Unfinished FIR

অসমাপ্ত এজাহার – কালিহাতির কথা -১

আমিনা হত্যা মামলা

দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী

 

(১)

দেওয়ানগঞ্জ থানা থেকে মাস তিনেক পরে ইংরেজী ১৯৩৮ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি বদলিসূত্রে কালিহাতি থানায় যোগদান করলাম।  ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল মহকুমার অন্তর্গত এই থানার এলাকা আয়তনে বেশ বড়। যতদূর মনে আছে প্রায় বারোটি ইউনিয়ন বোর্ড এবং পাঁচটি পঞ্চায়েত দ্বারা শাসিত ছিল গ্রামগুলি। এলাকার শেষ উত্তরপ্রান্তে একটি নদীর ধারে (এখন আর তার নাম মনে নেই) অবস্থিত ছিল থানার অফিস ও পুলিশ কর্মচারীদের ব্যারাক ও কোয়ার্টার। জেলা বোর্ডের রাস্তা থানার লাগোয়া পূর্ব দিকে। এই রাস্তা প্রায় ষাট মাইল, ময়মনসিংহ শহর ও টাঙ্গাইল মহকুমা শহরকে যোগ করেছে। সারাদিনে গোটা দুই সার্ভিস বাস চলাচল করত। এখনকার কথা অবশ্য জানি না। এলাকার শেষ দক্ষিণপ্রান্তে চর এলাকা। তারপর যমুনা নদী। এদিকটা প্রায় পনের মাইল। পুবদিকে মাইল দশেক কাঁচা রাস্তা, একনিষ্ঠ কংগ্রেস কর্মী জনাব আব্দুল হামিদ চৌধুরীর বাড়ি পর্য্যন্ত। আর কিছদুর থেকে আরম্ভ হোল শালবন। প্রায় দশ মাইল পর্য্যন্ত কালিহাতি থানার এলাকা। মধ্যে মধ্যে ছোট ছোট গ্রাম, পঞ্চায়েতের শাসনাধীন। এই বিস্তৃত শালবন সমন্বিত যায়গাগুলিকে গড় বলা হোত। এই গড় শুনেছি প্রায় চল্লিশ মাইল বিস্তৃত। ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা ও গফরগাঁও এবং ঢাকা জেলার টঙ্গী ও কাওরাইদ থানার অধীন।    

জঙ্গলের মধ্যে কত পথই না কতদিকে গিয়েছে – তার হিসাব পাওয়া যায় স্থানীয় লোকের কাছে। তাদের সাহায্য ছাড়া চললে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছান খুবই সন্দেহের বিষয় ছিল। কোন পথ যে কোনদিকে নিয়ে যাবে তার ঠিক নেই। মধ্যে মধ্যে আছে সরকারী বন বিভাগের অফিস। এর মধ্যে কচুয়া ও আড়াইপাড়া ফরেস্ট অফিস কালিহাতি থানার এলাকাধীন। পুলিশ অফিসারদের কার্যকালে এই ফরেস্ট অফিসগুলি ছিল তাদের বিশ্রামের স্থান। এই জঙ্গলের বেশীর ভাগ অধিবাসী হোল মুসলমান। এরা জঙ্গলের ইজারাদার, বিত্তশালী। নানা শ্রেণীর হিন্দুও ছিল। তারা করত দিন মজুরের কাজ। চোর ডাকাতের উপদ্রবতো ছিলই, তা ছাড়া ছিল বনের নিজস্ব সম্পদ ছোটখাটো হিংস্র জন্তু যথা বিষধর সাপ, অজগর, শূয়োর, নেকড়ে প্রভৃতি। এইসব অধিবাসী নিয়ে জঙ্গল দিনের বেলায়ও ছিল বিভীষিকাময়। বন্দুকধারী ফরেষ্টগার্ড ও পুলিশের পক্ষে রাত্রে ঘোরাফেরা করা ছিল খুবই বিপজ্জনক। থানা অফিস থেকে জঙ্গল এলাকার দূরত্ব হেতু জঙ্গলের প্রায় শেষ প্রান্ত আড়াইপাড়া নামক স্থানে একটি পুলিশ ক্যাম্প ছিল। এখানে বন্দুকধারী কয়েকজন সেপাই থাকত।

