Month: August 2016

অসমাপ্ত এজাহার – তেথুলিয়া বিল

 

দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী

 

পুলিশ সাহেবের থানা পরিদর্শন তখনকার দিনে এক বিশেষ ব্যাপার বলে গণ্য করা হোত। সমস্ত বৎসর কোন অফিসার কতটা দক্ষতার সহিত কাজ করেছেন, বিশেষ করে থানার ইন-চার্জ অফিসার অপরাধ নিবারণে, রহস্য উদঘাটনে এবং শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারে কতদূর সাফল্য অর্জ্জন করতে পেরেছেন, তাহা থানা এলাকার বিশিষ্ট জনসাধারণের সংযোগে এবং থানার রেকর্ড পরীক্ষা করে তিনি ঠিক করতেন। শুধু তাই নয়, এই পরিদর্শনের পর সংশ্লিষ্ট কর্মচারী সম্বন্ধে তিনি যে ধারণা করে নিতেন, তাহা লিপিবদ্ধ করে রাখতেন উক্ত কর্মচারীর ‘সি সি রোল’ বলে কথিত রেকর্ডে। এই মন্তব্যের ভালোমন্দ হবে পুলিশ কর্মচারীর উন্নতি বা অবনতির সহায়ক।

সে যাহা হোক কয়েকদিন পরই পুলিশ সাহেব তাঁর দলবল নিয়ে এসে গেলেন। দলবলের মধ্যে পুলিশ সাহেব নিজে, রিভলবারধারী দুজন দেহরক্ষী, আর একজন স্টেনোগ্রাফার। তখনকার দিনে ইংরেজ পুলিশ সাহেবরা শুধু ক্রাইম অর্থাৎ অপরাধের বিষয়টাই ভাল করে দেখতেন আর অন্যান্য বিষয় খুবই মামুলি ধরণের। তাই প্রথম দিন ভালই কেটে গেল। দ্বিতীয় দিনের ইন্সপেকশন খুব ভাল হচ্ছিল না। কারণ জটিল কেসগুলি মোয়াজ্জম কোনদিনই খুব ভালভাবে তদন্ত করে নি। আগেই বলেছি ওর থানার কাজে কোন উৎসাহই ছিল না। গানবাজনা, খেলাধূলা নিয়ে মেতে থাকতে খুব ভালবাসত। তাই পুলিশ সাহেবের জিজ্ঞাসাবাদ সুবিধা করে উঠতে পারছিল না। বিকেলের দিকে শ্যামবাবু প্রভৃতি কয়েকজন ভদ্রলোক এলেন সাহেবের সাথে দেখা করতে। তারাই প্রস্তাব করলেন পরদিন বিকালের দিকে পাখী শিকারের কথা। পুলিশসাহেব শুনেতো খুব খুসী। ইন্সপেকশনের ফাইনাল কমেন্টস ভাল হয়ে গেল। তারপর চলল শিকারের তোড়জোড়। ভাল দুটি ডিবিবিএল গান ও বিশ রাউন্ড গুলি যোগাড় হয়ে গেল। ঠিক হোল আমি সাহেবের সঙ্গে যাব সাইকেলে। দুটি ভাল সাইকেল নিয়ে আমরা বেলা দুটার পর রওনা হলাম। প্রায় সাড়ে তিনটায় তেথুলিয়া কাছারিতে পৌঁছে গেলাম।

তেথুলিয়ার এই বিখ্যাত বিল কাছারি থেকে বেশী দূর নয়। দৈর্ঘে প্রায় তিন মাইল এবং প্রস্থে হবে এক মাইলের উপর। অনেক বিলে যায়গা আমি আমার চাকুরী জীবনে দেখেছি। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের জেলায় জেলায় ঘুরতে হয়েছে সরকারী কাজের উপলক্ষে কিন্তু এত পাখীর সমাবেশ আর কোথাও দেখলাম না। সমস্ত বিলের উপর কে যেন ধূসর রঙের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। নড়ে উঠছে সমস্ত চাদর, নানা রকম রঙের বাহার। সূর্যের পড়ন্ত রোদ বিলের জলের উপর পড়ায় এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে যেন আরও সহস্র গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পাখীর কলকল শব্দে সমস্ত বিলের আশপাশ মুখরিত। কি জীবন্ত আনন্দ। শামুক, গুগলি খেয়ে চলেছে মনের সুখে। ওদের এই অপূর্ব্ব আনন্দের সমারোহ দেখে আমিও একজন তার অংশীদার হয়ে গেলাম। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই বিষাদে মন ভরে গেল এই ভেবে যে এখনই এক ভীষণ আঘাতে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ছাড়খার হয়ে যাবে। কত রকমের হাঁস – বালিহাঁস, লেঞ্জা হাঁস, পাতিহাঁস, রাজহাঁস। আরও কত নাম না জানা পাখী।

পরিযায়ী পাখীর ঝাঁক – বাইক্কা বিল, মৌলভী বাজার (বাংলা দেশ) 

http://www.gettyimages.in/detail/photo/migratory-birds-in-bangladesh-royalty-free-image/168321509

পূর্ব্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী কাছারির নায়েব বিধুবাবু বিলের একটি যায়গা ঠিক করে নিয়ে জলার কিছু যায়গায় কলাগাছের ভেলার উপর কয়েকটি মেকি ঝোপ বানিয়ে রেখেছে। উদ্দেশ্য – বিলে পাখী শিকারের প্রথা অনুযায়ী একজনকে জলে নেমে কিছুটা এগিয়ে যেতে হবে ঐ সব ভাসমান ঝোপের আড়ালে বন্দুক নিয়ে, যাতে পাখীরা বুঝতে না পারে। এইভাবে বেশ কিছু এগিয়ে গিয়ে গুলির রেঞ্জের মধ্যে পৌঁছে গেলে পাখীদের উপর পর পর দুটি গুলি করা হবে। অপরদিকে একজন আর একটি বন্দুক নিয়ে বিলের ধারে একটি নির্বাচিত যায়গায় তৈরি থাকবে। উভয় শিকারি দৃষ্টি বিনিময় করে নিয়ে প্রথমে গুলি করবে যে জলে থাকবে। গুলি খেয়ে পাখীরা যেমন চক্রাকারে উপড়ে উঠবে তখনই সুবিধা হবে তীর থেকে গুলি করা। তাকে বলে ফ্লাইং শট। যা হোক, সাহেবকে তীরে দাঁড় করিয়ে দিলাম বন্দুক দিয়ে। আমি গুটি গুটি এগিয়ে গেলাম ঝোপের আড়ালে। পোসিসন নিয়ে তাকিয়ে দেখি সাহব আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ইশারার সঙ্গে সঙ্গেই আমি পর পর দুটি গুলি চালিয়ে দিলাম। সাহেবের গুলির শব্দ আমি শুনতে পাই নি। কারণ আমার গুলি ছোঁড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক প্রলয় কাণ্ড ঘটে গেল। সহস্রাধিক পাখী এক সঙ্গে চক্রাকারে জল থেকে আকাশের দিকে উঠে গেল। এই উঠার সঙ্গে সঙ্গে এমন এক প্রবল গতিবেগের সৃষ্টি হোল  যে ভেলার বাঁশের খুঁটি না ধরে ফেললে হয়ত আমাকে কয়েক হাত জলের উপর উঠিয়ে ফেলত। নিমেষের মধ্যে আমাদের মাথার উপরে সমস্ত আকাশ যেন মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেল আর সেই সঙ্গে সঙ্গে এই অসংখ্য পাখীর সন্মিলিত ডাকে আকাশ বাতাস কিছুক্ষণের জন্য মুখরিত হয়ে উঠল। সে দৃশ্য আজ এতদিন পর লিখে প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব না। পরিবেশ কল্পনা করে কেউ বাংলাদেশের কোন বিলে পাখী শিকার করে থাকলে বুঝে নিতে পারবেন। কিন্তু এই কালবৈশাখীর মেঘাচ্ছন্নতা কয়েক মিনিটের জন্য। বহু উপরে বার দুই তিন চক্রাকারে ঘুরে এই বিশাল পক্ষীকুল কোথায় মিলিয়ে গেল। গুলি লেগে অনেক পাখী বিলের জলের উপর পড়ে যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গেই শিকারি কুকুর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাখায় কামড়ে ধরে এক এক করে টেনে নিয়ে এল। গুনে দেখা গেল উনিশ-কুড়িটা হবে। নায়েব বাবুর লোক পাখীগুলির পেট কেটে নুন ভরে সেলাই করে দিল। তিন-চারটি পাখীর গায়ে কোথাও কোন জখম নেই। ওগুলি গুলির শব্দে বোধ হয় আতঙ্কে পড়ে গিয়েছে। কি সুন্দর সতেজ ভাব, ধূসর রঙ, গলায় নানা রঙের মালা, লাল ঠোঁট, চোখ বুজে পড়ে আছে। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল।

নিজের এবং বহু লোকের জীবন রক্ষা করতে যেয়ে নাজিরনগর থানার চাতল পারে গুলি চালিয়ে কিছু সংখ্যক দাঙ্গাকারীকে হতাহত করতে হয়েছিল। কিন্তু তখন আমার এতটুকুও মন খারাপ হয় নি – কারণ সেটা ছিল আমার কর্তব্য কর্মের অন্তর্ভূক্ত। তারপর আমার চাকুরী জীবনে আরও দুবার ডাকাত ধরতে যেয়ে গুলি করতে হয়েছে। কিন্তু পাখী শিকারের অদম্য স্পৃহা তেথুলিয়া বিলের জলে শেষ করে দিয়ে এসেছি। আমার অংশের পাখীগুলি মোয়াজ্জম হোসেন ও অন্যান্য বন্ধুগণকে বিলি করে দিলাম। অর্দ্ধসামরিক বাহিনীতে কাজ করেও নিরীহ পাখী শিকারের হিংসা প্রবৃত্তি আর যাতে না জাগে তার জন্য ভগবানের নিকট প্রার্থনা করেছি। এবং ঠাকুর সে কথা শুনেছেন। কারণ পাখী শিকার আর কোনদিনই আমি করি নি।       

 

অসমাপ্ত এজাহার – ভুটো

দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী

 

ভুটিয়া ঘোড়া (ইন্টারনেট ছবি) 

