Month: June 2017

My Poems

হরে কর কম লিমেরিক

 

সনৎ কুমার ব্যানার্জ্জী

 

আমি একটা সময়ে কবিতা লিখতে শুরু করেছিলাম। বেশ দু’তিনটে লিখেও ছিলাম। সেধে সেধে লোকেদের শোনাবার জন্য কবিতা লেখা কাগজ পকেটে নিয়ে ঘুরতাম। দু’একজন বেশ উৎসাহ নিয়ে শুনে বাহবা দিয়ে আমাকে আমার পক্ষে এই ‘ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দুরত্যয়া দুর্গং পথস্তৎ’ আশু পরিত্যাগ করতে পরামর্শ দিলেন। হিতৈষীগণের কথা শুনে কবিতা লেখা ছেড়ে দিলাম। শুরু করলাম ছড়া লেখা। কিন্তু কেমন হোল তা’ জানতে হবে তো। যাদের কাছে কবিতা শোনাতে গিয়েছিলাম তাদের কাছেই আবার গেলাম। ছড়া লিখেছি শুনে তারা বললেন – “বাঃ! বেশ, কিন্তু এখন তো সময় নেই পরে শুনবো”। কিন্তু মুশকিল হোল যখনই শোনাতে যাই তখনই বলে পরে শুনব। একজনকে খানিকটা জোড় করে দুটো লাইন শোনাতেই আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল – “এত ভাল ছড়া, তুমি এ রকম পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ? যদি পকেটমার হয়ে যায়?” আমি খুব ঘাবড়ে গিয়ে বললাম – তা’ হ’লে কি করব? তিনি বললেন – “এক কাজ কর। একটা পয়সা জমানোর মাটির ভাড় কিনে তাতে একটা করে ছড়া কাগজে লিখে গুঁজে রেখে দাও”। আমি চললাম বাজারে মাটির ভাড় কিনতে।  

আমড়াতলার মোড়ে আসতেই ন্যাড়া আর ব্যাকরণ শিং খাদ্য বিশারদের সাথে দেখা। ন্যাড়াও কবিতা, ছড়া এমন কি গান টানও লেখে। ওর কয়েকটা গানের নাকি কোন এক বাঙলা ব্যান্ড কপিরাইট কিনতে চেয়েছিল অ্যালবাম বার করবে বলে। ন্যাড়া রাজি হয় নি। যাক ন্যাড়াকে যখন পাওয়া গেছে ওকেই আমার ছড়া শোনাব। ওই আমার কদর বুঝবে। ছড়া লিখছি শুনে ন্যাড়া খুব খুশী। বললে – “তা নরম না শক্ত”। আমি বললাম – ছড়া তো ছড়াই – তাঁর আবার নরম শক্ত কি? – ইংরেজিতে এর নাম ‘লিমেরিক’। লিমেরিক কথাটা শুনে ন্যাড়া প্রথমটা কি রকম ঘাবড়ে গেল। তারপর গম্ভীর ভাবে বলল – “লিমেরিকের বাঙলা কি?” আমি পড়লাম ফাঁপরে। অনেকক্ষণ মাথা চুলকালাম, কানের পিঠ চুলকালাম – শেষে রেগেমেগে বললাম – লিমেরিকের বাঙলা লিমেরিকই। সব ইংরেজী শব্দের কি বাঙলা হয়? ন্যাড়া বলল –“আলবাত হয়। তুমি গুগল ট্রান্সলেট দেখ, পেয়ে যাবে”। ব্যাকরন শিং এতক্ষন পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিল, আমাদের কথা শুনে হঠাৎ ধড়মড় করে উঠে বসে ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে বলল – “হ্যাঁ, এইতো আমেরিকাতে সেবার বঙ্গ সংস্কৃতি সন্মেলনে বাচ্চারা হ জ ব র ল নাটক করেছিল গুগলে ট্রান্সলেট করে, তখন আমার নাম হয়েছিল ‘গ্রামার হর্ন ফুড স্পেশালিষ্ট’।

আমি বললাম – তা’হলে বল ব্রকোলির বাঙলা কি? এবারে ন্যাড়া পড়ল ফাঁপরে। খানিক্ষণ ন্যাড়া মাথায় হাত বুলিয়ে আমতা আমতা করে বলল – “ও তো ফুলকপির মতন দেখতে, সবুজ রঙের – ভাল ভাল চীনে রেস্টুরেন্টে স্যালাড, পাস্তা, চাউমিনে দেয় – ওর তো বাঙলা নেই – হিন্দি, মারাঠি, তামিল মালয়ালাম সব ভাষাতেই ওকে ব্রকোলিই বলে থাকে। এবার আমি বললাম – ঠিক তাই, ইংরেজি, বাঙলা, হিন্দি, মারাঠি, তামিল, মালয়ালাম সব ভাষাতেই একে লিমেরিক বলে। বাঙলায় বড় জোড় বলতে পারো ‘মজাদার আজগুবি ছড়া’। ন্যাড়া বলল –“বেশ, কি রকম মজাদার শুনি”।