চর এলাকাকে বলা হোত “ভড়”। এখানকার অধিবাসীও বেশীরভাগ মুসলমান। চরের জমি ছিল উর্ব্বরা। চাষ করে পেত প্রচুর ফসল ধান, পাট ইত্যাদি। বিক্রিলব্ধ টাকা হাতে পেলেই এদের রক্তে জাগত লড়াইয়ের উন্মাদনা। দাঙ্গাহাঙ্গামা লেগে যেত সামান্য ব্যাপার নিয়ে। দিন দুই আগে থেকেই লেগে যেত তোড়জোড়। নাকাড়া-টিকাড়া বাজিয়ে নৃত্য করত লাঠিসোটা নিয়ে। তারপর আরম্ভ হোত দুই দলে লড়াই বা কাজিয়া। দুই চারিটি লাশ পড়লে বা কিছু জখম হোলে হোত শান্ত কিন্তু সন্ধি হোত না। কারণ এর পর চলত থানা- পুলিশ, কোর্ট-কাছাড়ি। হাতের টাকা নিঃশেষ করে রেহাই ছিল না। উপরি পাওনা ছিল কারাবাস বা ফাঁসি। এভাবে কত পরিবার যে উৎসন্ন হয়ে যেত তার ঠিক নেই। এতেই যে শেষ হোত তা নয়। কয়েক বৎসর পরই জেগে উঠত নতুন দল। আবার তার পুনরাবৃত্তি। এই হোল একদিক। অন্য দিকে ছিল ডাকাতি, রাহাজানি, পরস্ত্রীহরণ। যুবতী স্ত্রী খুন কোরে ফাঁসের রজ্জুতে ঝুলিয়ে রেখে মিথ্যা ফাঁসির অভিযোগ ইত্যাদি কম ছিল না। এই “গড়” ও “ভড়” নিয়ে কালিহাতি হল এখন আমার কর্মস্থল।

আমি যে সময়কার কথা বলছি তখন টাঙ্গাইল মহকুমায় খুব ম্যালেরিয়ার প্রাদূর্ভাব। এর প্রকোপ থেকে কালিহাতি এলাকার গ্রামগুলিও অব্যাহতি পায়নি। আসার কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। প্রতি মাসের অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে আমাকে আলিঙ্গন করে আমার দেহের হাড় পর্য্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়ে যেতেন। চুপ করে সহ্য করে কাজ করে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। মেডিকেল লিভে যাওয়া যেত কিন্তু বিশেষ কোন কারণে তাহা যুক্তিযুক্ত মনে করি নি। তাই কুইনাইনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে দেহের ক্ষীণতার রোধ করতে লাগলাম। কাজের চাপও খুব বেশী ছিল। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী মোবারক আলী মিঞা ছিলেন খুব কৌতুকপ্রিয়। এলাকা খুব বড় বলে একজন সহকর্মীর সঙ্গে আর একজনের দেখা খুব কম দিনই হোত। কিন্তু যখনই উনি থানায় উপস্থিত থাকতেন, কাজের ফাঁকে ফাঁকে কৌতুকপ্রদ গল্প করে আমাদের মাতিয়ে রাখতেন। আমাকে বলতেন ‘ছোট মিঞা’। আমরাও তাকে বলতাম ‘বড় সাহেব’। আমাকে খুব ভালবাসতেন। সহকর্মীদের উপর তার হুকুম ছিল আমাকে যেন তদন্তের জন্য কোন খারাপ স্থানে পাঠানো না হয়। অধিকন্তু আমি বয়সে ছোট ছিলাম। সহকর্মীদের অনেক রকম কাজ আমি পছন্দ করতাম না বরঞ্চ সমালোচনা করতাম। তাই যে যার কাজ নিয়ে বা কাজের অজুহাতে সকালের দিকেই কেটে পড়ত – ডায়রিতে লিখে নিয়ে। আমি অধিকাংশ সময়ই থানাট থাকতাম। বেশীর ভাগ ইউনিয়নে এমন কতকগুলি গ্রাম ছিল যেখনে শিক্ষিত লোকের বাস ছিল। থানার বাইরে কোন কাজে গেলে এদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আসতাম। বড় সাহেবও এ কথা জানতেন। এবং তাহাতে কোনরূপ সাম্প্রদায়িকতার বা রাজনীতির গন্ধ না থাকায় আমার উপর তার আচরণ খুব প্রীতিপূর্ণ হয়েছিল। এখানকার কার্যকালে বেশ কয়েকটি সমস্যাপূর্ণ তদন্তের ভার আমার উপর পড়ে। তার মধ্যে যে কয়েকটি ভাল মনে আছে তাহাই লিখলাম।

