Month: March 2017

My Proses

(অ) ধরা মাধুরী

তাদোবা জাতীয় উদ্যান – চন্দ্রপুর, মহারাষ্ট্র, ২৬শে মার্চ, ২০১৬, সকাল বেলা।

এটা তৃতীয় সাফারি – আমরা এসেছি মূল জঙ্গলের বাইরে – বাফার জোনে। গত দুদিনে সকালে আর বিকেলে দুটো সাফারি  করা হ’ল। ভারতীয় গৌড় (ভারতীয় বাইসন বা বুনো মোষ), ঢোল (বুনো কুকুর), চিতল, সম্বর, বুনো শুঁয়োর, হনুমান সব দেখা হয়েছে – ছবি নিয়েছি। পাখীও যা দেখা হোল কাক-শালিক-বুলবুলি বাদে – সবই আমার চেনা জানা – গাছে পাপিয়া (Common Hawk Cuckoo), দোয়েল (Oriental Magpie Robin), বাঁশপাতি (Green Bee-eater), নীলকন্ঠ (Indian Roller), ফিঙে (Black Drongo), বড় মাছমোরাল (Grey-headed Fish Eagle), জলার ধারে – পানকৌড়ি (Cormorant), কোঁচ বক (Indian Pond Heron), সোনাজঙ্ঘা (Painted Stork), কাল কাস্তেবক (Black Ibis), শামুখখোল (Open-billed Stork), মাটিতে চুনো বটের (Jungle Bush Quail)। এর মধ্যে কাল কাস্তেবকটা  আগে চাক্ষুষ দেখি নি।

ও হ্যাঁ – আসল কথাই তো বলি নি – বাঘ দেখেছি। বাঘ থাকার সম্ভাব্য স্পটগুলোতে ঢুঁ মারা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে না। জঙ্গলে বাঘ দেখতে পাওয়া নাকি ভাগ্যের ব্যাপার। হঠাৎ আমাদের গাইড সঞ্জয় মুন্ডে মোবাইলে সতীর্থদের কাছে খবর নিয়ে জীপের সারথিকে মারাঠীতে কি সব বলল। সারথি ভাই জীপ ঘুরিয়ে সাঁই সাঁই করে চলল কত নম্বর জানি এক ট্যাঙ্কের কাছে। গিয়ে দেখি বেশ পাঁচ ছ’টা জীপ এরই মধ্যে জলার ধার জুড়ে মালার মতন দাঁড়িয়ে আছে আর আরোহীদল হৈ হৈ করে আঙ্গুল তুলে এ ওকে দূরে কি দেখাচ্ছে। আমাদের জীপটা একটু পেছনে। সঞ্জয় দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক একটু তাকিয়ে বলল জলার দূরে ঐ পারে একটা গাছের গুঁড়ি মাটিতে – তার পাশে শুয়ে আছে। আমরা দু’জনে সঞ্জয়ের নেতাজীর মতন আঙ্গুল দেখানোর দিকে বরাবর দেখার চেষ্টা করে যাচ্ছি – চোখের ওপর হাত দিয়ে ঢেকে, ১০x৫০ বাইনাকুলার দিয়ে স্ক্যান করে, জুম ক্যামেরা প্যান করে – কাকস্য পরিবেদনা। বাঘ বাদে সবই দেখতে পাচ্ছি। সামনের জীপগুলোর ছেলেমেয়ে, পুরুষমহিলা, মায় আমাদের মতন বুড়োবুড়িরাও বাঘ দেখে ফেলল। তাও আবার একটা না দু-দুটো। একটা জীপে আবার মাথায় টুপি জঙলা প্রিন্টের টিশার্ট পরা দুই ফটোগ্রাফার তেপায়া স্ট্যান্ডে ফুট খানেক লম্বা লেন্সওয়ালা ক্যামেরা তাক করে ছবি তুলছে।   

এর মধ্যে একটা জীপ বেরিয়ে চলে যাওয়াতে জলার সামনেটা ফাঁকা হোল আর আমাদের ড্রাইভার সাঁই করে গাড়িটা ঘুরিয়ে ফাঁকা যায়গাটায় সেট হয়ে গেল। এমন সময়ে সবার হৈ হৈ আর সঞ্জয়ের কথাতে বুঝলাম একটা নাকি উঠে দাঁড়িয়েছে। এবার খানিক কসরত করতেই দাঁড়ানো বাঘটা নজরে এল। গিন্নি তাড়াতাড়ি বাইনাকুলারটা আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে দেখতে আরম্ভ করল। আমি এবার ক্যামেরা নিয়ে ছবি তোলা শুরু করলাম। প্রায় অনেকটা জুমে গিয়ে ছবি নিতে হ’ল। ইতি মধ্যে গাছের গুঁড়ি জাপটে শোয়া বাঘটাকেও দেখতে পেলাম। এটা বড় বাঘ – দাঁড়ানোটা ছানা। কানে এল গিন্নির উল্লাস – ‘পেয়েছি, পেয়েছি দুটোই পেয়েছি’। যাক জঙ্গলে বাঘ তা হ’লে দেখা হ’ল।

প্রায় এক ঘন্টাতো এখানেই কাটল। এবার ফিরতে হবে অনেকটা পথ। অন্য জীপগুলো সব এগিয়ে গেছে। সঞ্জয় আমাদের একটু অন্য একটা ঘুরপথ দিয়ে নিয়ে চলল। ফাঁকা জঙ্গলের মাটির রাস্তা। লম্বা ঘন গাছের সারির মাথায় সূর্য ঢলতে আরম্ভ করেছে। আলোও কমে এসেছে। চারিদিকে বেশ একটা ছমছমে পরিবেশ। এ পাশে ও পাশে মাঝেসাঝেই চিতল, সম্বর দু’একটা দেখা যাচ্ছে। ধুস কে ও সব দেখে। বিশাল এক জলার পাশ দিয়ে চলেছি। দু’জনেরই মন বেশ খুশি খুশি। সঞ্জয়ও খুশি – তার মক্কেলদের বাঘ দেখাতে পেরেছে। হঠাৎ ওর নির্দেশে ড্রাইভার জীপটাকে রাস্তার ধার ঘেঁষে দাঁড় করাল। জলার ও পারে বাঘ এসেছে জল খেতে। একেই বলে মেঘ না চাইতে জল। এবার একবারেই দেখতে পেলাম। বাঘ বাহাদুর জলটল খেয়ে জলার ধারে বিশ্রাম করতে বসল। ধীরে সুস্থে কয়েকটা ছবি নিলাম। তবে অনেকটা জুম আর কম আলো – মনপসন্দ ছবি হোল না। যাক গে আমাদের পক্ষে এই ক্যামেরায় (Nicon Coolpix P610) এই যথেষ্ট। পরদিনও সকালের সাফারিতে বাঘের দর্শন  মিলল ঐ প্রথম যেখানে দেখেছিলাম – সেই জলার ওপারে গাছের গুঁড়ির পাশে। বাঘ দেখাটা এখন জলভাত হয়ে গেছে। কিছুক্ষন দেখে অন্য রুটে চলে গেলাম।   

