বা  বুঝব আর কি ভাবেই বা তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারব – এ সম্বন্ধে খুব জানতে ইচ্ছে করে”।

স্যার বললেন – “বেশ তো – এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে। তবে আজ নয় – আমি কয়েকদিন একটু ব্যস্ত থাকব। আবার পুনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটা থিসিস পাঠিয়েছে। ওটাও দেখে রিপোর্ট পাঠাতে হবে। তুমি সামনের রবিবার এসো। তখন এ নিয়ে অনেক কথা বলা যাবে”।

[ক্রমশঃ]

কল্পবিশ্ব (ওয়েব ম্যাগাজিন) – দ্বিতীয় বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যায় প্রকাশিত  (ডিসেম্বর ২০১৭) 
কল্পবিশ্ব – অপার্থিব মেধার সন্ধানে – ফের্মি প্যারাডক্স