(২)

বর্তমান কালিহাতি থানা  (ছবি – ইন্টারনেট)

অন্ধকার রাত। আপনি হয়তো বাইরের ঘরে বসে পড়াশুনা করছেন। হঠাৎ বাইরে কাশির শব্দ শুনলেন। ভয়ের কি আছে? মনে করবেন কোন বন্ধু দেখা করতে আসছে। কিন্তু এই কাশির শব্দ যে কতদূর ত্রাসের সৃষ্টি করে তা’ থানায় থেকে উপলব্ধি করতাম। দিনের বেলায় থানার ঘরে বসে কাজ করতে করতে যখনই দেখতাম নীল পোষাকধারী ভগ্নদূত (চৌকিদার) একজন লোক সাথে বা একাই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে তখনই দেহের মধ্যে ম্যালেরিয়ার ঘুমন্ত বীজাণুগুলি নড়ে চড়ে উঠত। চৌকিদার দেখে এত ভয় পুলিশে আসার আগেতো কোনদিন হয় নি। কই আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল সুধন্য চৌকিদারের বাড়ি। আমরা তাকে কতরকম হুকুম করতাম। সেও আমাদের বাবুদের ছেলে বলে মান্য করত। কিন্তু থানায় থাকতে এরূপ মনে হোত কেন? কারণ এরা এমন সব জটিল বিষয় নিয়ে থানায় আসত যার গ্রন্থি উন্মোচন করতে গলদঘর্ম হয়ে যেতে হোত। নাওয়া খাওয়ার সময় দিত না। এখনই ছোট। একটা কিছু হয়তো করব ঠিক করেছি, সব ভেস্তে গেল।

শীতের রাত তায় আবার কৃষ্ণ পক্ষ। ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে। থানায় বসে হ্যারিকেনের সামনে ডায়েরি লিখছি। সহকর্মী দুজনেই বাইরে। বড় সাহেব বাসায় অসুস্থ। হৃদয় স্পন্দনকারী কাশির আওয়াজ বাইরে। আমি বলে উঠলাম -“কে? ভেতরে এসো”। দেখি নীল পোষাকধারী ভগ্নদূত। সঙ্গে আছে একজন লোক। ভাল করে দাঁড়াতে পারছে না – নড়বড় করছে। পরনে খাটো লুঙ্গি। আবছা আলোতে চেহারার বিশেষ নজরে আসছে না। শুধু বাবু বাবু করছে।

আমি ধমকে উঠলাম – “কি কেবল বাবু বাবু করছ। কি হয়েছে বল”।

সে বিকৃত স্বরে বলল – “বাবু আমার ইস্ত্রী ফাঁসে লটকে মরছে।”

“বয়স কত?”

“কুড়ি কিংবা তিরিশ অইব।”

“দেখতে কেমন?”

“গাঁয়ের লোকে তো হোন্দরই কইত।”

“ফাঁসি দিল কেন?”

“ক্যান্ যে ফাঁসে মইল বাবু তা কমু ক্যামনে।”

এই বলে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। নাম বলল হোসেন মিঞা, থাকে বুড়ীর চালা গাঁয়ে। থানা থেকে তের-চোদ্দ মাইল পূবে গড়ের মধ্যে। কচুয়া ফরেস্ট অফিস থেকে আরও মাইল দু’এক হাঁটা পথ। হোসেনের নিজস্ব কোন জমিজিরাৎ নেই। চাষের সময় জন খাটে আর খাল বিলে মাছ ধরে কোনমতে জীবিকা নির্বাহ করে। বছর পাঁচেক হোল শাদি করেছে। কোন ছেলেপুলে হয় নি। বলল –

“বাবু, বউ দ্যাখতে ভাল অইলে কি অইব, ঘরে মন ছিল না। আমি বাড়ি না থাকলেই এহানে ওহানে টল দিত। এই নিয়া কোন্দল যে না অইত তা নয়।”

“তুই কখন বউকে ফাঁস দেওয়া অবস্থায় দেখলি?”