আজকের এই বাফার জোনটা মূল জঙ্গল এলাকার বাইরে। ১৯৫৫ সালে ১১৬.৫৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে তাদোবা জাতীয় উদ্যানের প্রতিষ্ঠা। ১৯৮৬ সালে এর সাথে আরও ৫০৮.৮৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে Tadoba-Andhari Wild Life Sanctuari  গড়ে তোলা হয়। ১৯৯৫তে এর মধ্য থেকে ৬২৫.৪০ বর্গ কিলোমিটার Tadoba-Andhari Tiger Project এর জন্য সংরক্ষিত হয়। এই এলাকার চতুর্দিকে প্রায় ১১৫০ বর্গ কিলোমিটার যায়গা বাফার জোন হিসাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। যা হোক আমরা জুনোনা বাফার জোনে সাফারির জন্য নির্দিষ্ট এলাকায় জীপ নিয়ে প্রবেশ করলাম। আজকে আর সঞ্জয় থাকছে না। ওর এলাকা মূল জঙ্গলে। অবশ্য প্রয়োজনীয় সমস্ত রকম ব্যবস্থা ওই করে দিল। ওরই চেনা বিশ্বস্ত ড্রাইভার আর গাইড। জঙ্গলে ঢুকতে প্রায় ছটা বেজে গেল। এই বাফার জোনেও মাঝে মাঝে বাঘ আসে। তবে আজ আর বাঘে ততটা আকর্ষণ নেই। দেখতে পেলে দেখব এ পর্যন্ত। না পেলেও ক্ষতি নেই – দু’দিন যা দেখেছি প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে। আমার আজকের মূল আকর্ষণ পাখী। জীপটা আস্তে আস্তে চালাতে বলেছি। আমি ক্যামেরা নিয়ে এ গাছ, সে গাছ, এ ডালে সে ডালে নজর লাগাচ্ছি। সাদাবুক মাছরাঙা (White-throated Kingfisher), নীলকন্ঠ, ফিঙে, তিলেঘুঘু (Spotted Dove), হাট্টিট্টি (Red-wattled Lapwing) এদের সব ছবিতো আগে অনেক নিয়েছি। একটা জায়গায় জীপ এসে থামল। সামনে আর রাস্তা নেই – একটু দূরে বড় জলা। বাইনাকুলারে দেখলাম ডাহুক (White-breasted Waterhen), কায়েম (Purple Swamphen), জলপিপি (Bronze-winged Jacana)। গাছের ওপর পানকৌড়ি উড়ে এসে বসল। ছবি নিলাম বেশ কিছু তবে কেন জানি না ভাল এল না। প্রায় ৫০x জুমের বেশি চলে যেতে হচ্ছিল। বেশ কিছুক্ষণ থেকে অন্য পথে চললাম। গাইডটা ভাল তবে সঞ্জয়ের মত দক্ষ নয়। এক যায়গায় ডালে হঠাৎ ফিতে বুলবুল বা দুধরাজ (Asian Paradise-Flycatcher) দেখে রোক্কে, রোক্কে করে জীপ থামাতে বললাম। ক্যামেরা অন করে ছবি তুলতে যাব, বেটা সাঁট করে উড়ে গিয়ে এমন যায়গায় বসল যে সামনে একটা ছোট ডাল অনেকটাই আড়াল করে দিল। এখন আর এখান থেকে নড়ছি না। এই একটা ছবি তুলতে পারলেই তাদোবা ভ্রমণ পুরো সার্থক। পাখীটা উড়ে উড়ে এ ডালে সে ডালে যাচ্ছে কিন্তু এত পাতার আড়ালে যে ক্যামেরাতে ধরা যাচ্ছে না। প্রায় মিনিট পনেরো হয়ে গেল। এবার আবার পাতার আড়াল থেকে বেরিয়ে উড়ে যে কোথায় গেল আর দেখতে পেলাম না।    

মনের দুঃখে এগোতে লাগলাম। এক যায়গায় মাটিতে দেখি দামা – পাতার ঝোপে পোকা খুঁজছে। দামা (Orange-headed Thrush) ভাল পাখী। মাটিতেই বেশি থাকে। ছটফট করে না। নানান এঙ্গেলে ছবি নেওয়া গেল। আবার সামনের ডালে এক জোড়া বামুনি শালিক (Brahminy Starling)। ছবি নিয়ে আস্তে আস্তে এগোচ্ছি। আমরা বরাবরই জীপের সীটের ওপর দাঁড়িয়ে। আমি আবার পেছন ফিরে এ দিক ও দিক দেখছি। হঠাৎ জীপটা থেমে গেল আর গাইড চাপা গলায় বলে উঠল –‘বৈঠ যাইয়ে, বৈঠ যাইয়ে, একদম চুপ রহিয়ে’। সামনে বেশ একটু দূরে দেখি একটা বাঘ আর দুটো ছোট ছানা সামনের রাস্তা ধরে আমাদের জীপের দিকেই ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। আর আমাদের অবস্থা – কি রকম ফ্রিজ শট হয়ে গেছি, তাকিয়ে থাকা সমাধি – মন, বুদ্ধি সব লোপ পেয়ে গেছে। চেতনা ফিরে এল গাইডের চাপা গলার কথায় – আমায় বলছে যে আমার কোমরে যে একটা লাল রঙের বেল্ট ব্যাগ আছে সেটা খুলে ফেলতে। আমি তাড়াতাড়ি বেল্ট ক্লিপ খুলে ব্যাগটা সিটের নীচে ফেলে দিলাম। লাল রঙ বাঘের আকর্ষণের কারণ হতে পারে – তাই এই সাবধানতা। ইতি মধ্যে বাঘ তার ছানাসহ অনেকটাই এগিয়ে এসেছে। গাইডের কথায় জানলাম ইনি বাঘ নন – বাঘিনী, নাম মাধুরী। দিনকয়েক ধরে একে বাফার জোনের এই অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে।  গাইড আর ড্রাইভার দু’জনেই এ সব ব্যাপারে অভিজ্ঞ – জানালো যে চুপচাপ থাকলে বাঘ কিছু করেনা – আপন পথে যেমন আসছে তেমনই চলে যায়। এখন গাইড ও ড্রাইভার দু’জনেরই বিশ্বাস বাঘ কিছু করবে না। আমাদেরও ধারণা বাঘ কিছু করবে না। কিন্তু ইনি আবার বাঘিনী – এর মনে কি আছে সেটা দেবা ন জানন্তি কুতো আমরা। গাইড আমাকে সাহস দিয়ে বলল ক্যামেরাতে ছবি নিয়ে যেতে। আমি হ্যাঁ হ্যাঁ করে তাড়াতাড়ি ক্যামেরা অন করে ফ্রেমিং করতে আরম্ভ করলাম। যা তা সব ছবি হচ্ছে। ভিডিও মোডে ছবি নেবার কথা মাথাতেই এল না। হাত নড়ে যাচ্ছে। একবারতো শাটার টিপতে গিয়ে  ক্যামেরার সুইচটাই অফ করে দিলাম। আবার অন করে ছবি নিতে গিয়ে দেখি আমাদের জীপ থেকে প্রায় পনেরো ফুট দূরে মাধুরী এসে গেছে। এত কাছে বাঘ আগে এক চিড়িয়াখানায় দেখেছি খাঁচার গরাদের ওপার থেকে। আর এটা সম্পূর্ণ খোলা জীপ। আশেপাশে একটি কাক-প্রাণীও নেই। কিন্তু এই অনুভূতিতো সম্পুর্ণ আলাদা। আমাদের দু’জনেরই অবস্থা সঙ্গিন – সঙ্গিনী আমার জ্যাকেটটা শক্ত মুঠিতে খামচে ধরে আছে।  চোখের সামনে তিনটে হাড়িমুখ। একটা মোটা কেঁদো – আর দুটো বেশ গাবলু। আশ্চর্য এখন আর আমাদের কোন ভয় করছে না। কিছু ভাবছিও না। সজ্ঞানে আছি না অজ্ঞানে আছি জানি না। হঠাৎ মাধুরীদেবীর কি খেয়াল হোল – ডাইনে মোচড় মেরে ছানা সমেত জঙ্গলের ভেতর ঢুকতে আরম্ভ করল। আমার আর আমার সঙ্গিনীর মুখ দিয়ে একসাথে জোড়ে শ্বাস পড়ল। বুকের ধক ধক শুনতে পাচ্ছি। তবে কি এতক্ষণ হৃদযন্ত্র বন্ধ ছিল? কে জানে খেয়াল তো করি নি। মাধুরীতো জঙ্গলে ঢুকে গেল আর আমরা পারি তো একেবারে জীপ থেকে নেমে ওকে খোঁজার জন্য জঙ্গলে ঢুকি আর কি। গুপী-বাঘার মতন এখন নাচতে ইচ্ছে করছে – বাঘা রে ভাগা রে।     

 প্রায় মিনিট পাঁচেক কেটে গেল। গাইড বলল যে বাঘিনী হয়তো ছানাদের নিয়ে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে জলার দিকে যাবে জল খাবার জন্য। কিন্তু না – মাধুরীদেবী আবার বেরিয়েছেন। আমাদের জীপের পেছনে প্রায় ২০-২৫ ফুট দূরে আবার রাস্তা ধরে রাজকীয় ভঙ্গিমায় চলেছে কিন্তু ছানা দুটো নেই। তা হ’লে বোধ হয় বনের ভেতর ছানাদের পাঠশালা আছে – সেখানে ওদের পৌঁছিয়ে দিয়ে মাধুরী হয়তো বাজারে বা পার্লার-টার্লারে যাবে। যা হোক একটু হাওয়া বুঝে আমাদের ড্রাইভার জীপ খুব সন্তর্পনে ঘুরিয়ে নিয়ে পেছনে পেছনে যেতে আরম্ভ করল। কিছুটা যাবার পর মাধুরী রাস্তার ধারে একটা গাছে ফেরোমোন ছেটাল। ইস ছবিটা নিতে নিতেই কাজ শেষ। এবার এগিয়ে ঘাড় ঘোরাল। আমরাও থেমে গেলাম। মাধুরী রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলে ঢুকে গেল। প্রায় মিনিট পনের অপেক্ষা করা হোল।  নাঃ আর দেখা গেল না। এখন কি করব?