মোহনগঞ্জ থানায় মোয়াজ্জম হোসেনের একটি বড় ঘোড়া ছিল। এলাকার যে সমস্ত দিকে জেলা বোর্ডের ভাল রাস্তা আছে, সেদিকটায় যেতে হলে এটাকেই নিয়ে যাওয়া হোত। জলা যায়গা বলে আর অন্য সময়ে বেশীর ভাগ এলাকায় ভাল রাস্তা ছিল না। বর্ষার সময়ে সব যায়গাতেই নৌকায় যাওয়া হোত। আর অন্য সময়ে ক্ষেতের আল, বিলের ধার (কান্দা), ইউনিয়ন বোর্ডের সরু রাস্তা এই ছিল যাতায়াতের পথ। সরু পথের প্রায় যায়গাই ভাঙা আর সেখানে বারোমাসই জল থাকে। তাই এই ভাঙা যায়গার উপর দিয়ে মাঝে মাঝে বাঁশের সাঁকো করে দেয় বোর্ড থেকে। বড় ঘোড়া এই সব যায়গায় নিয়ে যাওয়া খুবই অসুবিধা। তাই তেথুলিয়া কাছারি থেকে বিধুবাবু আমাদের ব্যবহারের জন্য একটি সাদা ভুটিয়া ঘোড়া দিয়েছিলেন। এটা নিয়ে চলতে খুব আরাম বোধ হোত। কিছু কিছু রাস্তাঘাটও ওর বেশ জানা ছিল। আমরা ওকে আদর করে ডাকতাম – “ভুটো”। টুকটুক করে চলত। কোন পথই তার অগম্য ছিল না। আমাকে খুব ভালবাসত। ইউনিফর্ম পরে ওর কাছে এসে দাঁড়ালেই ও বুঝে নিত বাইরে যেতে হবে। ঘাড়, গলা চেটে দিত, মুখামৃত ছড়িয়ে দিত পোশাকের উপর। ভুটোকে কিন্তু কোনদিনই আমি ভুলতে পারব না। ভালবাসার মর্য্যাদা ও রক্ষা করেছিল আমাকে এক ভীষণ বিপদের মুখ থেকে রক্ষা করে। সেই কথাই বলছি।

একটানা দশ বছর পূর্ব্ববঙ্গের বিভিন্ন থানায় কাজ করেছি। সরকারী কর্ত্তব্য কার্য সম্পাদনে শিথিলতা এলেই বিবেকে বাঁধত। তাই কারও কোন উপদেশ নির্দ্দেশ মানা যেন স্বভাববিরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই স্বভাব রয়ে গেল পশ্চিমবঙ্গে এসেও। সবাই বলত একগুঁয়ে। এই একগুঁয়েমির জন্য কতবার যে কত বিপদের সম্মুখীন হয়েছিটার ঠিক নেই। নাজিরনগরের দাঙ্গা থেকেতো অনায়াসেই সরে আসতে পারতাম। উপদেশতো পেয়েছিলাম স্থানীয় বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে। কুলীয়ার চরের নৈশ অভিযানে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ঝরের মধ্যে পড়ে আত্মরক্ষার প্রচেষ্টাওতো অনায়াসে এড়িয়ে যাওয়া যেত। পরবর্ত্তীকালে এরূপ ঘটনা হয়েছে অনেক তারই কয়েকটি লিখে রাখলাম।

ময়মনসিংহ জেলার পুলিশ সুপার তখন এইচ ই সাবাইন – আই বি থেকে বদলি হয়ে ময়মনসিংহ জেলার চার্জ নিয়েছেন। সিনিয়র চাকুরীতে। কলকাতা, হাওড়া ও চব্বিশ পরগণা জেলাতেই বেশী কাজ করেছেন। মফঃস্বল জেলায় এসে ঠিক মন বসাতে পারছেন না। প্রায়ই থানা পরিদর্শনে বেরুচ্ছেন। হঠাৎ একদিন কাগজ পেয়ে গেলাম। সাহেব মোহনগঞ্জ থানা পরিদর্শনে আসছেন। আমরাতো অবাক। ব্যাপার কি? সাধারণত ইস্ট ডিভিশনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারেরইতো আসার কথা। যা হোক ওসব ভেবে কোন লাভ নেই। যথাসাধ্য রেকর্ডপত্র ঠিক করা গেল। হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি এসে গেল। অবশ্য এতে আবগারি দোকানের মালিক শ্যামবাবুর কৃতিত্ব বেশী। অভিজ্ঞ লোক। প্রস্তাব করলেন পরিদর্শনের তৃতীয় দিন মোহনগঞ্জের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এক সভায় সাহেবের সাথে মিলিত হবেন তাঁকে অভিনন্দন জানাবার জন্য। আর চতুর্থ দিন তেথুলিয়া বিলে নিয়ে যাওয়া হবে পাখী শিকারে। ঠিক হোল আমি তেথুলিয়া কাছারি গিয়ে বিধুবাবুর সাথে আলাপ করে সব বন্দোবস্ত করে আসব। সেই অনুসারে সাহেব আসার দিন দুই আগে বেলা প্রায় এগারটার সময়ে ভুটোকে নিয়ে রওনা হয়ে গেলাম। বিকাল প্রায় চারটার সময়ে তেথুলিয়া কাছারি পৌঁছে গেলাম। বিধুবাবু কাছারিতেই ছিলেন। উনি শুনে খুব খুশী হলেন এবং শিকারের দিন সব বন্দোবস্ত করে রাখবেন বললেন।

কথায় কথায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। আমাকে যে ঐ দিন যত রাতই হোক থানায় ফিরতে হবে – সে কথা ভুলে গেছিলাম। আমি উঠে দাঁড়াতেই বিধুবাবু রেগে বললেন – “তুমি যদি যাবেই তবে আরও আগে রওনা হলে না কেন? কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার নেমে আসবে এই কুখ্যাত বিলে। প্রায় চার মাইল পথ যেতে হবে বিলের ধার ধরে। স্থানে স্থানে একাধিক পথ রয়েছে। ভুল করলে রাত্রে থানায় ফিরতে পারবে কি না সন্দেহ। বিধুবাবুর স্ত্রীও শুনে নিষেধ করলেন। বললেন -“কাল খুব ভোরে রওনা হলেই হবে। সামান্য সময় দেরী হলে আর ভারতবর্ষ থেকে ইংরেজ রাজত্ব চলে যাবে না। ওদের যখন যাবার সময় হবে তখন পুলিশ কেন মিলিটারিও ধরে রাখতে পারবে না”।

আমি হেসে বললাম – “তা নয়। জানেন তো পুলিশ সাহেব নতুন এসেছেন জেলায়, কি রকম হবে জানি না। থানায় অনেক কাজ করা বাকি আছে। সুরেনদা কিরূপ খেয়ালি লোক। মোয়াজ্জমের অসুবিধা হয় আমি চাই না। তা ছাড়া আমার নিজেরও ভবিষ্যৎ আছে”। আমার সেই একগুঁয়েমি স্বভাবটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। “থানায় যখন বলে এসেছি তখন যাবই”।

বিধুবাবু আর আপত্তি করলেন না। খুব তাড়াতাড়ি করে কিছু খাইয়ে দিলেন। এখন সমস্যা হোল ভুটোকে নিয়ে। ভুটো এই কাছারির একজন সভ্য। এখানে তার এক সাথী আছে। তার সঙ্গে অনেকদিন পর দেখা হওয়ায়, তাদের নিভৃত আলাপ তখনও শেষ হয় নি। তা ছাড়া ও ধরে নিয়েছিল এখানে রাত্রে থাকব। তাই যেতে একটু আপত্তি। কাছে এসে ঘাড়, মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম – “চল থানায় যাব”। ভুটোর মেজাজ গরম হয়ে গেল। আমার মুখে চোখে ওর মুখামৃত ছড়িয়ে দিয়ে ঘোরতর আপত্তি প্রকাশ করল। আমি ওর কানের কাছে মুখ এনে আদর করে বললাম – “চল না – থানায় অনেক কাজ আছে।”

এই বলে উঠে বসলাম। বিধুবাবু একটা লোক দিয়ে কিছুদূর বিলের পথে এগিয়ে দিল। কিছুটা চলার পর বিলে ফিকে জ্যোৎস্নার মত দেখা গেল। গ্রাম দেশ, তাও আবার নির্জ্জন বিলের যায়গা। তেথুলিয়ার হাটের দিন তবু কিছু লোক চলে এবং আসে পাশের রাস্তা ধরে নিজ নিজ গ্রামে ঢুকে পড়ে। আজ কিন্তু তাও দেখছি না। না – ঐ তো দূরে আলো দেখা যাচ্ছে। নিশ্চয়ই লোক চলছে। আমি ভুটোর গতিবেগ বাড়িয়ে দিলাম। আলোটা মাঝে মাঝে নিভে যাচ্ছে। হতে পারে কোন ঝোপঝাড়ের আড়াল হেতু ওরূপ হচ্ছে। একটা যায়গায় এসে দু’তিনটি রাস্তার সংযোগ স্থলে এসে পড়লাম। কই দিনের বেলা তো এই যায়গাটা দেখি নি। ভুটো আপনা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আবার সেই আলো। অনোন্যপায় হয়ে আমি সেই আলোর দিকেই ভুটোর গতি নির্দ্দেশ করে দিলাম। ভূতও কিন্তু মুখামৃত ছড়িয়ে আপত্তি জানাল। আমি মস্ত এক ভুল করে বসলাম। ওকে বুঝতে না পেরে জোড় করে ওকে সেই আলোর দিকেই চালিয়ে দিলাম।

আধ ঘণ্টা চলার পর এখন সেই আলো কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল। একটা বিষয় তখন আমার মনে হোল এই যে এত জোড়ে ঘোড়া চালিয়ে এলাম আলোতো সেই সমান দূরে থেকে যাচ্ছিল। এখন আর দেখছি না কেন? আর পথই বা পাচ্ছি না কেন? তা হোলে কি আলেয়ার আলো? রাত্রে বিলে তো এরূপ হামেশাই দেখা যায়। পথচারী একে দেখেই চলতে চলতে শেষে পথ হারিয়ে বিলের জলে নেমে পরে আর উঠতে পারে না। পরে আতঙ্কে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এরূপ একটি অপঘাত মৃত্যুর তদন্তও আমি করেছি । আমি ভুটোকে থামিয়ে দিলাম। পোশাক পরা, বিশ্বস্ত ঘোড়ার উপর – সঙ্গে রয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র। মনের জোড় হারালে এই বিলে সারা রাত্রেও আর পথ পাব না। আবার আলো। এবার আর ভুল নয়। বুঝে নিয়েছি। ভুটোর সমস্ত শরীর ঘেমে গিয়েছে। আমার ইউনিফর্ম এই শীতেও ভিজে গিয়েছে। বলগা টেনে ঘুরিয়ে দিলাম ভুটোকে। ও বুঝতে পারল – চিনে চলে এল সেই রাস্তার সংযোগস্থলে। তারপর আমি আর ওকে কোন নির্দেশ না দিয়ে ইচ্ছামত চলতে দিলাম। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক দেখে নিয়ে আপন ইচ্ছায় চলতে লাগল। কতক্ষণ চলেছে জানি না। কারণ তখন আমার মাঝে মাঝেই তন্দ্রায় চোখ বুজে আসছিল। রেকাবের ভিতর পা ঢুকিয়ে দিয়ে, বলগা শক্ত করে হাতে বেঁধে দিলাম। পরে গেলে যেন ভুটো বুঝতে পারে। অনেক্ষণ চলার পর ভুটো শব্দ করে দাঁড়িয়ে গেল। চেয়ে দেখি একটি বড় বাড়ি। একজন বৃদ্ধ মুসলমান হ্যারিকেন হাতে করে বাইরের দিকে আসছে। আমাকে পোশাক পরা ঘোড়ার উপর দেখে হকচকিয়ে গেল। বললাম – “মিঞা সাহেব এটা কোন গ্রাম”?