“আজই বিহানে।”

“তুই কাল রাত্রে কোথায় ছিলি?”

“মাছ ধরতে হাঝ রাইতে ভাত খাইয়া ঘর থেকা বাইর অইয়া গেলাম। রাইত আর ঘরে আহি নাই। বেইনের সময় ঘরে আইয়া দেহি, আমিনা ঘরে নাই। সন্দে অইল হয়তো মাঠে গেছে। বেলা অইল তবু আইল না দেইখা অনেক তালাশ কইলাম। গাঁয়ের লোকদের জানালাম। বাড়ির দক্ষিণ দিকে জঙ্গলে একটা গাছের ডালে দেখি লটকিছে।”  

“সবার আগে কে দেখেছে?”

“অই ছাওয়ালপান, নাম কইতে পারমু না।”

হোসেনের জবাবে আমি মোটেই খুশী হতে পারলাম না। কি এমন হতে পারে যার জন্য একটি যুবতী স্ত্রীলোক এরূপ ভাবে আত্মহত্যা করতে পারে? শুধু ছেলেপুলে হয় না বলে কি? বড় সাহেবের কাছে শুনেছি যুবতী স্ত্রী খুন করে আত্মহত্যার রূপ দেওয়া এ থানার অনেক বিশেষত্বের একটি। এরূপ সংবাদ থানায় রিপোর্ট হলে খুব সতর্কতার সাথে সংবাদ লিখতে এবং তদন্ত করতে বলেছেন।

একটি বিষয় আমি বেশ লক্ষ্য করে আসছি। এরূপ জটিল ব্যাপারে গ্রামের চৌকিদার কোন সাহায্যেই আসে না। সে তখন হয়ে যায় নীরব দর্শক। এ কথা কি বিশ্বাসযোগ্য যে একই গ্রামে বাস করে এরা প্রকৃত ঘটনা সম্বন্ধে কোন সংবাদ রাখে না? রাখে তবে গ্রামের মোড়লদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন কিছু বলতে সাহস করে না। অনেক সময়ে এরূপ দেখা গেছে যে গ্রামের লোক বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে কোন সাজানো সংবাদ দিতে থানায় এলাকার চৌকিদারকে সঙ্গে নিয়ে। সংবাদ ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করতে যেয়ে ঘটনার সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহ হোল এবং সংবাদদাতাকে নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেও যখন প্রকৃত ঘটনা জানতে পারা যাচ্ছে না তখন সংবাদদাতাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে চৌকিদারকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জেরা করলে আনেক সময়ে সত্য সংবাদ বের হয়ে আসে। এ ক্ষেত্রে কিন্তু শত চেষ্টা করেও চৌকিদার বা হোসেনের কাছ থেকে আমিনার আত্মহত্যা ছাড়া অন্য কিছু বের করতে পারলাম না। তাই হোসেনের কথামত আমিনা ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে এই কথাই লিখে নিলাম।