গাইড বলল যে এশিয়ার যেটা বর্তমানে সব চেয়ে আকারে বড় সেই বাঘ নাম – ওয়াঘদো – সেটা এখানেই একটা জলের চৌবাচ্চায় সকাল বেলাটা শুয়ে থাকে। চল তা হলে দেখা যাক, যদি দেখতে পাওয়া যায়। গাড়ী চলল ১৭৫ নম্বর চৌবাচ্চার দিকে। যায়গা মতন পৌঁছে দেখি পাঁচ-ছটা জীপ বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে আছে। তেপায়া স্ট্যান্ডে ইয়া ইয়া ক্যামেরা লাগান রয়েছে। সাহেব-মেমও রয়েছে। যথারীতি আমাদের জীপ সবার পেছনে। ওয়াঘদো তার প্রিয় চৌবাচ্চায় শুয়ে আছে। আমরা অবশ্য দেখতে পাচ্ছি না। ড্রাইভার গাড়িটাকে এ দিক ও দিক করে আরও পেছনে রাস্তার ধারে একটু উঁচু মতন যায়গায় সেট করে দিল। হ্যাঁ এবারে বাইনাকুলার দিয়ে স্পষ্ট দেখা গেল। যদিও অনেকটা পেছন থেকে দেখছি – তো ঠিক আছে। বাইনাকুলার আছে, জুম ক্যামেরা আছে – অসুবিধাতো হচ্ছে না। একেবারে বাঘের থুতনি নেড়ে দেখতে হবে কে বলেছে? বাপ রে কি বিশাল। বাঘ বটে একখানা। তিনশ কুড়ি কিলোগ্রামের বেশী নাকি ওজন – আর নাকের ডগা থেকে লেজের প্রান্ত পর্যন্ত এগার না সাড়ে এগার ফুট বলেছিল মনে নেই। তা, কে আর ওকে নিয়ে দাঁড়িপাল্লায় ওজন করেছে বা ফিতে দিয়ে মেপেছে। সবইতো এস্টিমেট, নয়তো আন্দাজে যাকে বলে গেস্টিমেট। লঙ শট, ক্লোজ আপ, ভিডিও কত ছবি নেবে নাও না। বেশ কিছুক্ষণ থেকে এবার ফেরার পালা। ঘণ্টাখানেকের বেশী লাগবে এখান থেকে আমাদের রেসর্টে ফিরতে। এবারে জানা গেল আমাদের গাইড এবং ড্রাইভার এত বছর এ কাজ করছে কিন্তু এই প্রথম খোলাখুলি এত সামনে থেকে বাঘ দেখল। তাই মুখে বাঘ কিছু করবেনা বলে আমাদের সাহস দিলেও ওরা নিজেরাও বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিল। আমরা এবার তাদোবা ভ্রমণের সার্থকতা নিয়ে মহা উৎসাহে আলোচনা করতে করতে ফিরে চললাম।           

My Proses

টিনমামা

তারকনাথ চক্রবর্ত্তী – সংক্ষেপে টি এন চক্রবর্ত্তী। অফিসের সমবয়সী বন্ধুবান্ধবরা ডাকত টিনমামা বলে। আমিও তাঁকে টিনমামা বলতাম – প্রায় বছর দশেকের বড় আমার থেকে। ভালবাসতেন আমায়। বেঁটেখাটো ফরসা চেহারা – কপাল থেকে শুরু করে মাথায় টাক – এ কান থেকে ও কান পর্যন্ত পেছনে কাঁচাপাকা চুলের বেড়। চোখে মোটা কাল ফ্রেমের চশমা। সব সময়ে বেশ হাসিখুশি। অনেকটা আর কে লক্সমনের ‘ইউ সেইড ইট’- কার্টুনের কমন ম্যানের মতন। ১৯৮৩ সালে ইন্ডিয়ান জুট ইন্ডাস্ট্রিস রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশনে আমি যখন চাকরীতে ঢুকেছি তখন টিনমামার প্রায় কুড়ি বছর চাকরী হয়ে গেছে। আমাদের কাজটাই ছিল পাট সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করা। আর এই গবেষণা করার প্রসঙ্গে মামা একদিন তাঁর একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা আমায় বলেছিলেন। 

মামার তখন তেইশ চব্বিশ বছর বয়স। বি এস সি পাশ করে সবে মাত্র চাকরীতে ঢুকেছেন। টেকনিক্যাল এসিস্ট্যান্ট। সিনিয়র গবেষকদের পরীক্ষামূলক কাজে টুকটাক সাহায্য করেন। হাতেকলমে কাজ শিখছেন। ১৯৬৪ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয়। শীতকাল। কলকাতায় তখন সন্ধ্যের পর থেকে কার্ফু চলছে। তারাতলায় অফিস আর উত্তর কলকাতায় শ্রদ্ধানন্দ পার্কের কাছে বাড়ি। অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতেই সন্ধ্যে হয়ে যায়। ফিরে এসে করার কিছু থাকে না। কলকাতায় টিভি আসতে তখনও আরও দশ বছর। পাড়ার আড্ডা, তাস, ক্যারম সবই বন্ধ। মামা জানতে পারলেন সন্ধ্যের পরে রাস্তায় বেরোতে হলে থানা থেকে পাস নিতে হবে। কে কি করে, কার কাজের গুরুত্ব কতখানি এ সব বিবেচনা করে তবেই নাকি পাস দেওয়া হচ্ছে। পরিচিত দু’একজন পাস পেয়েও গেছে। টিনমামা গবেষণাগারে কাজ করেন তাও আবার ভারত সরকারের অধীনস্থ সংস্থায়। পাড়ায় সম্প্রতি মামার খাতিরও কিছুটা বেড়েছে। সুতরাং পাস পেতে তাঁর কোন অসুবিধা হবে না এ ব্যাপারে মামা নিশ্চিত। 
 
পরের দিন মামা অফিস কামাই করে মুচিপাড়া থানায় এলেন কার্ফু পাস নিতে। বেশ লম্বা লাইন পড়েছে। থানার সংশ্লিষ্ট অফিসার সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কাউকে পাস দিচ্ছে, কাউকে হাজার অনুরোধেও দিচ্ছে না, কাউকে আবার ধমক দিয়ে লাইন থেকে বের করে দিচ্ছে। মামা লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছেন। দেখতে দেখতে এবার মামার পালা। আগের তিনজন কে পাস দেওয়া হোল না। মামা তখন ছোটখাট ছোকরা ছেলে – মুখে চোখে একটু ফচকেমি ভাবও আছে। পুলিশ অফিসার মামার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে গম্ভীর ভাবে হাতে ধরা ব্যাটনটি উঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল – “কি করা হয়?”
মামা (গম্ভীর ভাবে) – “আমি সরকারি চাকরী করি”। 
অফিসার – “কোথায়?” 
মামা – “ইন্ডিয়ান জুট ইন্ডাস্ট্রিস রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশনে।” 
অফিসার – “সেটা কোথায়?” 
মামা – “তারাতলায়।” 
 অফিসার – “কাজটা কি?” 
মামা – “রিসার্চ করি।” 
অফিসার – “কি ই ই ই ই?” 
মামা (একটু জোড় গলায়) – “রিসার্চ করি। আমি সাইন্টিস্ট।”অফিসার (একটু থমকে) – “সাইন্টিস্ট? রিসার্চ? তা রিসার্চতো দিনের বেলা – এর সাথে সন্ধ্যেয় বেরোনোর কি সম্পর্ক?” 
মামা – “রিসার্চের কাজ শেষ করতে করতেইতো সন্ধ্যে হয়ে যায়। বাড়ি ফিরতে রাত হয়। তাই… ।” 

পুলিশ অফিসার খানিকক্ষণ ভুরু কুঁচকে মামার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বাঘের মতন গর্জ্জন করে বলে উঠল -“সাতদিন রিসার্চ বন্ধ থাকলে দেশের কোনও ক্ষতি হয় না। বেরোও এখান থেকে।” 

মামা কি রকম থতমত খেয়ে লাইন থেকে বেরিয়ে এলেন। মামার পরে যে লাইনে ছিল তাকে অফিসার জিজ্ঞাসা করল – “এ্যাই! কি করা হয়?” লোকটি বলল – “আজ্ঞে স্যার আমি গোয়ালা, বাড়ি বাড়ি দুধ দিই।”

পুলিশ অফিসার তার অধীনস্থ পুলিশ কর্মচারীকে বলল “একে একটা পাস ইস্যু করে দাওতো। নেক্সট।”

Unfinished FIR

অসমাপ্ত এজাহার – কালিহাতির কথা -১

আমিনা হত্যা মামলা

দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী

 

(১)