বলল -“অতিথপুর – বারহাটা থানা”।

“মোহনগঞ্জ থানা কতদূর?”

“ক্রোশ ছয়েক হবে”। সামনেই অতিথপুর রেলস্টেশনের সিগন্যাল লাইট দেখা গেল। বললাম – “আমি মোহনগঞ্জ থানার ছোট দারোগা। বাংলা ঘর আছে?  রাত্রে থাকব”।

এই বলে ঘোড়া থেকে নেমে পরলাম। ভুটো চুপচাপ দাঁড়িয়ে চোখ বুজল।  মিঞা সাহেব সেলাম জানিয়ে আমাকে বাংলা ঘরে নিয়ে এল। তারপর একটি চাদর নিয়ে এসে তক্তপোষের ওপর পেতে দিল। বলল – “রাত্রি আর বিশেষ নেই। আমি আজানের নমাজের জন্য মসজিদে যাই”। এই বলে সে চলে গেল। আমি চোখ বুজে একটু ঘুমোতে চেষ্টা করলাম। ট্রেনের শব্দ শুনে বুঝলাম ভোর চারটার ট্রেন মোহনগঞ্জ থেকে ছেড়ে এসে অতিথপুর পেরিয়ে গেল। ট্রেনের মত আমার মনের মধ্যে আজ রাতের অভিযানের সম্ভব অসম্ভব চিন্তারাশি হু হু করে প্রবেশ করে আবার ঐ ট্রেনের মতই বেরিয়ে যেতে লাগল। কাছেই মসজিদ থেকে আজানের সুউচ্চ রব ভেসে আসছিল। এই বাড়িরই মালিক মিঞা সাহেব তার প্রাণের আবেগ তারস্বরে খোদাতাল্লার দরবারে পৌঁছে দিচ্ছে। সেই স্বর অনুসরণ করে আমার মনও যেন চলল কোন এক অজানা লোকে। বিধুবাবু ও তার স্ত্রী এসে গেছেন। শাসনের ভঙ্গীতে বলছেন – “কত নিষেধ করলাম, শুনলে না। এখন বুঝলেতো বয়স্কদের কথা মানতে হয়। সেই থানায়তো যেতে পারলে না। কত কষ্ট পেলে। তবে ভগবানের কৃপায় এ যাত্রা রক্ষা পেয়ে গেছ। তুমি যে অশরীরী আত্মার পাল্লায় পড়েছিলে, তোমার উপর যাঁর অনুগ্রহ আছে সে যে সেই আত্মার চেয়ে কত শক্তিশালী তার প্রমাণ হয়ে গেল”।

বিধুবাবুর স্ত্রী আমার শিয়রের কাছে বসেছিলেন। বললেন -“এই একগুঁয়েমির ফল এই নিয়ে কতবার হোল?”

বললাম- “এই তিনবার, তিনবারই যমরাজার প্রাসাদের সিংহদ্বারে আমার অদ্ভুত পোশাক দেখে ঢুকতে দেয় নি”।

“তোমাকে ছেড়ে দিয়ে আমরা কেউ ঘুমোতে পারি নি, বুঝলে তাই গরুর গাড়ী করে পিছন পিছন ছুটে এসেছি। ভুটো তোমাকে নিয়ে সারা রাত ঘুরেছে। ও যে কিছুতেই রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিল না। আমরা তোমাকে ধরতে না পারলেও আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষা তোমাকে স্পর্শ করেছিল”। বিধুবাবু ও তার স্ত্রী চলে গেলেন। আমি তাদের ভালবাসার গভীরতা অনুভব করছি।

ধ্যানমগ্ন রাত্রি, ফিকে জ্যোৎস্নায় তার অঙ্গের শোভা বিকীর্ণ হচ্ছে। সম্মুখে বিলের জলরাশি। তাতে বহুযুগের পদ্ম ও অন্যান্য জলজ লতা গাছ। প্রস্ফুটিত ফুল নিয়ে অপেক্ষা করছে ধ্যান শেষ হলেই অর্ঘ রচনা করবে। কোথাও কোন সাড়া শব্দ নেই। আলেয়ার আলোর আরতি আমাকে পথ দেখাচ্ছে। পাছে কেউ ধ্যান ভঙ্গ করে তাই আমি অশ্বপৃষ্ঠে সমস্ত বিল পরিক্রমা করছি। হঠাৎ আজানের দীর্ঘ নির্ঘোষে জানিয়ে দিল ধ্যান শেষ। এই বার ছুটি।

বাইরে কাদের কথায় ঘুম ভেঙ্গে গেল। দেখি দীর্ঘ পক্ব শ্মশ্রু বাড়ির মালিক আমার দিকে তাকিয়ে দেখছেন। ঘুমের রেশ তখনও কাটে নি। আমার যেন মনে হোল এই দরবেশই আমাকে সেই অশরীরী আত্মার প্রকোপ থেকে মুক্ত করে তাঁর বাড়ি এনে আশ্রয় দিয়েছেন। দুইজন চৌকিদার এসে গেছে। একজন ভুটোকে মাঠে নিয়ে যেয়ে কচি ঘাস খাওয়াচ্ছে। আর একজন হাত মুখ ধোবার জল নিয়ে এল। চৌকিদারের থেকে জানলাম বাড়ির মালিকের নাম আফসারুদ্দিন হাজী। দুবার হজ করেছেন। তবু নিজে চাষাবাদে এখনও ছেলেদের সাহায্য করেন। বড় গৃহস্থ। এরূপ সৎলোক এ তল্লাটে নেই। মুখ ধোওয়া শেষ হয়েছে, দেখি হাজী একটি ছেলেকে সঙ্গে করে তিন চারটি পাত্র করে দুধ, মুড়ি, গুড় ইত্যাদি নিয়ে এসেছেন। খেতে খেতে আমার মুখে নৈশ অভিযানের গল্প খুব মন দিয়ে শুনলেন। বললেন – “দারোগা সাহেব এরূপ কোনদিন আর করবেন না। এই বিলে প্রতি বৎসরই দুই-তিনটি দুর্ঘটনা হয়। পুলিশ হলেও তো আপনাদের ভিতর মানুষের আত্মা রয়েছে। আপনার অল্প বয়স…” ইত্যাদি।  

আমি হাজী সাহেবকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানালাম। ভুটোকে নিয়ে এল। সারা রাত্রির ধকল সে সামলে নিয়েছে। এখন বেশ তাজা। বুঝলাম হাজীসাহেব ওকেও ভাল খাবার দিয়েছে। আমার কাছে এসে আমাকে আদর করল। আমিও প্রতিদান করে উঠে বসলাম। প্রায় দশটায় থানায় পৌঁছে গেলাম। মোয়াজ্জম দেখেই বলে উঠল -“আমি জানি ঠাকুর, তুমি তেথুলিয়া গেলে আর আসতে চাও না। কথা শুনে আমার উত্তর দেবার প্রবৃত্তি হোল না। ভুটোকে ছেড়ে দিয়ে বাসায় চলে এলাম।

অসমাপ্ত এজাহার – মেঘনার জলে

দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী

 

ইংরেজী ১৯৩৯ সালের অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে কালিহাতি থানা থেকে আমার বদলি হয়ে গেল ভৈরব থানায়। সাধারণত কোন থানা থেকে কেউ তিন বছরের আগে বদলি হয় না। এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয় তখনই যখন কোন কর্মচারী সেখানে থাকার অযোগ্য বলে বিবেচিত হয় বা যদি সে উচ্চপদে উন্নীত হয় এবং সেখানে কোন যায়গা খালি না থাকে। আমার বেলায় কিন্তু এ দুটোর একটিও ঘটে নি। বরঞ্চ কালিহাতিতে আমার কাজকর্ম বেশ ভালই চলছিল। তা হ’লে কেন এমন হ’লসে কথাই বলি।

কালিহাতি থানায় যোগ দেবার কিছুদিন পরই আমি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হই। প্রত্যেক মাসের অমাবস্যা বা পূর্ণিমা তিথিতে তিন চার দিনের জন্য এই অবাঞ্ছিত অতিথি আমার হাড়মজ্জা কাঁপিয়ে দিয়ে বিদায় নিত। আমার কাজের যেমন কোন সময় ছিল না তেমনই তার আমার সাথে ভাব করারও কোন যায়গা বাসার বিচার ছিল না। হাসপাতালে বা ছুটিতে যাওয়া আমার কখনও মনঃপূত হ’ত না। তাই শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করেও কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলাম। ১৯৩৯ সালের অগাস্ট মাসের মাঝামাঝি অতিরিক্ত পুলিশ সাহেব মিঃ আর সি পোলার্ড এলেন থানা পরিদর্শনে। তিনি আমাকে ও আমার অসুস্থতার রিপোর্ট দেখে আমি কেন সদর হাসপাতালে যাই নি তার জন্য ভর্ৎসনা করলেন। বড় সাহেবও অসুস্থতা সত্ত্বেও আমার কাজের সপ্রশংস বর্ণনা দিলেন। পুলিশ সাহেবের কিন্তু মোটেই ইচ্ছা হ’লনা যে আমি আর কালিহাতি থাকি। তাই তিনি কোন স্বাস্থ্যকর থানায় আমার বদলির সুপারিশ করলেন, হেড কোয়ার্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সাহেবের কাছে। একমাসের ভেতর আমার বদলির হুকুম এসে গেল।