ঘটনাস্থল সঙ্গে সঙ্গেই রওনা হওয়া নিয়ম বলে আমি কাগজপত্র গুছিয়ে রওনা হওয়ার জন্য তৈরি হলাম। ব্যারাকে দেখি মাত্র দুইজন কনস্টেবল আছে। একজন হিন্দু, অল্পদিনের চাকুরী, বিশেষ চালাক চতুর নয়। অন্যজন প্রবীণ ও বিচক্ষণ বলে সুনাম আছে। নাম নৈমদ্দিন সেখ। এর বাবা সিপাই-এ র কাজ করে অবসর নিয়েছে। আর ছেলেও নাকি কোন এক থানায় কনস্টেবল। আমার সঙ্গে যাওয়ার কথা বলায় সে এক কথায় রাজি হয়ে গেল। তিন পুরুষেই পুলিসের রক্ত আছে এইটাই তার খুব গর্ব্ব ছিল। লাশ পাহাড়ার কি বন্দোবস্ত করে এসেছে – এই কথাই সে চৌকিদারকে প্রথম প্রশ্ন করল। সত্যিইতো এই দরকারি কথাটা আমার এতক্ষন মনে একবারও আসে নি। এখন রাত্রি তাতে আবার ভীষন অন্ধকার। লাশতো বন্য জন্তুতে আংশিক খেয়ে ফেলতে পারে। তাহলে প্রকৃত তদন্ত যে বিঘ্নিত হবে। ফাঁসের মড়ার ধারে কাছে ভয়ে কোন লোক যাবে না ঠিক কিন্তু বন্য জন্তুরতো ভোগ্য বস্তু।

চৌকিদার উত্তর দিল – “গ্রামের লোক দফাদারকে খবর দিতে গেছে।” উত্তর শুনে সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। বড়ই দুশ্চিন্তা নিয়ে রওনা হলাম। কিছুটা যেয়ে বড় রাস্তা ছেড়ে ধরলাম মেঠো পথ, ক্ষেতের আল। চৌকিদারের হাতে হ্যারিকেন, টিম টিমে আলো। হোঁচট খেতে খেতে কোন মতে চলছি বুড়ো নৈমদ্দিনের হাত ধরে ধরে। কিছুক্ষণ পর টিম টিমে আলোটুকুও আর দেখা যাচ্ছে না। লাল গোলার মত কি একটা আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলেছে। অর্থাৎ লাল কেরোসিনের প্রভাবে হ্যারিকেনের চিমনি কাল হয়ে যাওয়ায় এই লালের আবির্ভাব। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। আমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এই চারটি জীব যেন পাতালের গহ্বরে নেমে চলেছি। হঠাৎ চৌকিদার হাঁক দিয়ে থেমে গেল। আমি মনে করলাম হয়তো সাপ, বলে উঠলাম – “সাবধান”। এগিয়ে দেখি বেশ কিছুটা যায়গা জুড়ে জল রয়েছে। কিন্তু কোথায় কতটা জল রাতের অন্ধকারে তা’ত বোঝা যাচ্ছে না। চৌকিদার হয়তো পথ ভুল করেছে। সে আমাদেরকে দাঁড়াতে বলে জলে নেমে গেল। তারপর হাতের বর্শা দিয়ে জল মেপে ফিরে এসে যে দিকে জল কম সে দিক দিয়ে যায়গাটা পার করে দিল। কিছুটা গিয়েই আরম্ভ হোল গড়ের জঙ্গল। রাত্রিও অনেক হয়েছে। আর এগোন ঠিক হবে না বলে কাছেই এক গ্রামে কোন প্রধানের বাড়ি আশ্রয় নিলাম। এ যায়গা থানা থেকে মাইল দশেক হবে।