দেওয়ানগঞ্জ থানা থেকে মাস তিনেক পরে ইংরেজী ১৯৩৮ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি বদলিসূত্রে কালিহাতি থানায় যোগদান করলাম।  ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল মহকুমার অন্তর্গত এই থানার এলাকা আয়তনে বেশ বড়। যতদূর মনে আছে প্রায় বারোটি ইউনিয়ন বোর্ড এবং পাঁচটি পঞ্চায়েত দ্বারা শাসিত ছিল গ্রামগুলি। এলাকার শেষ উত্তরপ্রান্তে একটি নদীর ধারে (এখন আর তার নাম মনে নেই) অবস্থিত ছিল থানার অফিস ও পুলিশ কর্মচারীদের ব্যারাক ও কোয়ার্টার। জেলা বোর্ডের রাস্তা থানার লাগোয়া পূর্ব দিকে। এই রাস্তা প্রায় ষাট মাইল, ময়মনসিংহ শহর ও টাঙ্গাইল মহকুমা শহরকে যোগ করেছে। সারাদিনে গোটা দুই সার্ভিস বাস চলাচল করত। এখনকার কথা অবশ্য জানি না। এলাকার শেষ দক্ষিণপ্রান্তে চর এলাকা। তারপর যমুনা নদী। এদিকটা প্রায় পনের মাইল। পুবদিকে মাইল দশেক কাঁচা রাস্তা, একনিষ্ঠ কংগ্রেস কর্মী জনাব আব্দুল হামিদ চৌধুরীর বাড়ি পর্য্যন্ত। আর কিছদুর থেকে আরম্ভ হোল শালবন। প্রায় দশ মাইল পর্য্যন্ত কালিহাতি থানার এলাকা। মধ্যে মধ্যে ছোট ছোট গ্রাম, পঞ্চায়েতের শাসনাধীন। এই বিস্তৃত শালবন সমন্বিত যায়গাগুলিকে গড় বলা হোত। এই গড় শুনেছি প্রায় চল্লিশ মাইল বিস্তৃত। ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা ও গফরগাঁও এবং ঢাকা জেলার টঙ্গী ও কাওরাইদ থানার অধীন।    

জঙ্গলের মধ্যে কত পথই না কতদিকে গিয়েছে – তার হিসাব পাওয়া যায় স্থানীয় লোকের কাছে। তাদের সাহায্য ছাড়া চললে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছান খুবই সন্দেহের বিষয় ছিল। কোন পথ যে কোনদিকে নিয়ে যাবে তার ঠিক নেই। মধ্যে মধ্যে আছে সরকারী বন বিভাগের অফিস। এর মধ্যে কচুয়া ও আড়াইপাড়া ফরেস্ট অফিস কালিহাতি থানার এলাকাধীন। পুলিশ অফিসারদের কার্যকালে এই ফরেস্ট অফিসগুলি ছিল তাদের বিশ্রামের স্থান। এই জঙ্গলের বেশীর ভাগ অধিবাসী হোল মুসলমান। এরা জঙ্গলের ইজারাদার, বিত্তশালী। নানা শ্রেণীর হিন্দুও ছিল। তারা করত দিন মজুরের কাজ। চোর ডাকাতের উপদ্রবতো ছিলই, তা ছাড়া ছিল বনের নিজস্ব সম্পদ ছোটখাটো হিংস্র জন্তু যথা বিষধর সাপ, অজগর, শূয়োর, নেকড়ে প্রভৃতি। এইসব অধিবাসী নিয়ে জঙ্গল দিনের বেলায়ও ছিল বিভীষিকাময়। বন্দুকধারী ফরেষ্টগার্ড ও পুলিশের পক্ষে রাত্রে ঘোরাফেরা করা ছিল খুবই বিপজ্জনক। থানা অফিস থেকে জঙ্গল এলাকার দূরত্ব হেতু জঙ্গলের প্রায় শেষ প্রান্ত আড়াইপাড়া নামক স্থানে একটি পুলিশ ক্যাম্প ছিল। এখানে বন্দুকধারী কয়েকজন সেপাই থাকত।

চর এলাকাকে বলা হোত “ভড়”। এখানকার অধিবাসীও বেশীরভাগ মুসলমান। চরের জমি ছিল উর্ব্বরা। চাষ করে পেত প্রচুর ফসল ধান, পাট ইত্যাদি। বিক্রিলব্ধ টাকা হাতে পেলেই এদের রক্তে জাগত লড়াইয়ের উন্মাদনা। দাঙ্গাহাঙ্গামা লেগে যেত সামান্য ব্যাপার নিয়ে। দিন দুই আগে থেকেই লেগে যেত তোড়জোড়। নাকাড়া-টিকাড়া বাজিয়ে নৃত্য করত লাঠিসোটা নিয়ে। তারপর আরম্ভ হোত দুই দলে লড়াই বা কাজিয়া। দুই চারিটি লাশ পড়লে বা কিছু জখম হোলে হোত শান্ত কিন্তু সন্ধি হোত না। কারণ এর পর চলত থানা- পুলিশ, কোর্ট-কাছাড়ি। হাতের টাকা নিঃশেষ করে রেহাই ছিল না। উপরি পাওনা ছিল কারাবাস বা ফাঁসি। এভাবে কত পরিবার যে উৎসন্ন হয়ে যেত তার ঠিক নেই। এতেই যে শেষ হোত তা নয়। কয়েক বৎসর পরই জেগে উঠত নতুন দল। আবার তার পুনরাবৃত্তি। এই হোল একদিক। অন্য দিকে ছিল ডাকাতি, রাহাজানি, পরস্ত্রীহরণ। যুবতী স্ত্রী খুন কোরে ফাঁসের রজ্জুতে ঝুলিয়ে রেখে মিথ্যা ফাঁসির অভিযোগ ইত্যাদি কম ছিল না। এই “গড়” ও “ভড়” নিয়ে কালিহাতি হল এখন আমার কর্মস্থল।

আমি যে সময়কার কথা বলছি তখন টাঙ্গাইল মহকুমায় খুব ম্যালেরিয়ার প্রাদূর্ভাব। এর প্রকোপ থেকে কালিহাতি এলাকার গ্রামগুলিও অব্যাহতি পায়নি। আসার কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। প্রতি মাসের অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে আমাকে আলিঙ্গন করে আমার দেহের হাড় পর্য্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়ে যেতেন। চুপ করে সহ্য করে কাজ করে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। মেডিকেল লিভে যাওয়া যেত কিন্তু বিশেষ কোন কারণে তাহা যুক্তিযুক্ত মনে করি নি। তাই কুইনাইনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে দেহের ক্ষীণতার রোধ করতে লাগলাম। কাজের চাপও খুব বেশী ছিল। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী মোবারক আলী মিঞা ছিলেন খুব কৌতুকপ্রিয়। এলাকা খুব বড় বলে একজন সহকর্মীর সঙ্গে আর একজনের দেখা খুব কম দিনই হোত। কিন্তু যখনই উনি থানায় উপস্থিত থাকতেন, কাজের ফাঁকে ফাঁকে কৌতুকপ্রদ গল্প করে আমাদের মাতিয়ে রাখতেন। আমাকে বলতেন ‘ছোট মিঞা’। আমরাও তাকে বলতাম ‘বড় সাহেব’। আমাকে খুব ভালবাসতেন। সহকর্মীদের উপর তার হুকুম ছিল আমাকে যেন তদন্তের জন্য কোন খারাপ স্থানে পাঠানো না হয়। অধিকন্তু আমি বয়সে ছোট ছিলাম। সহকর্মীদের অনেক রকম কাজ আমি পছন্দ করতাম না বরঞ্চ সমালোচনা করতাম। তাই যে যার কাজ নিয়ে বা কাজের অজুহাতে সকালের দিকেই কেটে পড়ত – ডায়রিতে লিখে নিয়ে। আমি অধিকাংশ সময়ই থানাট থাকতাম। বেশীর ভাগ ইউনিয়নে এমন কতকগুলি গ্রাম ছিল যেখনে শিক্ষিত লোকের বাস ছিল। থানার বাইরে কোন কাজে গেলে এদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আসতাম। বড় সাহেবও এ কথা জানতেন। এবং তাহাতে কোনরূপ সাম্প্রদায়িকতার বা রাজনীতির গন্ধ না থাকায় আমার উপর তার আচরণ খুব প্রীতিপূর্ণ হয়েছিল। এখানকার কার্যকালে বেশ কয়েকটি সমস্যাপূর্ণ তদন্তের ভার আমার উপর পড়ে। তার মধ্যে যে কয়েকটি ভাল মনে আছে তাহাই লিখলাম।

(২)

বর্তমান কালিহাতি থানা  (ছবি – ইন্টারনেট)

অন্ধকার রাত। আপনি হয়তো বাইরের ঘরে বসে পড়াশুনা করছেন। হঠাৎ বাইরে কাশির শব্দ শুনলেন। ভয়ের কি আছে? মনে করবেন কোন বন্ধু দেখা করতে আসছে। কিন্তু এই কাশির শব্দ যে কতদূর ত্রাসের সৃষ্টি করে তা’ থানায় থেকে উপলব্ধি করতাম। দিনের বেলায় থানার ঘরে বসে কাজ করতে করতে যখনই দেখতাম নীল পোষাকধারী ভগ্নদূত (চৌকিদার) একজন লোক সাথে বা একাই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে তখনই দেহের মধ্যে ম্যালেরিয়ার ঘুমন্ত বীজাণুগুলি নড়ে চড়ে উঠত। চৌকিদার দেখে এত ভয় পুলিশে আসার আগেতো কোনদিন হয় নি। কই আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল সুধন্য চৌকিদারের বাড়ি। আমরা তাকে কতরকম হুকুম করতাম। সেও আমাদের বাবুদের ছেলে বলে মান্য করত। কিন্তু থানায় থাকতে এরূপ মনে হোত কেন? কারণ এরা এমন সব জটিল বিষয় নিয়ে থানায় আসত যার গ্রন্থি উন্মোচন করতে গলদঘর্ম হয়ে যেতে হোত। নাওয়া খাওয়ার সময় দিত না। এখনই ছোট। একটা কিছু হয়তো করব ঠিক করেছি, সব ভেস্তে গেল।