ভৈরব। ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত এই যায়গা। পূর্ব্ববঙ্গের (অধুনা বাংলাদেশের) একটি বিখ্যাত নদী বন্দর। মেঘনা নদীর তীরে – জেলার শেষ প্রান্তে। নদীর অপর তীরে কুমিল্লা ও টিপারা জেলার ব্রাহ্মনবাড়িয়া মহকুমার আরম্ভ। আর এদিকে  ঢাকা জেলা। খুবই স্বাস্থ্যকর ও মনোরম স্থান। এ বন্দরে দেখেছি পাঁচশ মণ, হাজার মণ মাল বোঝাই বড় বড় নৌকা, যাত্রীবাহী স্টিমার লঞ্চের যাতায়াত। মালবাহী এই নৌকাগুলো ছিল এক একখানি ছোটখাটো বাড়ির মতন। পশ্চিমের বাণিজ্য প্রধান যায়গা দানাপুর, পাটনা, মুঙ্গের, আড়া, বালিয়া জেলা থেকে বোঝাই করে নিয়ে আসত নানা রকমের ডাল, মশলা, লঙ্কা, তামাক, পাথরের থালাবাসন, আরও কত কি। বিশেষ করে বর্ষাকালে কত বড় বড় নদী পেরিয়ে এসে ঢুকে পড়ত মেঘনায়। তারপর ভৈরবের বিশাল খাঁড়িতে নোঙর ফেলে মাল খালাস করত। ভরে যেত বড় বড় ব্যাবসায়ীর গুদাম। নাখোদা আর বি,এম দাসের নাম আমার মনে আছে – এদের নিঃস্বার্থ দানের জন্য। এরা যে শুধু মাল খালাস করত তা নয়, বোঝাই করে দিত কত রকমারি জিনিষ। চলে যেত ফিরে যে যার যায়গায়। গোটা আসাম প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে সিলেট, সুনামগঞ্জ, শিলচর, ধুবরী, তেজপুরে চালান হ’ত তামাক, মশলা ইত্যাদি। বোঝাই করে নিয়ে আসত কমলা, আনারস। সেগুলো ওয়াগন বোঝাই করে রেলযোগে পাঠান হ’ত কলকাতায়। রেলপথে ও নদী পথে দুদিক থেকেই যোগ ছিল ঢাকা, নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে। চালানি ব্যাবসায়ে ভৈরবের উল্লেখযোগ্য প্রাধান্য ছিল।

মেঘনা নদী 

http://bdaffairs.com/meghna-river/

বাণিজ্যপ্রধান যায়গায় যা সাধারণতঃ হয়ে থাকে এখানেও তার কোন ব্যতিক্রম ছিল না। রেলপথে, স্থলপথে ও জলপথে সর্ব্বত্র ছিল চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি ও আরও কত রকমের অপরাধের প্রাদূর্ভাব। তাই ভৈরব থানায় পুলিশের সংখ্যা ছিল অন্যান্য থানা থেকে অনেক বেশী। রেলপথ দেখত রেলপুলিশ। জলপুলিশ সংস্থা উঠে যাবার পর থেকে নদীপথে পাহাড়ার বন্দোবস্ত করতে হ’ত ভৈরব থানা থেকে। এর জন্য থাকত বড় হাউসবোট। এতে থাকত কয়েকজন কনস্টেবল, বন্দুক, গুলি, লাঠি ইত্যাদি। একে বলা হ’ত ‘ফ্লোটিং আউটপোস্ট’ (এফ ও পি) অর্থাৎ ভাসমান পুলিশ ফাঁড়ি। এটা থাকত কোন নিরাপদ যায়গায় নোঙর করা। বড় নৌকা থাকত নদীতে পেট্রল দেবার জন্য। রেল এলাকার মতন নদীর এলাকা ছিল পনের ষোল মাইলের মত দীর্ঘ। থাকার জন্য কোন ফ্যামিলি কোয়ার্টার ছিল না। তাই এখানকার চার্জে থাকত একজন ব্যাচেলার অফিসার। কাজকর্মের মধ্যে হ’লশুধু নৌকা নিয়ে চার্ট অনুসারে চলা ও নদীর তীরের উভয় ধারে যে সব দাগী চোর, ডাকাত থাকত তাদের গতিবিধি দেখা। উদ্দেশ্য মালবাহী ও যাত্রীবাহী নৌকার নিরাপত্তা।

ভৈরব থানায় জয়েন করে আমাকে নিতে হ’ল এই এফ ও পি-র চার্জের দায়িত্ব। এই ষোল মাইল নদীপথ কিন্তু চলে গেছে ময়মনসিংহ  ও টিপারা জেলার কয়েকটি থানা এলাকার ভেতর দিয়ে। এই থানাগুলির মধ্যে ছিল ময়মনসিংহ জেলার ভৈরব, বাজিতপুর, কুলিয়ার চর, অষ্টগ্রাম আর টিপারা জেলার নবীগঞ্জ, সরাইল ও নাসির নগর থানা ইত্যাদি। এর প্রত্যেকটিতেই নদীর ধারে থাকত দুর্দ্ধর্ষ সব ডাকাতের দল, এদের বলা হ’ত জলদস্যু বা রিভার ড্যাকয়েটস। বেশীর ভাগ ছিল যাতে মুচী বা রিষি। এই রিষি গ্যাং-এর দল দিনের বেলায় করত নিজেদের জাত ব্যবসা। রাত্রে কিন্তু জেগে উঠত এদের নিষ্ঠুর অপরাধ প্রবৃত্তি। দশ বারো জন মিলে মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছিপ নৌকা বা তীব্র গতিতে চলতে পারে এরূপ ধরণের নৌকা নিয়ে বেড়িয়ে পড়ত। প্রত্যেকের হাতে থাকত নৌকা চালানোর জন্য বৈঠা। নদীর কোন খাঁড়িতে অন্ধকারে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকত সুযোগের অপেক্ষায়। তারপর কোন যাত্রীবাহী বা মালবাহী নৌকা একা পেলে তীব্র বেগে ছুটে যেয়ে অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ত নৌকার ওপর। মারধর করে আর বাঁধা দিলে খুন পর্য্যন্ত করে মূল্যবান জিনিষপত্র নিয়ে তেমনই তড়িৎ গতিতে মিলিয়ে যেত ঘন অন্ধকারে। খবর পেয়ে পুলিশ আসতে আসতে এরা লুঠকরা মালপত্র কোথায় যে লুকিয়ে ফেলত তার হদিশ করতে পুলিশকে হিমসিম খেয়ে যেতে হোত। তাই নদীবন্দরে জানিয়ে দেওয়া হ’ত নৌকা চালাতে হোলে , বিশেষ করে রাত্রে, সব নৌকা একসঙ্গে যেতে হবে ‘কনভয়’ বা ‘বহর’ করে। এই সব ডাকাতদের রাত্রে গতিবিধি লক্ষ্য করা, একা চলতে শুরু করেছে এরূপ কোন নৌকাকে বন্দরে আটকে দেওয়া এসব এফ ও পি বা জলপুলিশের কাজ।

মেঘনা নদীর ওপর দিয়ে ভৈরব ও আশুগঞ্জকে যোগ করে ভৈরব রেল ব্রীজ বা সেতুর নির্মান কাজ কয়েক বছর আগেই শেষ হয়েছে। সবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে। আন্তর্যাতিক পরিস্থিতি তখন খুবই খারাপ চলছিল। তাই এই রেল সেতুরও খুব গুরুত্ব ছিল বলে সশস্ত্র একটি পুলিশের দল সব সময়েই এই রেল সেতু পাহারা দিত। এদের ডিউটির তত্ত্বাবধান করার দায়িত্ব ছিল ‘এফ ও পি ইন চার্জ’ হিসাবে আমার ওপর।

ভৈরব রেল ব্রীজ 

http://www.panoramio.com/photo/16072520

আমি যখন ভৈরব থানায় এলাম তখন ঢাকায় হিন্দু মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলছিল। তার তিক্ত প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রামে গ্রামেও। কিছদিন আগে ভৈরব ষ্টেশনের কাছে এক বিস্তির্ণ মাঠে তদানীন্তন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক এসে এক বিরাট জনসভায় বক্তৃতা দিলেন যার বিষয় বস্তু ছিল যে হিন্দুরা মুসলমানদের দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। তারা ভারতবর্ষের মুসলমান প্রধান যায়গাগুলো নিয়ে এক মুসলমান রাষ্ট্র স্থাপন করবে। হিন্দুর সঙ্গে একত্র হয়ে কংগ্রেসের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা এলে তাঁদের কোন সুবিধা হবে না ইত্যাদি। তিনি বক্তৃতার ভেতর দিয়ে যে সাম্প্রদায়িক বীজ বপন করে গেলেন, কর্তব্যরত অবস্থায় আমি তা’ শুনে অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে গেলাম।

দাঙ্গা এতদিন শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। অচিরেই যে এখন গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়বে, সে বিষয় চিন্তা করে আমার হৃৎকম্প উপস্থিত হোল। আরও বেশী চিন্তা হ’ল লক্ষ্য করে যে থানায় পুলিশ কর্মচারীদের মধ্যে যে এতকালের একটা সুন্দর ভাতৃত্বের সম্বন্ধ ছিল তাতে ফাটল ধরেছে। একটা চাপা হিংসা, রেষারেষি চলতে লাগল। সামাজিক দিক থেকে পুলিশ না ছিল হিন্দু না মুসলমান না খৃষ্টান। এরা ছিল একটা ভিন্ন জাত, সেটা হ’ল ‘পুলিশ জাত’। ‘ইউনিফর্মের’ ভেতর দিয়ে এদের ‘ইউনিটি’ ছিল সুদৃঢ়। কিন্তু তা’ আর থাকল না। বাংলায় মুসলিম লীগের শাসন। মুসলমান যুবক পুলিশ কর্মচারীরা প্রকাশ্যভাবে মুসলিম লীগের প্রচার কার্য চালাত। কিন্তু কোন হিন্দু পুলিশ কর্মচারীর পক্ষে কংগ্রেস বা হিন্দু মহাসভা বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের হয়ে কিছু কাজ করা  বা বলা ছিল নিষিদ্ধ। তাঁদের চাকরীর পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। আমি এমন অনেক দৃষ্টান্ত জানি যে হিন্দু পুলিশ অফিসাররা পরম উৎসাহে পুলিশ কর্ত্তব্যের বহির্ভূত কার্য্যকে উপেক্ষা করে সরকারের কাছে ‘অসাম্প্রদায়িক’ প্রমাণ করে নিজেদের উন্নতির ফিকির দেখত। হকসাহেবের বক্তৃতায় যে সাম্প্রদায়িক বীজ বপন হ’ল তাতে জল সেচন করতে লাগল এই সরকারী কর্মচারীরা।