পরদিন খুব ভোরে রওনা হয়ে আটটার মধ্যে ঘটনাস্থল পৌঁছে গেলাম। গ্রামে প্রায় লোক নেই বললেই চলে। দেখলাম মৃতদেহের অনতিদূরে দফাদার একজন চৌকিদার সহ হাজীর আছে। হঠাৎ দেখি সিপাই নৈমদ্দিন অদৃশ্য। কোথায় যেতে পারে ভাবছি। কারণ লোককে ডাকতে হবে, তারপর তাদের সামনে লাশের ‘সুরতহাল’ রিপোর্ট তৈরি করতে হবে। কিছুক্ষণ পর দেখি নৈমদ্দিন সাত-আটজন লোক ধরে নিয়ে এসেছে। তারপর আমরা সকলে লাশের কাছে এলাম – দেখি একটি গাছের ডালে ঝুলছে। আমিনার বয়স তেইশ চব্বিশ বছর হবে অনুমান করলাম। পরনে একটি ডুরে শাড়ি। দেহে অন্য আর কোন আবরণ নেই, রঙ শ্যাম বর্ণ। ফুলে গেছে বলে স্বাস্থ্য কিরূপ ছিল বোঝা যাচ্ছে না, তবে ভাল ছিল বলে মনে হোল। মাথায় একরাশ চুল এলোমেলো, তেল পড়ে নি কয়েকদিন। হাতে সবুজ রঙের কাঁচের চুড়ি – এক হাতে চারটে আর এক হাতে তিনটে। ঠোঁট লাল কিন্তু কালচে ধরেছে – পান খাওয়া রঙ। পাটের তৈরি ছাগলের দড়ির মত মোটা দড়ি গলায় গেড়ো দিয়ে ডালের সঙ্গে বাঁধা। গলা ফুলে যাওয়ায়, দড়ি বেশ খানিকটা মাংসের ভেতর ঢুকে গেছে। দড়ির গেড়ো বা দিকে, দেহের ভারে টান হয়ে আছে। ফলে মাথা ডান দিকে ঝুঁকে পড়েছে। চোখ ঠিকরে বের হয়ে আসছে। মুখ দিয়ে সামান্য লালা নির্গত। হাত দুটি আধা মুঠো করা – দুটো পায়ের পাতার গতি মাটির দিকে – মাটি থেকে হাতখানেক উঁচুতে। আশে পাশে এমন কোন উঁচু জিনিষ দেখলাম না যার ওপর উঠে ফাঁস লাগিয়ে ডালে দড়ি বেঁধে দিয়ে তার পর উঁচু জিনিষটা পা দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ঝুলে পড়তে পারে।

ডাক্তারী বিধি শাস্ত্রে প্রকৃত ফাঁস দিয়ে মরেছে কি না বুঝতে হলে, যে সমস্ত লক্ষণ দেহে প্রকাশ পায়, তাহা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে মিলিয়ে দেখতে লাগলাম। কিছু কিছু মিলও দেখা গেল। কিন্তু সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ হতে পারছি কই? গাছের ডালে এরূপ শক্ত করে বাঁধতে হলে হয় কোন উঁচু জিনিষে দাঁড়াতে হবে নয় গাছের ডালে বসে বেঁধে নিয়ে ঝুলে পড়তে হবে। গাছের গুঁড়িতো সোজা সরল, একটা মেয়ের পক্ষে ওঠাতো সহজ নয়। পায়ের মাটির দাগ তো গুঁড়িতে থাকা স্বাভাবিক। কেমনতর হোল? আত্মহত্যা না অন্য কিছু! কিছুইতো ঠিক করতে পারছি না। বিভিন্ন রকমের আত্মহত্যায় যে সমস্ত লক্ষণাদি মৃত দেহে দেখা যাবে বলে মেডিক্যাল জুরিপ্রুডেন্স থেকে শেখা হয়েছিল তা’ত কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারছি না। এরূপ ধরণের তদন্ত আমার কর্মজীবনে এই প্রথম। আমার নিজের যোগ্যতার ওপর আমি বিশ্বাস হারাতে বসলাম। ডাক দিলাম – “নৈমদ্দিন”। কোথায় সে? আবার অনুপস্থিত। কতক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম জানি না। হঠাৎ নৈমদ্দিন ফিরে এল। আমাকে একটু দূরে ডেকে নিয়ে বলল – “ছোট বাবু, কি তা দেখলেন”?

আমি বললাম – “নৈমদ্দিন, প্রকৃত ফাঁস হয়তো মনে হচ্ছে। কিন্তু যুবতী স্ত্রীলোক, গাছে উঠল কি করে?”