শীতের রাত তায় আবার কৃষ্ণ পক্ষ। ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে। থানায় বসে হ্যারিকেনের সামনে ডায়েরি লিখছি। সহকর্মী দুজনেই বাইরে। বড় সাহেব বাসায় অসুস্থ। হৃদয় স্পন্দনকারী কাশির আওয়াজ বাইরে। আমি বলে উঠলাম -“কে? ভেতরে এসো”। দেখি নীল পোষাকধারী ভগ্নদূত। সঙ্গে আছে একজন লোক। ভাল করে দাঁড়াতে পারছে না – নড়বড় করছে। পরনে খাটো লুঙ্গি। আবছা আলোতে চেহারার বিশেষ নজরে আসছে না। শুধু বাবু বাবু করছে।

আমি ধমকে উঠলাম – “কি কেবল বাবু বাবু করছ। কি হয়েছে বল”।

সে বিকৃত স্বরে বলল – “বাবু আমার ইস্ত্রী ফাঁসে লটকে মরছে।”

“বয়স কত?”

“কুড়ি কিংবা তিরিশ অইব।”

“দেখতে কেমন?”

“গাঁয়ের লোকে তো হোন্দরই কইত।”

“ফাঁসি দিল কেন?”

“ক্যান্ যে ফাঁসে মইল বাবু তা কমু ক্যামনে।”

এই বলে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। নাম বলল হোসেন মিঞা, থাকে বুড়ীর চালা গাঁয়ে। থানা থেকে তের-চোদ্দ মাইল পূবে গড়ের মধ্যে। কচুয়া ফরেস্ট অফিস থেকে আরও মাইল দু’এক হাঁটা পথ। হোসেনের নিজস্ব কোন জমিজিরাৎ নেই। চাষের সময় জন খাটে আর খাল বিলে মাছ ধরে কোনমতে জীবিকা নির্বাহ করে। বছর পাঁচেক হোল শাদি করেছে। কোন ছেলেপুলে হয় নি। বলল –

“বাবু, বউ দ্যাখতে ভাল অইলে কি অইব, ঘরে মন ছিল না। আমি বাড়ি না থাকলেই এহানে ওহানে টল দিত। এই নিয়া কোন্দল যে না অইত তা নয়।”

“তুই কখন বউকে ফাঁস দেওয়া অবস্থায় দেখলি?”

“আজই বিহানে।”

“তুই কাল রাত্রে কোথায় ছিলি?”

“মাছ ধরতে হাঝ রাইতে ভাত খাইয়া ঘর থেকা বাইর অইয়া গেলাম। রাইত আর ঘরে আহি নাই। বেইনের সময় ঘরে আইয়া দেহি, আমিনা ঘরে নাই। সন্দে অইল হয়তো মাঠে গেছে। বেলা অইল তবু আইল না দেইখা অনেক তালাশ কইলাম। গাঁয়ের লোকদের জানালাম। বাড়ির দক্ষিণ দিকে জঙ্গলে একটা গাছের ডালে দেখি লটকিছে।”  

“সবার আগে কে দেখেছে?”

“অই ছাওয়ালপান, নাম কইতে পারমু না।”

হোসেনের জবাবে আমি মোটেই খুশী হতে পারলাম না। কি এমন হতে পারে যার জন্য একটি যুবতী স্ত্রীলোক এরূপ ভাবে আত্মহত্যা করতে পারে? শুধু ছেলেপুলে হয় না বলে কি? বড় সাহেবের কাছে শুনেছি যুবতী স্ত্রী খুন করে আত্মহত্যার রূপ দেওয়া এ থানার অনেক বিশেষত্বের একটি। এরূপ সংবাদ থানায় রিপোর্ট হলে খুব সতর্কতার সাথে সংবাদ লিখতে এবং তদন্ত করতে বলেছেন।

একটি বিষয় আমি বেশ লক্ষ্য করে আসছি। এরূপ জটিল ব্যাপারে গ্রামের চৌকিদার কোন সাহায্যেই আসে না। সে তখন হয়ে যায় নীরব দর্শক। এ কথা কি বিশ্বাসযোগ্য যে একই গ্রামে বাস করে এরা প্রকৃত ঘটনা সম্বন্ধে কোন সংবাদ রাখে না? রাখে তবে গ্রামের মোড়লদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন কিছু বলতে সাহস করে না। অনেক সময়ে এরূপ দেখা গেছে যে গ্রামের লোক বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে কোন সাজানো সংবাদ দিতে থানায় এলাকার চৌকিদারকে সঙ্গে নিয়ে। সংবাদ ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করতে যেয়ে ঘটনার সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহ হোল এবং সংবাদদাতাকে নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেও যখন প্রকৃত ঘটনা জানতে পারা যাচ্ছে না তখন সংবাদদাতাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে চৌকিদারকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জেরা করলে আনেক সময়ে সত্য সংবাদ বের হয়ে আসে। এ ক্ষেত্রে কিন্তু শত চেষ্টা করেও চৌকিদার বা হোসেনের কাছ থেকে আমিনার আত্মহত্যা ছাড়া অন্য কিছু বের করতে পারলাম না। তাই হোসেনের কথামত আমিনা ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে এই কথাই লিখে নিলাম।

ঘটনাস্থল সঙ্গে সঙ্গেই রওনা হওয়া নিয়ম বলে আমি কাগজপত্র গুছিয়ে রওনা হওয়ার জন্য তৈরি হলাম। ব্যারাকে দেখি মাত্র দুইজন কনস্টেবল আছে। একজন হিন্দু, অল্পদিনের চাকুরী, বিশেষ চালাক চতুর নয়। অন্যজন প্রবীণ ও বিচক্ষণ বলে সুনাম আছে। নাম নৈমদ্দিন সেখ। এর বাবা সিপাই-এ র কাজ করে অবসর নিয়েছে। আর ছেলেও নাকি কোন এক থানায় কনস্টেবল। আমার সঙ্গে যাওয়ার কথা বলায় সে এক কথায় রাজি হয়ে গেল। তিন পুরুষেই পুলিসের রক্ত আছে এইটাই তার খুব গর্ব্ব ছিল। লাশ পাহাড়ার কি বন্দোবস্ত করে এসেছে – এই কথাই সে চৌকিদারকে প্রথম প্রশ্ন করল। সত্যিইতো এই দরকারি কথাটা আমার এতক্ষন মনে একবারও আসে নি। এখন রাত্রি তাতে আবার ভীষন অন্ধকার। লাশতো বন্য জন্তুতে আংশিক খেয়ে ফেলতে পারে। তাহলে প্রকৃত তদন্ত যে বিঘ্নিত হবে। ফাঁসের মড়ার ধারে কাছে ভয়ে কোন লোক যাবে না ঠিক কিন্তু বন্য জন্তুরতো ভোগ্য বস্তু।

চৌকিদার উত্তর দিল – “গ্রামের লোক দফাদারকে খবর দিতে গেছে।” উত্তর শুনে সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। বড়ই দুশ্চিন্তা নিয়ে রওনা হলাম। কিছুটা যেয়ে বড় রাস্তা ছেড়ে ধরলাম মেঠো পথ, ক্ষেতের আল। চৌকিদারের হাতে হ্যারিকেন, টিম টিমে আলো। হোঁচট খেতে খেতে কোন মতে চলছি বুড়ো নৈমদ্দিনের হাত ধরে ধরে। কিছুক্ষণ পর টিম টিমে আলোটুকুও আর দেখা যাচ্ছে না। লাল গোলার মত কি একটা আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলেছে। অর্থাৎ লাল কেরোসিনের প্রভাবে হ্যারিকেনের চিমনি কাল হয়ে যাওয়ায় এই লালের আবির্ভাব। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। আমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এই চারটি জীব যেন পাতালের গহ্বরে নেমে চলেছি। হঠাৎ চৌকিদার হাঁক দিয়ে থেমে গেল। আমি মনে করলাম হয়তো সাপ, বলে উঠলাম – “সাবধান”। এগিয়ে দেখি বেশ কিছুটা যায়গা জুড়ে জল রয়েছে। কিন্তু কোথায় কতটা জল রাতের অন্ধকারে তা’ত বোঝা যাচ্ছে না। চৌকিদার হয়তো পথ ভুল করেছে। সে আমাদেরকে দাঁড়াতে বলে জলে নেমে গেল। তারপর হাতের বর্শা দিয়ে জল মেপে ফিরে এসে যে দিকে জল কম সে দিক দিয়ে যায়গাটা পার করে দিল। কিছুটা গিয়েই আরম্ভ হোল গড়ের জঙ্গল। রাত্রিও অনেক হয়েছে। আর এগোন ঠিক হবে না বলে কাছেই এক গ্রামে কোন প্রধানের বাড়ি আশ্রয় নিলাম। এ যায়গা থানা থেকে মাইল দশেক হবে।