অচিরেই বীজ অঙ্কুর হোল। টঙ্গী, ভৈরবের আশে পাশের গ্রামগুলিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। হিন্দুরা দলে দলে বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে লাগল আগরতলার দিকে। প্রায় দশজন বন্দুকধারী পুলিশ কনস্টেবল নিয়ে ভৈরব রেল স্টেশনে নিযুক্ত আছি দিনের পর দিন। ইউনিফর্ম খুলে বিশ্রামের সময় নেই। স্নান নেই, আহার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যা জুটছে। বেশি গুলি চালালে চাকরীর দিক থেকে ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই মাঝে মাঝে দাঙ্গাকারী জনতা প্রয়োজন মত গুলি চালিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে হচ্ছে। গুর্খা সিপাই সঙ্গে। থামিয়ে রাখা যাচ্ছে না। হাজার হাজার হিন্দু নরনারী শিশুসন্তান সহ চলেছে বাড়িঘর ছেড়ে ট্রেনে অজানা ভবিষ্যতের দিকে। জল ও খাবারের জন্য মর্মভেদী হাহাকার। এগিয়ে এলেন ভৈরবের ধনী ব্যাবসায়ী বি এম দাস ব্রাদার্স-এর অন্যতম মালিক সমীর দাস আর ‘নাখদা’র মালিকের ছেলে কামাল। দুজনেই যুবক। অল্প সময়ের মধ্যে তাঁদের সঙ্গে আলাপ এবং পরস্পরের ব্যবহারে মুগ্ধ তিন বন্ধু। আমার অনুরোধে খুলে দিল দানছত্র। জল সরবরাহ করা, মুড়ি, বিস্কুট, চিড়া গুড় ইত্যাদি খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন নিরাশ্রয়দের। জীবনের ভয়ে সবাই পালিয়ে চলেছে আগরতলা এক অনিশ্চিতের মধ্যে। বাড়িঘরে জ্বলছে আগুন। কত পুরুষের পৈতৃক ভিটে, কত মন্দির দেউল সব পড়ে রইল পেছনে। কি মর্মভেদি করুণ কান্না। স্বাধীনতার স্বপ্নের অগণিত বলি। ব্রিটিশ চক্রান্তের বীভৎস পরিণাম। দশদিনের মধ্যে দাঙ্গা কমে গেল। বুট খুলে দেখলাম শরীরের অন্য অংশ থেকে অসম্ভব রকম সাদা হয়ে গেছে পা দুটো। শারীরিক যন্ত্রণা ভুলে দুই বন্ধুকে জানালাম আমার নীরব শ্রদ্ধা। আশ্চর্য হয়ে গেছি ভেবে যে মুসলমানের ভয়ে পালিয়ে চলেছে হাজার হাজার উদ্বাস্তু তাদেরি প্রাণ রক্ষার জন্য জল খাবার এগিয়ে দিচ্ছে যারা তাঁদের মধ্যে রয়েছেন একজন মুসলমান যুবক।    

অষ্টগ্রাম থানার বাঘাইয়ার চর এবং নাসির নগর থানার চাতলপারের চরগুলিতে ছিল দুর্দান্ত প্রকৃতির মুসলমান চাষিদের বাস। এদের বেশীর ভাগ ছিল অবস্থাপন্ন গৃহস্থ। চরের উর্বরা জমিতে চাষ করে ধান, পাট ও বিভিন্ন রবিশস্য যা পেত তার অধিকাংশ বিক্রি করে প্রচুর টাকা হ’ত। ধান পাট উঠে গেলে এদের যুবকদের হ’ত ‘কাজিয়ার’ মহড়া। টিকারা বাজিয়ে লাঠিখেলা চলত। তারপর পুরোন বিবাদের সূত্র ধরে দুই গ্রামের দুই দলে লেগে যেত লাঠি, হলঙ্গা, বর্শা নিয়ে তোড়জোড়।

এফ ও পি-র চার্জ নিয়ে একবার নৌকোযোগে এ সমস্ত যায়গা ঘুরে গেছি। চাতলপার, পতৈর, বাঘাইয়া গ্রামে ভাল ভাল লোকের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করে জেনেছি স্থানীয় চোর ডাকাতের গতিবিধির সংবাদ। দুর্গাপূজোর সময়ে এই অঞ্চলে যাত্রীবাহী ও মালবাহী নৌকোর চলাচল বেড়ে যায়। থানা রেকর্ডে দেখা যায় এই সময়ে ডাকাতরা নদীর ওপর নৌকো আক্রমণ কোরে মালপত্র লুঠ কোরে নিয়ে পালিয়ে যায়। তাই পেট্রোল চার্ট করার সময় ঠিক করা হ’লনদীপথে চলতে চলতে এই সময়ে দুইতিন দিন চাতলপারের আশে পাশে থাকা।

এই চার্ট অনুসারে অনেক যায়গা ঘুরে সপ্তমী পূজোর দিন সকালে নৌকো লাগল পতৈরের ঘাটে। নৌকোর সামনে সব সময়ে গুলিভরা বন্দুক নিয়ে একজন সিপাই পাহারায় থাকত। আমি একজন সিপাই নিয়ে পতৈর গ্রাম ঘুরে এলাম। সেখানে অনেকের সঙ্গে আমার আলাপ পরিচয় হোল। খুব আনন্দ হ’ল আমার দুই বন্ধুকে সেখানে দেখে। এই পতৈর গ্রামেই তাদের বাড়ি। একজন অন্নদা শঙ্কর রায় আর একজন গিরীন্দ্র কুমার চক্রবর্ত্তী। দুইজনেই আমার সাথে ঢাকা জগন্নাথ কলেজে পড়ত। অন্নদার আর্থিক অবস্থা খুব ভাল। তাই ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে আর পড়ে নি। সম্পত্তি দেখাশোনায় ব্যস্ত। গিরীন কলেজের ফাংশনে গান করত। ক্রমে ভাটিয়ালী গানে খুব নাম করেছিল।  

অন্নদা আর গিরীন দুজনেই আমাকে বলল -“দেখ দিগেন, শুনছি আগামী কাল অষ্টগ্রাম থানার বাঘাইয়া ও নাসির নগর থানার চাতলপার গ্রামের দুই দল মুসলমানের এক ভয়ানক দাঙ্গা বাঁধবে। গতকাল বাঘাইয়ার কিছু লোক পাট বিক্রি করতে চাতলপার হাটে আসে। তাদের নাকি চাতলপার গ্রামের কয়েকজন মুসলমান খুব অপমান করে। বাঘাইয়ার লোকের দলে কম বলে খুবই রাগান্বিত অবস্থায় চলে যায়। চাতলপারের লোকেরা বুঝতে পেরে লাঠিসোটা নিয়ে তৈরি হয় ও মহড়া দিতে থাকে। বাঘাইয়ার ওরাও বসে নেই। কত যে খুন জখম হবে তার কোন ঠিক নেই। তুমি এর মধ্যে থেকো না।”

আমি বললাম – “এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে এরকম কাণ্ড হবে ভাবা যায় না। আপোষ মীমাংসা করে দিলে হয় না?”

অন্নদা বলল -“শোনো, এরা ফসল বিক্রি করে টাকা পেয়েছে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে, এরা রোজগার করে ঠিকই, কিন্তু রাখতে জানে না। কারোর কথা এখন শুনবে না। তবে বাঘাইয়া যেয়ে একবার চেষ্টা করে দেখতে পার।”

আমি বললাম – “আমার যে এখানে দু’তিন দিনের প্রোগ্রাম রয়েছে। অনেকেই তো জানতে পেরেছে আমি এখানে এসেছি। এই অবস্থায় এখান থেকে চলে যাওয়াটা  মোটেই যুক্তিসঙ্গত নয়। তা ছাড়া কোনরকম শান্তিভঙ্গ যাতে না হয় তা’ দেখাওতো পুলিসের একটি কর্তব্য। আমি যে জেনেছি এ কথা অস্বীকার করব কি করে। কর্ত্তব্যভ্রষ্ট কোন মতেই হব না।” আমি একজন চৌকিদার দিয়ে নাসির নগর থানায় একটা চিঠি পাঠিয়ে দিলাম সব লিখে আর কিছু পুলিশ পাঠিয়ে দিতে বললাম। একজন চৌকিদার দিয়ে বলে পাঠালাম যে চাতলপার গ্রামে তারা যেন কোনরূপ দাঙ্গা না করে। চাতলপার বাজারে বন্দুক নিয়ে পুলিশ মোতায়েন আছে। নিজে চলে এলাম বাঘাইয়া গ্রাম হয়ে অষ্টগ্রাম থানায়। উদ্দেশ্য লোকে দেখুক পুলিশ এসে গেছে। থানায় লিখে কিছু পুলিশ বন্দোবস্ত করে এলাম।

পরদিন সকালে দুই থানা থেকে এসে হাজির হ’ল দু’জন সহকারী দারোগা আর ছয়জন কনস্টেবল। আমাদের তিনটি নৌকোই পতৈর ঘাটে বাঁধা আছে। আমার নৌকোয় মুজিবর নামে একজন সাহসী যুবক মাঝি ছিল। নৌকোর ছইয়ের ওপর থেকে হঠাৎ সে দেখতে পেল বাঘাইয়ার দিক থেকে বহুলোক নৌকো করে লাঠি, হলঙ্গা, বড় দা’ ইত্যাদি মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চাতলপারের দিকে যাচ্ছে। আমি নৌকো খুলে দিয়ে চাতলপারের দিকে এগোতে বললাম। নদীর বাঁক ঘুরতেই দেখা গেল চাতলপারের বাজারের ঘাটেও বহুলোক লাঠি, বল্লম, বড় দা’ ইত্যাদি নিয়ে লম্ফঝম্প করছে। দুই দলই পরস্পরকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করছে। ভাঁটার দিক থাকায় আমাদের নৌকো অল্পক্ষণের মধ্যেই দুই দলের মাঝখানে এসে গেল। ততক্ষণের মধ্যে দুই দলে পরস্পরকে বল্লম ও বাঁশের তৈরি এক দিক চোখা সড়কি ছুঁড়ে মেরে সাঙ্ঘাতিকভাবে জখম করতে লাগল। কেউ কেউ নৌকো থেকে আহত অবস্থায় জলে পড়ে গেল।