নৈমদ্দিন আমার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বলে উঠল – “খুন! আওহান।”

আমি তার সঙ্গে মৃতদেহের কাছে আবার এলাম। তারপর দুজনেই অনেক্ষন ধরে তন্ন তন্ন করে দেখতে লাগলাম। অবস্থা জটিল – এতবড় একটা সমস্যার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। থানা থেকে প্রায় পনেরো মাইল জঙ্গলে – যেখানে সভ্যতার আলোক ছিটেফোঁটাও প্রবেশ করে নি, যেখানে লেখাপড়া জানা লোক নেই, তখনও পঞ্চায়েতি শাসন – সেখানে উদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রধানদের সঙ্গে মিলজুল করে নিলেইতো কাজ কত সহজ হয়ে যায়। ডাক্তারী ছাড়ুনতো। ঐতো গ্রামের লোক দাঁড়িয়ে আছে কফিনের কাপড় নিয়ে। মৃতদেহ কবরের হুকুম দিয়ে আপনি থানায় চলে আসুন। গ্রামের লোক এবং মৃতার আত্মীয়স্বজন “যা হবার হয়ে গেছে” – বলে আপনার কাজের অনুমোদন করলে আর চিন্তা কি? কিন্তু সত্যি যদি আত্মহত্যা না হয়, যদি তাকে খুন করে ঝুলিয়ে রাখা হয়ে থাকে? তাহলে আপনিও তার সাহায্যকারী খুনী। খুনের প্রমাণ সকল ইচ্ছাকৃতভাবে বা অজ্ঞতার জন্য চিরতরে লুপ্ত করে দেওয়ায় আপনি শুধু আপনার কর্ত্তব্য কার্য থেকে স্খলিত হন নি আপনার ঐ অবিমৃষ্যকারীতার জন্য আপনি দেশবাসীর কাছে, সমাজের কাছে, আইনের কাছে মৃত আত্মার কাছে চিরদিনের জন্য দায়ী থেকে গেলেন। এরূপ কতই তো দেখেছি। স্ত্রীঘটিত ব্যাপারে লিপ্ত সন্দেহে আপন ভাইকে বিষ খাইয়ে হত্যা করে অর্থের জোরে আত্মহত্যার রূপ দিয়ে রেহাই পেয়ে গেল। সামান্য দূর থেকে পিস্তলের গুলিতে ছোটভাই বড়ভাইকে গুলি করে বসল – বড়ভাইকে কোন ঘৃণিত কার্যে লিপ্ত দেখে। তারপর অর্থ ও মিথ্যা সাক্ষ্য প্রমাণাদির জোরে প্রকাশ্য দিবালোকে সেই হত্যা হয়ে গেল আত্মহত্যা। এই তো সেদিনের কথা।

যা হোক অস্থিরভাবে ঘটনার স্থান পরিদর্শন করছি। হঠাৎ নৈমদ্দিন একখানা ভাঙা কাঁচের চুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আমাকে দেখাল। তাইত – মৃতার একহাতে একটা চুড়ি কম ছিল। এইতো সেই চুড়ি। মেঘ সরে যেতে থাকলে যেমন আসতে আসতে আলো দেখা যেতে থাকে তেমনই যেন আমি কিছু কিছু আলো দেখতে পেলাম। নজরে এল কতকগুলি আগাছা পদদলিত অবস্থায়। তা’হলেতো কয়েকজন লোক গাছের নীচে একত্র হয়েছিল। সমস্ত লিখে নিয়ে মৃতদেহ নামাতে হুকুম দিলাম। দেহের প্রকাশ্য স্থানে কোন দাগ জখম দেখছিনা। নৈমদ্দিন হঠাৎ বলে উঠল – “ছোটবাবু! আঙ্গলে চুনা রইছে দেখছুন।” আমি দেখলাম সত্যিতো ডান হাতের তর্জ্জনীর মাথায় কতকটা চুন শুকিয়ে রয়েছে – এতটুকুও খসে পরে নি। ফাঁসের দড়ির গেড়ো নিজে দিলে এই আঙ্গুলেতো চুন এ অবস্থায় থাকার কথা নয়। দেহ অনাবৃত করে দেখার প্রয়োজন হোল। যথাসম্ভব শালীনতা বজায় রেখে পরীক্ষা করে দেখা গেল মৃতার তলপেটের একটা যায়গা লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। সঙ্গে সঙ্গে সব কিছু পরিষ্কার হয়ে গেল। আড়াইপাড়া ক্যাম্প থেকে বন্দুকধারী দুজন সেপাই ডেকে পাঠালাম। কারণ এখনকার কাজ হবে এই অসভ্য লোকেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। বন্দুকধারী কনস্টেবলরা এসে গেলে কাগজপত্র তৈরি করে মৃতদেহ ময়নাতদন্তে টাঙ্গাইল মহকুমা হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলাম।

হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা চলল অনেকক্ষণ। শেষে সব স্বীকার করল। আমিনার চরিত্রদোষ ছিল। শাদীর আগে থেকেই বাপের বাড়ির গাঁয়ের (মাইনকার চালায়) রহমানের সঙ্গে ভাব ছিল। এমনকি শাদীর কথাবার্তাও চলছিল। কিন্তু রহমানের অর্থাভাব থাকায় শাদী হয় নি। ভাগ্যান্বেষণে রহমান কলকাতায় চলে আসে। ইতিমধ্যে হোসেনের সঙ্গে আমিনার শাদী হয়ে গেল। রহমান কলকাতায় বাবুর্চির কজ করে বেশ কিছু টাকা জমিয়ে কয়েক মাস আগে দেশে ফিরে শুনল বুড়ির চালা গাঁয়ের হোসেনের সঙ্গে আমিনার শাদী হয়ে গেছে। তা মনে খুবই গোসা হোল। আমিনার বাবা কাশেম কি এই কয়টি বছর সবুর করতে পারত না? রহমান কিন্তু আমিনাকে ভুলতে পারল না। নানা ছুতানাতা দেখিয়ে বুড়ির চালা গাঁয়ে ঘুর ঘুর করত। ইয়ার বন্ধুদের সাথে দেখা হলে মিথ্যা করে বলত – “এই কামারের কাছ দা দিইছি পানি দিতে, দেখতে আইলাম অইল কিনা।” হোসেনের কানেও কথাটা পৌঁছেছে। তাই আমিনার সাথে খিটিমিটি লেগেই থাকত।

ঘটনার রাত্রে হোসেন মাছ ধরতে বের হয়ে যায়। এই সুযোগে রহমান আমিনার ঘরে ঢোকে ও গালগল্প পান খাওয়া চলে। কিন্তু আমিনার অদৃষ্ট মন্দ। মাছ লাগল না বলে হোসেন বাড়ি চলে আসে। তারপর দুজনকে এই অবস্থায় দেখে হোসেনের মেজাজ চড়ে যায়। হাতের কাছে কিছু না থাকায় রহমান বেঁচে গেল পালিয়ে। কিন্তু আমিনা হতবাক। এরূপ যে হবে বুঝতে পারে নি। যেমন বসে ছিল, বসেই রইল। হোসেন আমিনাকে জোরে এক লাথি মারল – লাগল তলপেটে। আমিনা চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। হোসেন ভাবল আমিনা মরে গেছে। চিৎকার শুনে প্রতিবেশী তিন চার জন লোকও দৌড়ে এল। অনেকক্ষণ জ্ঞান হোল না দেখে এরাও মনে করল আমিনা মরে গেছে। তাই সকলে পরামর্শ করে আমিনাকে সেই অবস্থায় ফাঁসে ঝুলিয়ে দিল। রশির চাপে কণ্ঠনালী বদ্ধ হওয়ার সময় হয়ত আমিনার জ্ঞান সাময়িক ফিরে এসেছিল, বাঁচার জন্য পা দিয়ে মাটি ধরতে চেষ্টা করছিল হয়তো। তাই আমিনার দেহে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার লক্ষণ সমূহ কিছু কিছু দেখা গিয়েছিল।

হোসেনের স্বীকারোক্তি লিখে নিয়ে, পরোক্ষ, অপরোক্ষ এবং অবস্থাঘটিত প্রমাণাদি সংগ্রহ করে হোসেন মিঞা এবং অন্যান্য যারা আমিনার দেহ ঝুলিয়ে দিয়ে তার মৃত্যুকে তরান্বিত করেছিল, সকলকে গ্রেপ্তার করে থানায় ফিরে এলাম। এরপর থানার বড় সাহেব বাকি তদন্ত সম্পূর্ণ করে হোসেন মিঞা সহ তিন চার জন লোককে বিভিন্ন ধারায় কোর্টে  অভিযুক্ত করলেন। শুনেছি এদের বিচারে কয়েক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছিল।       

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s