আমি বললাম – লিমেরিক ছোট কবিতা – পাঁচ লাইনের ছড়া। গভীর ভাব নেই, তত্ত্ব নেই, উপদেশ নেই, কবি-কল্পনা নেই, অলঙ্কারের ঝনৎকার নেই, অনেক আধুনিক কবিতার মতন না বোঝার কাব্যরস নেই – এমন কি তেমনভাবে দেখতে গেলে কোনও মানেও নেই। অথচ ছন্দ আছে, মিল আছে নিজস্ব বৈশিষ্ট আছে আর তাঁর সাথে আছে এক ছেলেমানুষি মজা। সাধারণতঃ লিমেরিক পাঁচ লাইনের ছড়া – মিলের বিন্যাস ক ক খ খ ক – তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন অন্য লাইনগুলোর থেকে ছোট। লিমেরিক কাকে বলে সেটা বোঝানোর জন্যই আমি আবার একটা লিমেরিক লিখেছি – শোন –

পাঁচ লাইনের ছড়া নাম লিমেরিক
এক দুই পাঁচে মিল হোতে হবে ঠিক।
তিন চার ছোট লাইন
মিল হবে লেখে আইন
মানে যদি নাও থাকে Funন্টাস্টিক।

আয়ারল্যান্ডের লিমেরিক নামের একটি শহরের নামানুসারে এর নাম। আঠার শতকে A Book of Nonsense – এর রচয়িতা এডোয়ার্ড লিয়র এই লিমেরিক জনপ্রিয় করে তোলেন। আরেকজন মজাদার লেখক ছিলেন লেহ মার্সার (Leigh Mercer) যাঁর বিশেষত্ব ছিল অঙ্ক ও ইংরেজি শব্দ নিয়ে মজার মজার খেলা ও ধাঁধা সৃষ্টিতে। তিনিও অনেক সুন্দর সুন্দর লিমেরিক লিখেছিলেন।

ন্যাড়া মুখ কাঁচুমাচু করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। বুঝলাম ব্যাপারটা ওর কাছে বেশ কঠিন লাগছে। ভাবলাম ওকে ভাল করে বুঝিয়ে দিই। বললাম – আচ্ছা ন্যাড়া একটা উদাহরণ দিই – ধর এই ব্রকোলি নিয়ে –

ব্রকোলি কিসে দেয় – স্যালাড না পাস্তা,
ব্রকোলি কখন খায় – ডিনার না নাস্তা।
ওবামা সুখে খায়
বুশ দেখে ক্ষেপে যায়,
ওভেনেতে ব্রকোলি দিলে হয় খাস্তা।

ন্যাড়া বোধ হয় ব্যাপারটা এবার বুঝল। খুশী হয়ে বলল – “বাঃ! বেশ মজা তো। তা হলে শুনি তোমার লিমেরিক। কিন্তু ঐ যে বললে ‘বুশ দেখে ক্ষেপে যায়’ – ব্যাপারটা একটু শক্ত লাগল”। আমি বললাম – ও মা তাও জান না? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ মানে বাবা বুশ ব্রকোলি দু’চক্ষে দেখতে পারতো না। তাঁর আমলে হোয়াইট হাউসে ব্রকোলি ঢোকাই নিষিদ্ধ ছিল – যাক গে শোন। এই বলে আমি সাথে সাথে পকেট থেকে ছোট খাতাটা বের করে পড়তে আরম্ভ করলাম –

ঘোর অমাতিমির শাঙন যামিনী
থমকে চমকিছে দমকে দামিনী।
মাধব তোঁহা লাগি,
নিদহীন নিশি জাগি,
চলতহি ব্রজবালা ধীরজগামিনী।

শুনতহি সুমধুর বাঁশরী ধ্বনি
ধাওল আকুলিয়া বরসানা ধনি।
কোথা তুঁহু মাধব
তোঁহা পদ সাধব,
দরশন দেহ মোহে মুরলীবাদনি।

ন্যাড়া বলল – “এটা কি? এটা তো পদাবলী”। আমি বললাম – ও চলবে না? তা’হলে এটা শোন –

দিন অবসানে বিবস্বান অস্তাচলে
যবে গেলা, ফুটিলা পঙ্কজ দলে দলে।
স্মিত আস্যে নিশানাথ,
বরষিল তারি সাথ,
স্নিগ্ধ আলোকধারা সরসী সলিলে।

নিশার স্বপন আসি আলিঙ্গিলা মোরে,
মদিরাসক্ত আঁখিদ্বয় কি নেশার ঘোরে,
ক্লান্তিতে অবশিত
তনু, হইল পতিত
শয্যাপরে, যেমতি প্রভঞ্জনে পাদপ ঝরে।

ন্যাড়া এবার রেগে উঠল – “এটা কি লিমেরিক না প্যারোডি?”