পরদিন খুব ভোরে রওনা হয়ে আটটার মধ্যে ঘটনাস্থল পৌঁছে গেলাম। গ্রামে প্রায় লোক নেই বললেই চলে। দেখলাম মৃতদেহের অনতিদূরে দফাদার একজন চৌকিদার সহ হাজীর আছে। হঠাৎ দেখি সিপাই নৈমদ্দিন অদৃশ্য। কোথায় যেতে পারে ভাবছি। কারণ লোককে ডাকতে হবে, তারপর তাদের সামনে লাশের ‘সুরতহাল’ রিপোর্ট তৈরি করতে হবে। কিছুক্ষণ পর দেখি নৈমদ্দিন সাত-আটজন লোক ধরে নিয়ে এসেছে। তারপর আমরা সকলে লাশের কাছে এলাম – দেখি একটি গাছের ডালে ঝুলছে। আমিনার বয়স তেইশ চব্বিশ বছর হবে অনুমান করলাম। পরনে একটি ডুরে শাড়ি। দেহে অন্য আর কোন আবরণ নেই, রঙ শ্যাম বর্ণ। ফুলে গেছে বলে স্বাস্থ্য কিরূপ ছিল বোঝা যাচ্ছে না, তবে ভাল ছিল বলে মনে হোল। মাথায় একরাশ চুল এলোমেলো, তেল পড়ে নি কয়েকদিন। হাতে সবুজ রঙের কাঁচের চুড়ি – এক হাতে চারটে আর এক হাতে তিনটে। ঠোঁট লাল কিন্তু কালচে ধরেছে – পান খাওয়া রঙ। পাটের তৈরি ছাগলের দড়ির মত মোটা দড়ি গলায় গেড়ো দিয়ে ডালের সঙ্গে বাঁধা। গলা ফুলে যাওয়ায়, দড়ি বেশ খানিকটা মাংসের ভেতর ঢুকে গেছে। দড়ির গেড়ো বা দিকে, দেহের ভারে টান হয়ে আছে। ফলে মাথা ডান দিকে ঝুঁকে পড়েছে। চোখ ঠিকরে বের হয়ে আসছে। মুখ দিয়ে সামান্য লালা নির্গত। হাত দুটি আধা মুঠো করা – দুটো পায়ের পাতার গতি মাটির দিকে – মাটি থেকে হাতখানেক উঁচুতে। আশে পাশে এমন কোন উঁচু জিনিষ দেখলাম না যার ওপর উঠে ফাঁস লাগিয়ে ডালে দড়ি বেঁধে দিয়ে তার পর উঁচু জিনিষটা পা দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ঝুলে পড়তে পারে।

ডাক্তারী বিধি শাস্ত্রে প্রকৃত ফাঁস দিয়ে মরেছে কি না বুঝতে হলে, যে সমস্ত লক্ষণ দেহে প্রকাশ পায়, তাহা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে মিলিয়ে দেখতে লাগলাম। কিছু কিছু মিলও দেখা গেল। কিন্তু সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ হতে পারছি কই? গাছের ডালে এরূপ শক্ত করে বাঁধতে হলে হয় কোন উঁচু জিনিষে দাঁড়াতে হবে নয় গাছের ডালে বসে বেঁধে নিয়ে ঝুলে পড়তে হবে। গাছের গুঁড়িতো সোজা সরল, একটা মেয়ের পক্ষে ওঠাতো সহজ নয়। পায়ের মাটির দাগ তো গুঁড়িতে থাকা স্বাভাবিক। কেমনতর হোল? আত্মহত্যা না অন্য কিছু! কিছুইতো ঠিক করতে পারছি না। বিভিন্ন রকমের আত্মহত্যায় যে সমস্ত লক্ষণাদি মৃত দেহে দেখা যাবে বলে মেডিক্যাল জুরিপ্রুডেন্স থেকে শেখা হয়েছিল তা’ত কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারছি না। এরূপ ধরণের তদন্ত আমার কর্মজীবনে এই প্রথম। আমার নিজের যোগ্যতার ওপর আমি বিশ্বাস হারাতে বসলাম। ডাক দিলাম – “নৈমদ্দিন”। কোথায় সে? আবার অনুপস্থিত। কতক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম জানি না। হঠাৎ নৈমদ্দিন ফিরে এল। আমাকে একটু দূরে ডেকে নিয়ে বলল – “ছোট বাবু, কি তা দেখলেন”?

আমি বললাম – “নৈমদ্দিন, প্রকৃত ফাঁস হয়তো মনে হচ্ছে। কিন্তু যুবতী স্ত্রীলোক, গাছে উঠল কি করে?”

নৈমদ্দিন আমার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বলে উঠল – “খুন! আওহান।”

আমি তার সঙ্গে মৃতদেহের কাছে আবার এলাম। তারপর দুজনেই অনেক্ষন ধরে তন্ন তন্ন করে দেখতে লাগলাম। অবস্থা জটিল – এতবড় একটা সমস্যার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। থানা থেকে প্রায় পনেরো মাইল জঙ্গলে – যেখানে সভ্যতার আলোক ছিটেফোঁটাও প্রবেশ করে নি, যেখানে লেখাপড়া জানা লোক নেই, তখনও পঞ্চায়েতি শাসন – সেখানে উদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রধানদের সঙ্গে মিলজুল করে নিলেইতো কাজ কত সহজ হয়ে যায়। ডাক্তারী ছাড়ুনতো। ঐতো গ্রামের লোক দাঁড়িয়ে আছে কফিনের কাপড় নিয়ে। মৃতদেহ কবরের হুকুম দিয়ে আপনি থানায় চলে আসুন। গ্রামের লোক এবং মৃতার আত্মীয়স্বজন “যা হবার হয়ে গেছে” – বলে আপনার কাজের অনুমোদন করলে আর চিন্তা কি? কিন্তু সত্যি যদি আত্মহত্যা না হয়, যদি তাকে খুন করে ঝুলিয়ে রাখা হয়ে থাকে? তাহলে আপনিও তার সাহায্যকারী খুনী। খুনের প্রমাণ সকল ইচ্ছাকৃতভাবে বা অজ্ঞতার জন্য চিরতরে লুপ্ত করে দেওয়ায় আপনি শুধু আপনার কর্ত্তব্য কার্য থেকে স্খলিত হন নি আপনার ঐ অবিমৃষ্যকারীতার জন্য আপনি দেশবাসীর কাছে, সমাজের কাছে, আইনের কাছে মৃত আত্মার কাছে চিরদিনের জন্য দায়ী থেকে গেলেন। এরূপ কতই তো দেখেছি। স্ত্রীঘটিত ব্যাপারে লিপ্ত সন্দেহে আপন ভাইকে বিষ খাইয়ে হত্যা করে অর্থের জোরে আত্মহত্যার রূপ দিয়ে রেহাই পেয়ে গেল। সামান্য দূর থেকে পিস্তলের গুলিতে ছোটভাই বড়ভাইকে গুলি করে বসল – বড়ভাইকে কোন ঘৃণিত কার্যে লিপ্ত দেখে। তারপর অর্থ ও মিথ্যা সাক্ষ্য প্রমাণাদির জোরে প্রকাশ্য দিবালোকে সেই হত্যা হয়ে গেল আত্মহত্যা। এই তো সেদিনের কথা।

যা হোক অস্থিরভাবে ঘটনার স্থান পরিদর্শন করছি। হঠাৎ নৈমদ্দিন একখানা ভাঙা কাঁচের চুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে আমাকে দেখাল। তাইত – মৃতার একহাতে একটা চুড়ি কম ছিল। এইতো সেই চুড়ি। মেঘ সরে যেতে থাকলে যেমন আসতে আসতে আলো দেখা যেতে থাকে তেমনই যেন আমি কিছু কিছু আলো দেখতে পেলাম। নজরে এল কতকগুলি আগাছা পদদলিত অবস্থায়। তা’হলেতো কয়েকজন লোক গাছের নীচে একত্র হয়েছিল। সমস্ত লিখে নিয়ে মৃতদেহ নামাতে হুকুম দিলাম। দেহের প্রকাশ্য স্থানে কোন দাগ জখম দেখছিনা। নৈমদ্দিন হঠাৎ বলে উঠল – “ছোটবাবু! আঙ্গলে চুনা রইছে দেখছুন।” আমি দেখলাম সত্যিতো ডান হাতের তর্জ্জনীর মাথায় কতকটা চুন শুকিয়ে রয়েছে – এতটুকুও খসে পরে নি। ফাঁসের দড়ির গেড়ো নিজে দিলে এই আঙ্গুলেতো চুন এ অবস্থায় থাকার কথা নয়। দেহ অনাবৃত করে দেখার প্রয়োজন হোল। যথাসম্ভব শালীনতা বজায় রেখে পরীক্ষা করে দেখা গেল মৃতার তলপেটের একটা যায়গা লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। সঙ্গে সঙ্গে সব কিছু পরিষ্কার হয়ে গেল। আড়াইপাড়া ক্যাম্প থেকে বন্দুকধারী দুজন সেপাই ডেকে পাঠালাম। কারণ এখনকার কাজ হবে এই অসভ্য লোকেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। বন্দুকধারী কনস্টেবলরা এসে গেলে কাগজপত্র তৈরি করে মৃতদেহ ময়নাতদন্তে টাঙ্গাইল মহকুমা হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলাম।

হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা চলল অনেকক্ষণ। শেষে সব স্বীকার করল। আমিনার চরিত্রদোষ ছিল। শাদীর আগে থেকেই বাপের বাড়ির গাঁয়ের (মাইনকার চালায়) রহমানের সঙ্গে ভাব ছিল। এমনকি শাদীর কথাবার্তাও চলছিল। কিন্তু রহমানের অর্থাভাব থাকায় শাদী হয় নি। ভাগ্যান্বেষণে রহমান কলকাতায় চলে আসে। ইতিমধ্যে হোসেনের সঙ্গে আমিনার শাদী হয়ে গেল। রহমান কলকাতায় বাবুর্চির কজ করে বেশ কিছু টাকা জমিয়ে কয়েক মাস আগে দেশে ফিরে শুনল বুড়ির চালা গাঁয়ের হোসেনের সঙ্গে আমিনার শাদী হয়ে গেছে। তা মনে খুবই গোসা হোল। আমিনার বাবা কাশেম কি এই কয়টি বছর সবুর করতে পারত না? রহমান কিন্তু আমিনাকে ভুলতে পারল না। নানা ছুতানাতা দেখিয়ে বুড়ির চালা গাঁয়ে ঘুর ঘুর করত। ইয়ার বন্ধুদের সাথে দেখা হলে মিথ্যা করে বলত – “এই কামারের কাছ দা দিইছি পানি দিতে, দেখতে আইলাম অইল কিনা।” হোসেনের কানেও কথাটা পৌঁছেছে। তাই আমিনার সাথে খিটিমিটি লেগেই থাকত।

ঘটনার রাত্রে হোসেন মাছ ধরতে বের হয়ে যায়। এই সুযোগে রহমান আমিনার ঘরে ঢোকে ও গালগল্প পান খাওয়া চলে। কিন্তু আমিনার অদৃষ্ট মন্দ। মাছ লাগল না বলে হোসেন বাড়ি চলে আসে। তারপর দুজনকে এই অবস্থায় দেখে হোসেনের মেজাজ চড়ে যায়। হাতের কাছে কিছু না থাকায় রহমান বেঁচে গেল পালিয়ে। কিন্তু আমিনা হতবাক। এরূপ যে হবে বুঝতে পারে নি। যেমন বসে ছিল, বসেই রইল। হোসেন আমিনাকে জোরে এক লাথি মারল – লাগল তলপেটে। আমিনা চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। হোসেন ভাবল আমিনা মরে গেছে। চিৎকার শুনে প্রতিবেশী তিন চার জন লোকও দৌড়ে এল। অনেকক্ষণ জ্ঞান হোল না দেখে এরাও মনে করল আমিনা মরে গেছে। তাই সকলে পরামর্শ করে আমিনাকে সেই অবস্থায় ফাঁসে ঝুলিয়ে দিল। রশির চাপে কণ্ঠনালী বদ্ধ হওয়ার সময় হয়ত আমিনার জ্ঞান সাময়িক ফিরে এসেছিল, বাঁচার জন্য পা দিয়ে মাটি ধরতে চেষ্টা করছিল হয়তো। তাই আমিনার দেহে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার লক্ষণ সমূহ কিছু কিছু দেখা গিয়েছিল।

হোসেনের স্বীকারোক্তি লিখে নিয়ে, পরোক্ষ, অপরোক্ষ এবং অবস্থাঘটিত প্রমাণাদি সংগ্রহ করে হোসেন মিঞা এবং অন্যান্য যারা আমিনার দেহ ঝুলিয়ে দিয়ে তার মৃত্যুকে তরান্বিত করেছিল, সকলকে গ্রেপ্তার করে থানায় ফিরে এলাম। এরপর থানার বড় সাহেব বাকি তদন্ত সম্পূর্ণ করে হোসেন মিঞা সহ তিন চার জন লোককে বিভিন্ন ধারায় কোর্টে  অভিযুক্ত করলেন। শুনেছি এদের বিচারে কয়েক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছিল।       

My Poems

কিছু উন্মুক্ত হাইকু

 

 