আমি দেখলাম আমাদের নৌকোগুলি স্রোতের টানে ঘটনাস্থল ছেড়ে দূরে সরে যাচ্ছে। আমার হুকুমে সব নৌকো ঘুরিয়ে এনে চাতলপারের ঘাটে লাগান হোল। দুই পক্ষকে সাবধান করা হ’ল থেমে যেতে নয়তো গুলি করা হবে। আমি নৌকোর সামনে দাঁড়ান। সাবধান বাণীতে কোন কাজ হ’ল না। হঠাৎ ঘটনার মোর ফিরে গেল। নাসিরনগরের সহকারী দারোগা নৌকো থেকে লাফিয়ে নেমে দাঙ্গাকারীর দুজনকে অস্ত্রসহ ধরে ফেলে নৌকোর দিকে নিয়ে আসতে লাগল। অবস্থা দেখে বাঘাইয়ার লোকগুলো ওদের নৌকো নিয়ে পিছিয়ে যেতে লাগল। চাতলপারের লোকরা তাদের দুজনকে ধরা হয়েছে দেখে ভীষণভাবে উত্তেজিত হয়ে লাঠি, বর্শা, দা নিয়ে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পর পর দুটো বর্শা আমার দিকে ছুঁড়ে মারল। প্রথমটা আমার মাথার টুপি গেঁথে জলে পড়ে গেল। দ্বিতীয়টি আমার মাথায় সাঙ্ঘাতিক জখম করে নৌকার ছইয়ে গেঁথে গেল। আত্মরক্ষার জন্য আমি গুলি করার হুকুম দিলাম। কারণ ততক্ষণে দুজন সিপাই বন্দুকে গুলি ভরে তৈরি হয়ে গেছে। আমার মাথা থেকে প্রচুর রক্ত বের হয়ে ইউনিফর্ম ভিজে যাচ্ছে। গুলি খেয়ে সব পিছিয়ে যেতে লাগল। কতক্ষণ গুলি চলেছিল আমি জানি না। কারণ পরে যাওয়ার সাথে সাথেই আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম।

যখন জ্ঞান ফিরে এল তখন আমি নাসিরনগর থানায়। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হ’ল কিন্তু রক্ত পড়া থামল না। নাসির নগর থানার অফিসার-ইন-চার্জ আমার কাছ থেকে শুনে ঘটনার বিবরণ লিখে নিয়ে আমাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলেন। কারণ আমার বয়ান লেখার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছতে একদিন লেগে গেল। হাসপাতালে আমার জ্ঞান ফিরে এল। ততক্ষণে মাথায় গভীর ক্ষতস্থান সেলাই করে ব্যান্ডেজ বাঁধা হয়ে গেছে। সর্ব্বাঙ্গে অসম্ভব ব্যথা – উঠে বসার ক্ষমতা নেই। জ্ঞান হবার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম দেখলাম আমার কাছে একজন ইংরেজ রাজপুরুষ চেয়ারে বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি কিছু বলতে চেষ্টা করলে উনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললে – “Don’t get up, boy. You gallant work has saved the prestige of police force and lives of so many though at the cost of grave danger to your life. You are out of danger now.”

এই কথা বলে উনি উঠে দাঁড়ালেন ও উপস্থিত থাকা ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে আলাপ করে আবার আসবেন বলে চলে গেলেন। জানলাম – ইনিই Mr. Drooker ICS – ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্ত রাখার জন্য একটি ইনজেকশন দেওয়া হোল। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। বিকেলের দিকে ঘুম ভাঙলে দেখলাম মিঃ ড্রুকার বসে আছেন। অনেক সুস্থ বোধ করলাম। উনি আমার সঙ্গে কথা বলে ঘটনা জেনে নিলেন। তারপর একে একে এলেন ঢাকা রেঞ্জের DIG Mr. H B Jones IP, বাখরগঞ্জ রেঞ্জের DIG Mr. H G Hunt IP এবং অনেকে। জিজ্ঞাসা করে জানলেন যে গুলি ছাড়ার যথেষ্ট যুক্তি ছিল কি না। কারণ শুনলাম –  গুলিতে যেমন মারা গেছে কয়েকজন, তেমনই আহত অবস্থায় হাসপাতালে রয়েছে প্রচুর। আহতের সংখ্যা প্রায় চল্লিশের ওপর। হাসপাতালে সশস্ত্র পুলিশ পাহারা। আশ্চর্য হলাম শুনে যে এই ঘটনার পরদিনের খবরের কাগজে আমার মৃত্যু সংবাদ ছাপা গেছে, ঘটনার বিশদ বিবরণ দিয়ে।

শাসন বিভাগীয় ও বিচার বিভাগীয় তদন্তের পর উক্ত তদন্তকারী উর্দ্ধতন কর্মচারীগণ একবাক্যে আমার অসীম সাহসিকতা ও কর্তব্য নিষ্ঠার কথা লিখে জানিয়ে দিলেন যে গুলি করা খুবই যুক্তি সঙ্গত হয়েছে। সেখানকার নিরপেক্ষ হিন্দু মুসলমানগণ আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কোর্ট লোকে লোকারণ্য। স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে বিচার হচ্ছে প্রায় পঞ্চাশজন মুসলমান দাঙ্গাকারীর। সরকার পক্ষে উকিল ছিলেন খান বাহাদুর আব্দুল গনি। আর আসামী পক্ষ প্রচুর টাকা দিয়ে দাঁড় করালেন তদানীন্তন নাম করা এক হিন্দু উকিল (কামিনী দত্ত)। ব্যাবসার খাতিরে আসামীদের পক্ষে তিনি কত যে মিথ্যার অবতারণা করে সওয়াল করলেন মুসলমান বিচারপতির আদালতে নির্লজ্জভাবে তা শুনে আমার এই ব্যাবসার প্রতি একটা ঘৃণা জন্মে গেল। আজও তা’ আছে। আমার আজও মনে আছে অনেক মিথ্যা ভাষণের পর তিনি কোর্টে বলেছিলেন – “Your Honour! This young officer wanted to earn credit by boiling the riot, instead of quelling the same.” একজন শিক্ষিত নামকরা উকিলের কতগুলি টাকার জন্য এরূপ বিকৃত ভাষণ শুনে আমার চোখ জলে ভরে গেল। আব্দুল গনি সাহেব কিন্তু খুব সুন্দরভাবে বিপক্ষ উকিলের মিথ্যা সওয়ালগুলো একটি একটি খণ্ডন করে দিলেন। পনের দিনের মতন একনাগাড়ে চলল বিচার।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মত ছোট শহরে পঞ্চাশ জন দাঙ্গাকারী আসামী ঘোরাফেরা করছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাসপাতাল আমার পক্ষে নিরাপদ নয় বলে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল ময়মনসিংহ পুলিশ হাসপাতালে। প্রচুর রক্তপাতে শরীর ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তার ওপর পিঠের নীচের দিক থেকে কোমর পর্য্যন্ত একটা যন্ত্রণা হ’ত মাঝে মাঝে। এই চোট যে কখন কি ভাবে লেগেছিল বুঝতে পারিনি। এমন হতে পারে যে মাথায় আঘাত লেগে পড়ে যাবার সময়ে বা পরে কোন লাঠি বা বল্লম আমার পিঠে এসে পড়েছিল। যা হোক একমাস পুলিশ হাসপাতালে থাকার পর সিভিল সার্জ্জেন আমাকে তিন মাসের ছুটির সুপারিশ করে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিলেন। ছুটি শেষ হলে আমার বদলি হ’ল ময়মনসিংহ জেলার মোহনগঞ্জ থানায়। ট্রাইব্যুনালের বিচারের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া এসেছি। আমি পুলিশ ক্লাবে একা থাকি। পরিচিত কোন লোক নেই। ভৈরব থেকে এসেছে সেই সাহসী যুবক মাঝি মুজিবর। বিচারের সময় সমস্ত ঘটনা বলে গেল। কি ভাবে আসামীদের আক্রমণ থেকে আমার ওপর পড়ে থেকে কি ভাবে নিজে আহত হয়েছিল। বেশীর ভাগ আসামীকে সে সনাক্ত করেছিল। আর এসেছিল সেই দুইজন সিপাই যারা গুলি চালিয়েছিল। এদের একজনের হাত ভীষণ জখম হয়।

বিচারে প্রায় চল্লিশজন লোকের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড হয়। বিচারপতি সাহসের সাথে কর্ত্তব্য সম্পাদনের জন্য আমার কথা তাঁর রায়ে লিখলেন। কিন্তু একটা কথা আমাকে বড়ই দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে সেই দাঙ্গার দিন থেকে বিচারের শেষ দিন পর্য্যন্ত আমি আমার উর্দ্ধতন কর্মচারী দ্বারা কত তিরস্কৃত হয়েছি। বলেছিল এ সব কাজ যত এড়িয়ে যাওয়া যায় তত ভাল। এরা দুই পক্ষে খুন জখম হয়ে আপনিই থেমে যেত। তারপর গেলেইতো সুবিধা। এটাই বোধ হয় এই বিভাগের অভিজ্ঞ লোকের কথা। তাই আজও সংবাদপত্রে দেখি দুই রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালীন পুলিশের নীরব দর্শকের ভূমিকা। সেদিন আমার বিবেক সে কথা মানতে পারে নি এবং আজও পারে না। তাই বোধ করি ভগবান সে যাত্রা আমাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এই বিবেকের তাড়নায় আমাকে আরও দুবার ডাকাতের সাথে লড়তে গিয়ে গুলি চালাতে হয়েছিল। পুলিশের পক্ষে গুলি চালান যে কত দুর্ভোগ, কত রকম তদন্তের সম্মুখীন হতে হয় প্রমাণ করতে যে গুলি করার প্রয়োজন ছিল সে কথা একমাত্র ভুক্তভোগী পুলিশ মাত্রই জানেন।

তদন্তকারী অফিসারগণ তাঁদের রিপোর্টে আমার সাহসিকতার জন্য তদানিন্তন সরকার প্রদত্ত “Gallantry Medal” অর্থাৎ “King’s Police and Fire service Medal” (সাহসিকতার জন্য প্রদত্ত) আমাকে দেওয়ার জন্য সুপারিশ করে পাঠালেন। মুসলিম লীগের শাসনাধীন অবিভক্ত বাংলার হোম মিনিস্টার তখন মাননীয় খাজা নাজিমদ্দিন। চাতলপার থেকে মুসলিম লিগের স্থানীয় নেতা ভীষণ রেগে গেলেন কেন এত মুসলমান হত ও আহত করা হোল? তার করে দিল নাজিমদ্দিন সাহেবের নামে। ‘চাতলপারের মুসলমানরা মিলাত শরিফে একত্র হয়েছিল। হিন্দু দারোগা চাতলপার এসে ডেকে পাঠায় চাতলপার ও আশে পাশের মুসলমানদের তদন্তের অজুহাতে। তারা মিলাত শরিফ ছেড়ে না আসায় হিন্দু দারোগা ক্রুদ্ধ হয়ে তাদের ওপর গুলি চালায়। কত যে মুসলমান মরে গেছে তার কোন হিসাব নেই। বহু আহত হয়ে পরে আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাসপাতালে।’