আমি বললাম – আচ্ছা – তা’ হলে এটা –

প্রভাতের শুকতারা উদিল গগনে যবে
মুখরিত ধরাতল বিহঙ্গ-কাকলি রবে,
কাননে ফুটিল ফুল
জুটিল অলির কুল,
মলয়ানিলে শিহরি ধরা, রহিল নীরবে।

এবারে ন্যাড়া ভয়ানক ক্ষেপে গেল। বলল – “লিমেরিক তো মজার আজগুবি ছড়া যাকে বলে মজারু। তোমার লিমেরিকে কোন মজাই নেই। আমি চললাম”।

আমি তাড়াতাড়ি ন্যাড়াকে ধরে বসিয়ে অনেক ভুজুং ভাজুং দিয়ে চার আনা পয়সা দেব বলে লোভ দেখালাম। ন্যাড়া চার আনা পাবে দেখে বলল – “আচ্ছা শুনি”। আমি আবার পড়তে শুরু করলাম –

আকাশেতে উড়ে চলে হাঁসেদের দল
তাই দেখে চখা বলে চল চখী চল।
ঘুরে ঘুরে দেশে দেশে –
নলবনে ফিরে এসে,
আর বারে গড়ে দেব ঝুমঝুমি মল।

ন্যাড়া শুধু মাথা নেড়ে বলল – “এতে তো রোমান্সের গন্ধ – এটাতে মজারু কোথায়?”
আমি বললাম – এটাও হোল না। আচ্ছা তবে এবার –

বেলগাছেতে বেহ্মঠাকুর নিমের দাঁতন কানে
পেঁপের ডালে কল্কে সেঁটে গয়ার তামাক টানে।
মাথায় টিকি খড়ম পায়ে –
পৈতে গলায় উদোম গায়ে,
আড়চোখেতে তাকিয়ে দেখে পেত্নিপিসীর পানে।

মনে হোল ন্যাড়ার মনে ধরেছে। বোধ হয় চাঁদনী রাতের পেত্নীপিসীর কথা মনে করে। এবার পড়লাম –

ভাদ্দ মাসে পয়লা তারিখ বিষ্টুদাদুর মাসী
উধাও যখন হোল বয়স আটের ওপর আশি।
কেষ্ট খুড়ো দেশে দেশে –
খুঁজে পেল হঠাৎ শেষে,
ফেসবুকেতে ছবি সেঁটে ঠাম্মা আছেন কাশী।

ন্যাড়া একগাল হেসে বলল – “হ্যাঁ, আজকাল তো সব আবার অনলাইনের ব্যাপার”।

আমি বললাম – ঠিক বলেছ, শোন তা হলে –

পাঠান মুলুক লালামুসায় পান্ত গোঁসাই থাকে
কানের পিঠে চুরুট গুঁজে নস্যি নিয়ে নাকে।
হিঞ্চে শাক আর পলতা পাতা –
থানকুনি আর ব্যাঙের ছাতা,
অনলাইনে ব্যাবসা করেন চালান দিয়ে ডাকে।

আর একটা শোন –

মোগলসরাই ইষ্টিশনে যেমনি গাড়ী থামে
সামলে ধুতি লম্ফ দিয়ে বঙ্কুমামা নামে।
সামনে দেখে ইডলি ধোসা –
দেখতে না পায় কলার খোসা,
এর পরেতে কি যে হোল পুছ না মৎ হামে।

এটা শুনেই ব্যাকরণ শিং হঠাৎ ব্যা ব্যা করে আকাশপানে মুখ করে ভয়ানক জোরে কেঁদে উঠল। তা সে তার কোনও বঙ্কুমামার কথা মনে করে না অনেক দিন কলার খোসা খেতে পায় নি বলে জানি না। কিন্তু সমস্ত মুডটাই আমার নষ্ট হয়ে গেল। দুত্তোর নিকুচি করেছে – আমি খাতা বন্ধ করে ন্যাড়াকে চার আনা পয়সা দিয়ে দিলাম। ন্যাড়ার চোখে দেখি জল – সেটা আবার চার আনা পাওয়ার আনন্দে না ব্যাকরন শিং এর দুঃখে বুঝতে পারলাম না। ন্যাড়া আর ব্যাকরণ শিং চলে গেল। আমিও তিনমুখো তিন রাস্তার একটা ধরে সিধে নাক বরাবর চলতে শুরু করলাম।

[সুপ্ত প্রতিভা (ফেসবুক গ্রুপ ম্যাগাজিন) – ২য় সংখ্যায় প্রকাশিত]
Advertisements