হাইকু তিন লাইনের জাপানি কবিতা। প্রথম ও তৃতীয় লাইনে ৫টি আর মাঝের লাইনে ৭টি মোরা অর্থাৎ ৫-৭-৫ বিন্যাসে মোট ১৭টি মোরা থাকে। মোরা জাপানি শব্দের একক যা ইংরাজীর সিলেবল অথবা আমাদের বাংলার অক্ষর বা মাত্রার অনুরূপ তবে একেবারে অভিন্ন নয়। এই হাইকু লেখার রীতি জাপানে শুরু হয় প্রায় খ্রীষ্টিয় অষ্টম শতাব্দী থেকে যা পরবর্ত্তীকালে জাপানের জীবন, রীতিনীতি ও সংস্কৃতির এক বিশেষ অঙ্গ হয়ে ওঠে। হাইকুকে তার সুদীর্ঘ ইতিহাসে লেখার পদ্ধতির বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে। ৫-৭-৫ মাত্রার বিন্যাস ছাড়াও হাইকুর বিশেষত্ব ঋতু বা প্রকৃতি বা সৌন্দর্য্য -ভিত্তিক শব্দের ব্যাবহার ও গভীর ভাবের প্রকাশ। প্রথাগত হাইকুতে ঋতু বা ঋতুবদলে প্রকৃতির রূপের প্রাধান্য থাকে। সাধারণতঃ হাইকুতে দুটি চিত্র বা ভাবের পাশাপাশি অবস্থান থাকে। এখানে কোন বর্ণনা বা বিশ্লেষণ থাকে না। কবি তার পঞ্চ ইন্দ্রিয়তে যা দেখে বা ভাবে তাই ভাষার মাধ্যমে সংক্ষপে চিত্র আঁকে – মূল ভাবটা হচ্ছে চিত্রটা দেখাও – বর্ণনা করতে যেও না। চিত্র সম্পূর্ণ করার দায় পাঠকের। হাইকু কবিতার কোনো শিরোনাম থাকে না। হাইকু লিখিয়ে কবিদের বলা হয় হাইজিন। 
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ জাপান ভ্রমণে এসে এই হাইকু কবিতাতে বেশ প্রভাবিত ও মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর জাপান যাত্রী গ্রন্থে তিনি লিখেছেন – “জাপানি বাজে চেঁচামেচি ঝগড়াঝাঁটি করে নিজের বলক্ষয় করে না। প্রাণশক্তির বাজে খরচ নেই বলে প্রয়োজনের সময় টানাটানি পড়ে না। শরীর-মনের এই শান্তি ও সহিষ্ণুতা ওদের স্বজাতীয় এই যে নিজের প্রকাশকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত করতে থাকা, এ ওদের কবিতাতেও দেখা যায়। তিন লাইনের কাব্য জগতের আর কোথাও নেই। এই তিন লাইনই ওদের কবি, পাঠক, উভয়ের পক্ষেই যথেষ্ট… এই কবিতাগুলির মধ্যে কেবল যে বাক্‌সংযম তা নয়, এর মধ্যে ভাবের সংযম। এই ভাবের সংযমকে হৃদয়ের চাঞ্চল্য কোথাও ক্ষুব্ধ করছে না। আমাদের মনে মানুষের একটা ইন্দ্রিয়শক্তিকে খর্ব করে আর-একটাকে বাড়ানো চলে, এ আমরা দেখেছি। সৌন্দর্যবোধ এবং হৃদয়াবেগ, এ দুটোই হৃদয়বৃত্তি। আবেগের বোধ এবং প্রকাশকে খর্ব করে সৌন্দর্যের বোধ এবং প্রকাশকে প্রভূত পরিমাণে বাড়িয়ে তোলা যেতে পারে–এখানে এসে অবধি এই কথাটা আমার মনে হয়েছে”।  
রবীন্দ্রনাথের ‘লেখন’ ও ‘স্ফুলিঙ্গ’ এই দুইটি কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত কবিতাগুলো ছোট কবিতা – কিন্তু ঠিক আইন মাফিক হাইকু নয়। এই কবিতাগুলো সম্বন্ধে কবি বলেছেন – “এই লেখনগুলি সুরু হয়েছিল চীনে জাপানে। পাখায় কাগজে রুমালে কিছু লিখে দেবার জন্যে লোকের অনুরোধে এর উৎপত্তি”। অর্থাৎ এই কবিতাগুলি আসলে অটোগ্রাফ।  কবি নিজেও কোথাও হাইকু বলে দাবী করেন নি যদিও সপ্তদশ শতকের বিখ্যাত হাইজিন মাৎসুও বাশোও-র বিখ্যাত
ফুরু ইকে ইয়া
কাওয়াজু তোবিকোমু
মিজু নো ওতো  
হাইকুটিকে – রবীন্দ্রনাথ এই কবিতাটি বাংলায় অনুবাদ করে এর বিশেষত্ব সম্বন্ধে লিখেছেন –   
                “পুরোনো পুকুর,
                    জলের শব্দ,
                        ব্যাঙের লাফ।
বাস! আর দরকার নেই। জাপানি পাঠকের মনটা চোখে ভরা। পুরোনো পুকুর মানুষের পরিত্যক্ত, নিস্তব্ধ, অন্ধকার। তার মধ্যে একটা ব্যাঙ লাফিয়ে পড়তেই শব্দ শোনা গেল। শোনা গেল – এতে বোঝা যাবে পুকুরটা কী রকম স্তব্ধ। এই পুরোনো পুকুরের ছবিটা কী ভাবে মনের মধ্যে এঁকে নিতে হবে সেইটুকু কেবল কবি ইশারা করে দিলে; তার বেশি একেবারে অনাবশ্যক”।
হাইকু কবিতা সারা বিশ্বে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ইংরেজী, ফরাসি ও অন্যান্য ভাষাতেও হাইকু লেখার প্রচেষ্টা অনেকদিন আগে থেকেই চলে আসছে। প্রখ্যাত আমেরিকান কবি এজরা পাউন্ড এই হাইকু কবিতার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে কাব্যে ইমেজিসম বা চিত্রকল্পবাদ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। জাপানি ছাড়া অন্যান্য ভাষায় প্রথাগত হাইকু লেখা অসম্ভব না হলেও দুরূহ। কারণ প্রত্যেক ভাষার কবিতার নিজস্ব ছন্দ ও মাত্রা আছে। এক ভাষার কোন বিশেষ ছন্দ বা মাত্রার কবিতা ভাব অক্ষুণ্ণ রেখে অন্য ভাষায় হুবহু অনুবাদ করা বা রচনা করা একপ্রকার দুঃসাধ্য। তাই অন্যান্য ভাষায় বিশুদ্ধ হাইকুর সংখ্যা খুবই কম।   
রবীন্দ্রনাথের ‘লেখন’ ও ‘স্ফুলিঙ্গ ’ কাব্যগন্থের কয়েকটি কবিতা হাইকুর মতন তিন লাইনের কিন্তু প্রথাগতভাবে বিশুদ্ধ হাইকু নয় অর্থাৎ ৫-৭-৫ মাত্রার নয় এবং প্রকৃতির ছোঁয়া দু-একটা বাদ দিলে অধিকাংশতে অনুপস্থিত। বেশ কয়েকটি কবিতায় প্রথম ও তৃতীয় লাইনে অন্ত্যমিল আছে আর আছে ছবির বদলে এক মহান দর্শন যা কবিতা পাঠের পরে হৃদয়ে সৃষ্টি করে নিঃশব্দ অনুরনণ। যেমন –
আলো যবে ভালবেসে
       মালা দেয় আঁধারের গলে
                      সৃষ্টি তারে বলে ।।
অথবা,
আমার প্রেম রবি-কিরন-হেন
          জ্যোতির্ময় মুক্তি দিয়ে
                     তোমারে ঘেরে যেন।।
প্রথাগত বিশুদ্ধ হাইকু থেকে ভিন্ন মাত্রার ও ভাবের এই জাতীয় কবিতাকে অনেকে মুক্তক হাইকু বা উন্মুক্ত হাইকু বলে থাকেন। কিছু উন্মুক্ত হাইকু লেখার চেষ্টা করেছি। তবে এ ক্ষেত্রে হাইকুর রীতিনীতির থেকে রবীন্দ্রনাথের তিন লাইনের অন্ত্যমিলযুক্ত অনুকবিতাগুলো আমাকে বেশী অনুপ্রাণিত করেছে। কবিতাগুলোর গুনগতমান বিচারের দায়িত্ব পাঠকের।    
(১)
বসন্তের হাওয়ায়
                 কোথাও ফোটে ফুল
                                কোথাও বা ঝরে পাতা।
(২)
নিদাঘের নিস্তব্ধ দুপুর,
দাঁড়কাকের ডাক
                         নির্জনতার নির্মম প্রকাশ।
(৩)
ফুটলো ফুল
                এল মধুর লোভে
                                        অলির কুল। (৫-৭-৫)
(৪)
সুপ্ত যা সব থাকে,
                       ঘুমের মাঝে উঠলে জেগে
                                স্বপ্ন বলে তাকে।
(৫)
স্বপ্নগুলো ভাঙা,
                      জীবনপুরের সাঁঝবেলাটা
                                           অস্তরাগে রাঙা।
(৬)
স্বপ্ন ভরা মন,
                             বাস্তবেরই কষাঘাতে
                                                  হারিয়ে গেছে কখন।
(৭)
গভীর ঘুমের দেশে,
                  স্বপ্নগুলো মিলিয়ে গেছে
                                 কোথায় ভেসে ভেসে।
(৮)
পাতার ফাঁকে ফাঁকে
               নেচে নেচে টুনটুনিটা
                                 টুইট টুইট ডাকে।
(৯)
শীতের সকাল বেলা,
                           মিঠে রোদের নরম আলোয়
                                              প্রজাপতির মেলা।
(১০)
পাতার ভেলা জলে,
                        নদীর স্রোতে ভেসে ভেসে
                                               দূর দেশে যায় চলে।
(১১)
কাশ ফুটেছে মাঠ ভরাতে,
         আগমনীর সুর বাজে ঐ
                         বৈরাগীদের একতারাতে।
(১২)
ফুলের কানে কানে,
                ভ্রমর এসে গুনগুনিয়ে
                                      মাতিয়ে দিল গানে।
(১৩)
বাগানের আশপাশে,
              প্রজাপতি ওড়ে যখন
                               ফুলগুলো সব হাসে।
(১৪)
বাতাস বয়ে চলে,
                   নদীর সাথে গোপন কথা
                                      ঢেউয়ের তালে তালে।
(১৫)
পদ্মপাতায় জল,
                    ঝিকিমিকি রোদ্দুরেতে
                                         করছে টলটল।
(১৬)
জীবনস্মৃতি সুখের,
                   দিনগুলো যে চলে গেল
                                        এটাই বড় দুখের।
(১৭)
জীবন নদীর জলে,
                 দুঃখ-সুখের স্মৃতিগুলো
                                 আপনি ভেসে চলে।
(১৮)
তাকিয়ে আকাশ পানে,
                   মনটা আমার ভেসে চলে
                                            অনন্তের আহ্বানে।
(১৯)
অনন্ত আকাশে,
                       বিভাসেরা ডানা মেলে
                                   আনন্দেতে ভাসে।
(২০)
আঁধার রাতের আকাশ,
                লক্ষ তারার আল্পনাতে
                                      বিশ্বদেবের প্রকাশ।
(২১)
ঘটের মাঝে নামী,
                       ঘটটি ফেটে চৌচির হ’ল
                                            বেরিয়ে এলেম আমি।
(২২)
সর্ব্বশক্তি বিভু,
                        হৃদয় মাঝে লুকিয়ে আছ
                                              তোমায় দেখি নি কভু।
(২৩)
যা কিছু সব সান্ত,
                    তাদের মাঝেই প্রকাশিত
                                             অখন্ড অনন্ত।
(২৪)
শোন বলি মন তোরে,
                 চেষ্টা করলে খুঁজে পাবি
                                         সোনার বুদ্ধ অন্তরে।
(২৫)
আছ তুমি অন্তরে,
                            তবুও তোমায় খুঁজে বেড়াই
                                                                  দূরে দূরান্তরে।

– সনৎ কুমার ব্যানার্জ্জী

My Poems

Two Poems

Thou art That

You are infinite in time and space,
You have no body, you have no face.
You are unbound,
You are the light, you are the sound.

You are our source, you are our sink,
You are our abode – where we eat and drink.
You are the one – there is no second.
You have no beginning – you have no end.

You are the mind, you are the intelligence,
You are our ego, you are our sense.
You are the whole, we are your part,
You are our soul, reside in our heart.

You are omniscient you have omnipotence,
You are absolute truth, you have real existence.
You are pure bliss, you are pure love,
You are the supreme, you are all above.

 

Dear My Beloved

Thru the light of the candle, thru’ the tinkle of church bell,
Thru the whistle and rattle of the last night mail,
Thru the sound of siren from the harbour ships,
Thru the dream of my good night sleeps,
Thru the gusty wind from the western sea,
Thru the murmurs of the leaves of tree,
Shall I send and ever shall send,
To thou my love, O Lord, my Friend!