ততক্ষণে অবশ্য বিভাগীয় তদন্তের রিপোর্ট চলে গেছে রাইটার্স বিল্ডিংএ নাজিমদ্দিন সাহেবের কাছে। ঢাকায় হিন্দু মুসলিমের দাঙ্গা চলছিল। আবহাওয়া সব যায়গাতেই বেশ গরম। বিদেশী শাসকের কূটনৈতিক চাল, স্বাধীনতা আন্দোলনের তীব্র প্রভাবকে প্রশমিত করার অপপ্রচেষ্টা। যদিও তিনজন বৃটিশ রাজপুরুষ ও একজন মুসলমান পুলিশ সাহেব তদন্তের পর আমার স্বপক্ষেতো রিপোর্ট দিলেনই উপরন্তু করলেন এত বড় একটা সন্মানের সুপারিশ, তথাপি নাজিমদ্দিন সাহেব দেখলেন সেটা রাজনৈতিক কূটদৃষ্টি দিয়ে। রাইটার্স বিল্ডিংএর গৃহমন্ত্রীর ঘরে অগুনতি ফাইলের তলায় চাপা পড়ে গেল সেই সুপারিশ পত্র। না পাওয়া সেই বিরল সন্মানের ব্যাথা অবশ্য ভুলতে পেরেছিলাম প্রায় পঁচিশ বছর পরে ‘রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক’ ও তার আরও দশ বছর পরে ‘স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী পদক’ লাভ করে। কিন্তু সেদিনের একজন তেইশ বছরের যুবকের সাহসিকতা ও জীবন বিপন্ন করে কর্তব্যনিষ্ঠার কাহিনী তার অশ্রু ও রক্তে লেখা রইল শুধু মেঘনার জলে। Ì

দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী

 

 

 

অসমাপ্ত এজাহার – রঙরুট

দিগেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জ্জী

 

আর্থিক বিপর্যয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা আমার জন্য যেদিন চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল সেদিনের সেই মানসিক অশান্তি আমার মত যারা মধ্যবিত্ত ঘরে জন্মগ্রহণ করেছেন তারাই একমাত্র উপলব্ধি করতে পারবেন। মা ও ছোট ছোট ভাইবোনেদের প্রতিপালনের দায়িত্ব আমাকে যে কৈশোরেই বহন করতে হবে এ কথা নিশ্চিত হয়ে গেল। আমি তখন ঢাকায় আমার মামার বাড়ি থেকে পড়ছিলাম। নানা অফিসে ঘুরে ঘুরে চাকরির যখন কোন সুবিধাই করতে পারলাম না তখন বাধ্য হয়ে জন্মভূমি ঢাকা ছেড়ে ময়মনসিংহে আমার এক জ্যাঠতুত ভাইয়ের আশ্রয়ে এলাম। আমার উক্ত ভাই তখন পুলিশ বিভাগের একজন পদস্থ কর্মচারী। অনোন্যপায় হয়ে আমাকে পুলিশ বিভাগের একটি নিম্নপদ গ্রহণ করতে হোল। চাকরি পেলে সাধারণত মানুষ খুবই আনন্দিত হয়, আমার কিন্তু সেরকম কিছুই বোধ হোল না। বরং জীবনের এই আকস্মিক পরিবর্তনে সমস্ত মনটা সেদিন হতাশায় পূর্ণ হয়ে গেল। জীবনের কত উচ্চ আশা, ছাত্রজীবনের যত রঙিন স্বপ্ন সমস্ত যেন এক নিমেষে কোথায় মিলিয়ে গেল। আমি ঢাকার ছাত্র, ঢাকা তখন রাজনৈতিক আন্দোলনে অগ্রগামী। সেই আবহাওয়া যে আমার মনেও লাগেনি, একথা স্বগত অস্বীকার করবার উপায় ছিল না। তারপর তখন একটি চলতি কথা ছিল যে “মারের শেষ ঝাঁটার বাড়ি, চাকুরীর শেষ দারোগাগিরি”। এতেই বুঝে নিয়েছিলাম যে আমার জীবনের পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াল। এ কথা ঠিকই যে আমার এ ছাড়া আর কোন উপায়ও ছিল না। কিন্তু আমার যে তখন মাত্র উনিশ-কুড়ি বছর বয়স। যে আবেষ্টনীতে ঢাকায় ছাত্রজীবন কাটিয়েছি তা’তেতো কোনমতেই আমার এই চাকরি-প্রাপ্তি মানসিক শান্তি আনতে পারে নি। যদিও আর্থিক সমস্যার কিছুটা লাঘব হয়েছিল।

মনে আছে কিছুদিন পর্য্যন্ত আমি যখন এক মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে ছিলাম তখন একদিন আমার এক অধ্যাপকের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি মন দিয়ে আমার সব কথা শুনলেন ও খুব উৎসাহ দিয়ে বললেন – “দেখ, Service is not mean, unless the man himself is mean – কোন চাকরিই তুচ্ছ নয়, মানুষ তার হীন আচরণে ছোট করে ফেলে। তুমি যদি ভাল হও, তবে এই অবাঞ্ছিত ডিপার্টমেন্টের কিছু ভাল করতে পারবে। মনে রেখ তোমার যখন পড়া আর এগোল না তখন এই ডিপার্টমেন্টকে তুমি মনে করো তোমার বিশ্ববিদ্যালয়। শুনেছি এখানেও বিদ্যালয়ের মত প্রমোশনের ধাপ আছে”। সত্যিই বলতে বাধা নেই এ কথাগুলি আমার সমস্ত মানসিক বেদনাতো দূর করেই ছিল, মনে এনেছিল প্রচুর শক্তি ও আনন্দ। এই শক্তি ও আনন্দ হয়েছিল আমার নতুন জীবনের চলার পথের পাথেয়। এই ধ্রুবতারা থেকে যে কোনদিন লক্ষ্যভ্রষ্ট হই নি, তার প্রমাণ আমার সুদীর্ঘ একটানা ঊনচল্লিশ বৎসর অন্তে এই অবাঞ্ছিত পুলিশ বিভাগের একটি উচ্চপদ থেকে সুনামের সঙ্গে অবসর গ্রহণ। যদিও এটা একটা আত্মপ্রশংসা হয়ে গেল আমার কিন্তু বলার উদ্দেশ্য তা নয়। আমার কথা হোল যে আমার সেই অধ্যাপকের সদুপদেশ যে সত্যই আমার ভেতর মন্ত্রশক্তির প্রেরণা এনেছিল তা প্রকাশ করা এবং আমার মত কোন যুবক যদি এরূপ কোন নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতিতে পরেন, তিনি হয়তো তাহার কর্মজীবনে এর থেকে কিছু সাহায্য পাবেন, এই আশা।

যা হোক কাজ তো একটা মিলল, কিন্তু এই কর্মজীবনের প্রারম্ভিক প্রস্তুতিত ভয়াবহ। সাধারণ লাগামহীন যে জীবন এতদিন যাপন করেছি তার সঙ্গেতো এর কোন মিল নেই। এ কথা অক্ষরে অক্ষরে বুঝতে পারলাম যে দিন ট্রেনিং স্কুলে যোগ দিলাম। ১৯৩৬ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর মাস অবধি ছিল আমার ট্রেনিং পিরিয়ড। এই ভরসা ছিল যে আমি একা নই, আরও আমার মত বলির সংখ্যা প্রায় শতেকের উপর। সমস্ত চলাফেরা কঠোর নিয়ম শৃঙ্খলাধীন। সে নয় প্রথম প্রথম কষ্ট হবে। সবচেয়ে অসুবিধা হয়েছিল অশিক্ষিত হাবিলদারদের অশুদ্ধ ইংলিশ কমান্ড। দু’চারটি বললেই বোধ হয় সমস্তটা আন্দাজ করতে কষ্ট হবে না। লাইন করে আমাদের ইনচার্জ একটি Water tank- এর কাছে নিয়ে এসে বললেন “ইয়ে অভরকা ট্যাঙ্কি। ইয়ে অরিনাল – রাত কা ওয়াস্তে।” অর্থাৎ urinal শুধু রাত্রেই যাওয়া চলবে, দিনে নয়। দিনে যেখানে যেতে পারা যাবে তা দেখে খুবই দুশ্চিন্তা হয়েছি, ততক্ষণে লক্ষ্যস্থল পর্যন্ত যাওয়া যাবে কি না খুবই সন্দেহ হয়েছিল। সে যা হোক সব কিছুতেই বিনা অপরাধে উত্তীর্ণ হওয়া গেল। একদিনের দুর্ভোগের কথা না বলে পারছি না। কারণ সেদিন ইনচার্জের ইংরেজি কম্যান্ড না বুঝতে পেরে অত্যন্ত ভয় পেয়ে পেছন দিকে তাকিয়ে আমাদের সাঙ্ঘাতিক অপরাধ করার দরুন এক ঘণ্টা বেশী ড্রিল করতে হয়েছিল। ব্যাপারটা হোল আমাদের ইনচার্জ সাহেব প্যারেড গ্রাউন্ডে হঠাৎ কম্যান্ড দিলেন “বাগ পিছে” অর্থাৎ ব্যাক মানে যদি ‘বাগ পিছে’ হয় তাহ’লে তো ভয়েরই কথা।

বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমী (বর্তমান)

(http://bpa.gov.bd/photo-gallery/)

দেশ বিভাগের পূর্ব্বে, যারা পুলিশ ডিপার্টমেন্টে ঢুকেছিলেন তাদের সবাইকে ট্রেনিং-এ যেতে হ’ত অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার অন্তর্গত সরদা নামক একটি স্থানে। পদ্মানদীর তীরে বিস্তির্ণ ভূখণ্ড নিয়ে এই শিক্ষাশিবির। আশেপাশে কোন গ্রাম নেই বললেই চলে। খাবার স্টল, দোকান-বাজার সবই নিজস্ব। কঠোর নিয়মশৃঙ্খলার অধীন থেকে জীবন যখন হাঁপিয়ে উঠত, তখন সরদার প্রাকৃতিক দৃশ্য কর্মব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে মাতৃস্নেহের মতন মনপ্রাণ ভরে দিত। তাই বিদায়ের দিনে এ হেন যায়গা ছেড়ে আসতে মনে খুব ব্যথা বোধ হয়েছিল। যে যায়গায় প্রথম প্রথম একদিনও থাকতে ইচ্ছা হ’ত না, তাই শেষের দিকে মনে হয়েছিল খুবই মনোরম। পুলিশ ট্রেনিং-এর এই শিক্ষাপদ্ধতির প্রশংসা না করে থাকা যায় না। দলে দলে কতকগুলি নিয়মশৃঙ্খলাহীন যুবকদের নানারূপ শিক্ষার ভেতর দিয়ে গড়েপিটে মানুষ করে পুলিশ বিভাগের মাধ্যমে দেশবাসীর সেবার জন্য পাঠিয়ে দিত। সে উদ্দেশ্য যে কতখানি সফল হ’ত তা’ সকলেই জানেন। জেলায় ফিরে এদের যখন নানা স্থানে পোস্টিং করা হ’ত তখন জনগণের মধ্যে শৃঙ্খলা আনার পরিবর্তে এরা নিজেরাই হয়ে উঠত অত্যন্ত বেপরোয়া ও উচ্ছৃঙ্খল। দেশসেবকের পরিবর্তে এরা হয়ে উঠত জনগণের প্রভু। জনগণ এদের ভালবাসা দূরের কথা, দেখলেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠত। আমার কর্মজীবনে অবশ্য এর প্রত্যেক জিজ্ঞাসার উত্তর পেয়েছিলাম।

ট্রেনিং-এ থাকতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনধারা কি ভাবে চলত তার একটা রেখাচিত্র আঁকা যেতে পারে। শুধু রবিবার, বৃহস্পতিবার আর ছুটির দিন ছাড়া আমাদের রাত চারটেয় ঘুম থেকে উঠতে হ’ত। প্রথম দিনের কথা মনে পরে। শুনলাম ভোর ছ’টায় ‘ফল ইন’ – অর্থাৎ প্যারেড আরম্ভ হবার আগে লাইন দিয়ে মাঠে দাঁড়াতে হবে। ইন-চার্জ হাবিলদার রাতের রোল কলের সময় বজ্র নির্ঘোষে জানিয়ে দিলেন যে ভোর সাড়ে পাঁচটায় তৈরী হওয়া চাই। অতএব আমাদের বুঝে নিতে দেরী হল না যে পাঁচটাই হবে আমাদের সময়। সে তো হল। কিন্তু ভোর তিনটেয় না উঠতে পারলে তো কোনমতেই সব কাজ সেরে তৈরি হওয়া সম্ভব হবে না। সকলেই এক দুশ্চিন্তা নিয়ে শুতে গেলাম। পরস্পর আলোচনা করে ঠিক করলাম খুব করে জল খাওয়া হবে আর যে আগে উঠবে, সে ব্যারাকের সবাইকে দেকে দেবে। হঠাৎ একটা গোলমালে আমার ঘুম ভেঙে গেল। দেখলাম অধিকাংশ শিক্ষানবীশের তৈরি হওয়া আরম্ভ হয়ে গেছে। বিউগলের মর্মভেদী করুণ শব্দ বেজে চলছে। তখন আমার মনে হয়েছিল – বিউগল যেন বলছে “ওঠ, জাগো, আজকের কাজ এখন থেকে শুরু হবে”। ট্রেনিং ক্যাম্পে যারা এরূপ শিক্ষায় ছিলেন তারা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে এই বিউগলের মর্মভেদী শব্দ সারাদিনের কাজে কিরূপ উৎসাহ ও প্রেরণা যোগাত। এরই গানে তৈরি হওয়া শুরু, প্যারাড আরম্ভ, সাময়িক বিশ্রাম, প্যারাড শেষ, আইনের ক্লাশে যাওয়া ইত্যাদি। প্রত্যেক সময়ের এই বিউগলের শব্দের একটি করে নাম আছে এবং এর সাথে পরিচিত হতে না পারলে প্রতি পদেই অসুবিধা। ভোর চারটেয় যে বিউগল বাজে তার নাম “রিভেলী” – তখন ফ্ল্যাগ ওঠান হ’ত। সন্ধ্যেয় যেটা বাজে তার নাম “রিট্রিট” – ফ্ল্যাগ নামানোর সময়। সারাদিনের কর্মসূচী এমনি ভাবে তৈরি বিউগলের শব্দ সব সময়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করত।

যা হোক ক্রমে সবই অভ্যাস হয়ে গেল। চলা ফেরা, কথা বলা সবই নিয়ম শৃঙ্খলার দড়ি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। আমি ১৯৩৬ সালের কথা বলছি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ আরম্ভ হবার তিন বছর আগের কথা। আমাদের প্রত্যেক কাজ লাইন দিয়ে করতে হ’ত। এত ভিড় এত লোক – কিন্তু এতটুকু কোন গণ্ডগোল নেই। সবই যেন ভিন্ন জগতের ব্যাপার। এখানে আসার আগে তো এরূপ দেখি নি। ছাত্র জীবনে, সমাজ জীবনে যেন সব কাজেই একটা বিশৃঙ্খলা দেখে এসেছি। তাই এত শৃঙ্খলার অধীনে থেকে সব সময়ে একটু গর্ব্ব অনুভব করতাম। কলেজে পড়বার সময়ে “County Cricket Match” নামে একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম। তার একটি কথা আমার মনে পরল। সেখানে ছিল “To be one of numerous body” অর্থাৎ দলের একজন হওয়া আর “To have the authority to say – WE” অর্থাৎ একটি দলের হয়ে কিছু করা বা বলার অধিকার যে কত গর্ব্ব আর আনন্দের জিনিষ তা’ প্রতি পদক্ষেপে অনুভব করতাম। তবে সব উৎসাহ উবে যেত পি টি বা ফিজিক্যাল ট্রেনিং-এর দিন। এক ঘণ্টা চলত খালি পায়ে ও স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে। সে নাচাকোঁদা যেন শেষ হতে চাইত না। মাঘ মাসের শীতে পদ্মার ঠাণ্ডা কনকনে বাতাস যখন আমাদের অনাবৃত শরীরে হাজার মৌমাছির হুল ফোটাত তখন মনে হ’ত বোধ হয় এখান থেকে আর ফিরে যেতে পারব না। এইজন্যেই কি প্রথম মাসের সকালে প্রতিদিনই Quinine Parade হ’ত! অর্থাৎ লাইন করে নিয়ে যেয়ে হাসপাতালের মাঠে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হ’ত। তারপর ভীমাকৃতির কালো রঙের একজন লোক এসে প্রত্যেককে ওষুধের গ্লাসে করে এক গ্লাস তরল পদার্থ গলায় ঢেলে দিত। তার প্রচণ্ড তেঁতো স্বাদ আজও যেন গলায় লেগে আছে।

bpa.gov.bd/photo-gallery

এই ফিজিক্যাল ট্রেনিং-এর এক দিনের ঘটনা মনে করলে এখনও আমার রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে যায়। অনেকগুলি কঠিন শরীর চর্চার মধ্যে কেবল দুটির কথা আমি বলব। একটি হল দশ ফুট উঁচু কংক্রিটের দেওয়াল টপকান (Wall jumping) আর আর একটি পঞ্চাশ ফুট দড়ি বেয়ে ওঠা আর নামা (Rope climbing)। এসব কিন্তু নিজের ইচ্ছামতন করলে চলবে না। ইন-চার্জ হাবিলদারের কম্যান্ড মতন চলত ক্রমপর্যায়ে। শীতের সকালে যখন ব্যায়াম করতে করতে এই দেওয়ালের কাছে আসতাম তখন ভয়ে বুক ঢিপ ঢিপ করতে থাকত। শীতের শিশির সিক্ত এই দেওয়ালের বুকে লাথি মারতে গেলেই অধিকাংশ সময়ে পা পিছলে বুকে ও নাকে আঘাত লেগে যাওয়ার খুব বেশি সম্ভাবনা থাকত। একদিন সত্যিই একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। এরূপভাবে লাথি মারতে যেয়ে আমাদের একজন পা হড়কে হঠাৎ বুকে ও মুখে সাঙ্ঘাতিকভাবে আঘাত পাওয়ার জন্য তার নাকমুখ দিয়ে রক্ত আসতে লাগল এবং কিছুক্ষণের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে গেল। শেষ পর্য্যন্ত কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তাকে স্থানান্তরিত করতে হয়েছিল। পরে শুনেছিলাম ট্রেনিং নেওয়ার মতন শারীরিক যোগ্যতা সে আর ফিরে পায় নি ও কাজেই এই চাকরিও তাকে আর করতে হয় নি। তার কথা মাঝে মাঝেই আমার মনে হ’ত। পরে পরিচিত অনেকের কাছে তার খোঁজ নিয়েছি কিন্তু কোন সংবাদই আর জানতে পারি নি। শুনেছি Rope climbing-এও এরূপ দুর্ঘটনা হ’ত। পরে অবশ্য এই দুটিই উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের আইনের ক্লাসের একজন ইনস্পেক্টর শিক্ষক ছিলেন। ঘোড়া থেকে পরে তার ডান পায়ে চোট লাগে এবং শেষ পর্য্যন্ত পা কেটে বাদ দিতে হয়। Field work-এর অনুপযুক্ত হওয়ার জন্য উনি হয় আইন ক্লাসে পড়াতেন নয়তো পুলিশ কোর্টের মামলা পরিচালনা করতেন।

ঘোড়া হতে আরম্ভ করে মেথর পর্য্যন্ত সকলেই আমাদের শিক্ষক ছিল। কারোর আদেশ বা নির্দেশ অমান্য করা চলত না। যা হোক এ হেন ট্রেনিং করে জেলা হেড কোয়াটার্সে ফিরে এলাম বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে। তখন মনে হয়েছিল সত্যিইতো প্রকৃত যুবক তৈরি হতে হোলে এরূপ ধরনের শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্ত্তীতা শিক্ষার সুযোগ দেশের প্রত্যেক যুবকের প্রয়োজন। আজ দেশ স্বাধীন। আমার মনে হয় এরূপ ট্রেনিং বাধ্যতামূলক হলে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ভালই হ’ত। সব হাবিলদারই যে অশুদ্ধ উচ্চারণ করত তা’ নয়। ক্রমে এদের সব রকম কম্যান্ড আমাদের আয়ত্ব হয়ে গিয়েছিল আর আমরাও এদের শিক্ষক হিসেবে ভালবাসতে শিখেছিলাম। ট্রেনিং কলেজের প্রধান অধ্যক্ষ ও প্রধান ড্রিল শিক্ষক, সুবাদার প্রভৃতি উর্দ্ধতন সম্প্রদায় থেকে আমাদের আগলিয়ে রাখতে তাঁদের চেষ্টা দেখেছি। ফাইনাল প্যারেডে যখন কৃতকার্য হয়ে বেরিয়ে এলাম তখন আমাদের চেয়ে তাদের গর্ব্বই বেশী ছিল।